আজ ঢাকা চেম্বার আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখছেন অর্থমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে এই সেমিনার হয়। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৩ আগষ্ট- মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে জ্বালানি বিল পরিশোধে সরকারের অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রাথমিকভাবে সৌরশক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাজেটে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে।
শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও আসবে না। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা যত গভীরই হোক, সেগুলো দূর করা হবে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানো বা ডিরেগুলেশন বলা যতটা সহজ, বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন। তবে এ বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিদ্যমান সংকট এক দিনে সমাধান হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য সময় লাগবে। জ্বালানি খাতে তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারের বিষয়ে আমির খসরু বলেন, সরকার ইতিমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যারা প্রণোদনা পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে পারবেন, তারা ঋণ সহায়তা পাবেন। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না।
কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো না গেলে সরকারের কোনো উদ্যোগই সফল হবে না বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, কর ব্যবস্থায় অটোমেশনের কোনো বিকল্প নেই। প্রচলিত উৎসের বাইরে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এর সুফল পাওয়া যাবে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না, বরং পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তিনি বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানি একটি নেতিবাচক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সংস্কার কার্যক্রমও কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। করজাল সম্প্রসারণে হয়রানি কমানোর কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
খেলাপি ঋণ কমাতে বিদ্যমান কাঠামোগত সমস্যা সমাধানের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমের বাস্তবায়ন তদারকির জন্য ‘ইকোনমিক রিফর্ম এক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে বর্তমানে বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে। উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হার এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার বলেন, দেশের নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে বাংলাদেশ যতটা উদার, পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ততটাই কঠোর। উচ্চ শুল্কহারের কারণে স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের দাম বাড়ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আহরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনের সম্ভাবনা খুবই কম।
তিনি বলেন, বাজেটে কিছু ভালো উদ্যোগ থাকলেও মুদ্রানীতিতে তার প্রতিফলন নেই। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মুদ্রানীতিতে সংস্কার জরুরি।
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে এ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়।
দীর্ঘ মেয়াদে ঋণের জন্য ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, প্রবাসী আয়নির্ভর অর্থনীতির জন্য দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর তারল্য বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান বলেন, বাজেটে ব্যবসাসহায়ক নীতি থাকলেও বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। উচ্চ সুদহার ও মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাত থেকে সরকারের বেশি ঋণ নেওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বন্দর ও কাস্টমস সেবার দক্ষতা বাড়াতেও সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন সিমিন রহমান।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, জ্বালানি সরবরাহসহ সহায়ক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে শুধু সুদহার কমিয়ে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ, আবুল কাসেম খান, বেনজীর আহমেদ ও রিজওয়ান রাহমান। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।