আপিল বিভাগে নতুন বিচারপতি হাবিবুল গনি
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. হাবিবুল গনিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। এ নিয়োগের মধ্য দিয়ে আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা বেড়ে পাঁচজনে…
মেলবোর্ন, ২৭ আগষ্ট: নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বুধবার আকস্মিক ভূমিধস ও বন্যায় ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড় থেকে কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের যে প্রবল স্রোত নেমে এসেছে, তা অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো। এত দ্রুত ও শক্তিশালী এই ঢলের আঘাত থেকে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচাও ছিল অত্যন্ত কঠিন।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জন বিদেশি।

নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বুধবার আকস্মিক ভূমিধস ও বন্যায় ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ছবি : রয়টার্স
সীমান্তের চীনা অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, কয়েকতলা উঁচু একটি ভবনের ওপর কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত আছড়ে পড়ছে। মুহূর্তের মধ্যেই ভবনটি স্রোতের নিচে তলিয়ে যায়। বাস ও গাড়িও খেলনার মতো ভেসে যেতে দেখা যায়।
ভূমিকম্প, নাকি ভূমিধস থেকেই কম্পন?
দুর্যোগটির সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হয়ে থাকতে পারে। ভূমিধসের ফলে একটি নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে সেই বাঁধ ভেঙে নিচের দিকে প্রবল পানির ঢল নেমে আসে বলে তাঁর ধারণা।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস প্রথম দিকে জানিয়েছিল, ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছে। এর জেরেই ভূমিধস হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী বিশ্লেষণে সংস্থাটি বলেছে, ভূমিধসের কারণেই ওই ভূকম্পন ঘটেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) প্রাথমিক মূল্যায়নেও সীমান্তের চীনা অংশে কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি।
সংস্থাটির রিমোট সেন্সিং ও ভূবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠ এএফপিকে বলেন, তাঁদের ধারণা, নেপালের অংশে একটি পাথুরে বরফধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
বৃষ্টিও ছিল না, তবু এত বড় ঢল
এই দুর্যোগের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো, ঘটনার আগে ওই এলাকায় বা আশপাশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটি সান আন্তোনিওর জলবিজ্ঞানী হাতিম শরিফ বলেন, এটি বেশ অবাক করার মতো ঘটনা। তাঁর মতে, এমন আকস্মিক ঢল বিশ্বের প্রায় সব ধরনের প্রচলিত বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থাকেই অকার্যকর করে দিতে পারে।
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সতর্ক হওয়ার পর পালানোর জন্য যে সময়টুকু প্রয়োজন, তা অনেক সময় পাওয়া যায় না। দৌড়ে কিংবা গাড়িতে করে পালানোর চেষ্টাও খুব একটা কাজে আসে না। কারণ, দ্রুতগতিতে নেমে আসা কাদা ও পানির স্রোত অত্যন্ত প্রাণঘাতী এবং এর আচরণ অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো।
যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডরোথি হাইনরিখ বলেন, নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে অনেক নদী অত্যন্ত সংকীর্ণ। তুষারধস বা ভূমিধসের কারণে নদীর গতিপথ আটকে গেলে সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি জমে যেতে পারে। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে ভয়াবহ ঢলের সৃষ্টি হয়।

কাদা-জলে তলিয়ে যাওয়া রাস্তায় হতাহত ও জীবিত ব্যক্তিদের সরিয়ে নিতে উদ্ধারকারীরা এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করছেন। দেবঘাট, নুয়াকোট, নেপাল, ২৬ আগস্ট। ছবি: এএফপি
আবারও ঢলের আশঙ্কা
দুর্যোগের পরও ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যায়নি বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইসিআইএমওডির জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং জানিয়েছেন, উজানের দিকে এখনো নদীর গতিপথ কোথাও কোথাও আটকে থাকতে পারে। ফলে সেখানে আবার পানি জমে নতুন করে প্রবল ঢল নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

একজনকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নেপালের নুয়াকোট জেলায়, ২৬ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
এ কারণে দুর্গত এলাকার মানুষকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সতর্ক থাকার পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন ঢলের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্র কতটা?
নেপালের এই দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
হিমালয় অঞ্চল অবশ্য জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হিমবাহ সরে যাচ্ছে, স্থায়ীভাবে জমে থাকা বরফ গলছে এবং তাপমাত্রা বাড়ছে। এসব পরিবর্তন ভূমিধস এবং হিমবাহের হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
হিমালয়ের দেশগুলোতে হিমবাহের হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যা, যাকে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফ বলা হয়, একটি বড় ঝুঁকি। হিমবাহের বরফ গলে তৈরি কোনো হ্রদের পানি আকস্মিকভাবে বেরিয়ে গেলে নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
গত বছরের জুলাইয়েও একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। চীনের গিয়িরং কাউন্টি থেকে প্রবল ঢল নেমে নেপালের রসুয়া জেলায় আঘাত হানে। তবে এবারের দুর্যোগের পেছনে জিএলওএফ কাজ করেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আকস্মিক বন্যার পর একটি বাড়ি কাদা ও পলিমাটিতে তলিয়ে আছে। দেবঘাট, নুয়াকোট, নেপাল, ২৬ আগস্ট। ছবি: এএফপি
ডরোথি হাইনরিখ বলেন, হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। তাপপ্রবাহ বাড়ছে, হিমবাহ সরে যাচ্ছে এবং স্থায়ীভাবে জমে থাকা বরফ গলছে। এসব পরিবর্তনের কারণে ভূমিধস ও হিমবাহের হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার মতো দুর্যোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ঘটনাটির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নির্ধারণে আগামী দিনগুলোতে বিজ্ঞানীরা বিশেষ ‘অ্যাট্রিবিউশন স্টাডি’ করতে পারেন। এতে বর্তমান উষ্ণ জলবায়ুতে এ ধরনের দুর্যোগের সম্ভাবনা কতটা বেড়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের জলবায়ুর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনাও করা হবে।
অর্থাৎ, নেপালের এবারের দুর্যোগের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে ভূমিধস, নদীর গতিপথ আটকে যাওয়া এবং আকস্মিক ঢলকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুগত পরিবর্তনের কোনো ভূমিকা আছে কি না, সেই উত্তর পেতে আরও গবেষণার অপেক্ষা করতে হবে।
সূত্র- এএফপি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au