আপিল বিভাগে নতুন বিচারপতি হাবিবুল গনি
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. হাবিবুল গনিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। এ নিয়োগের মধ্য দিয়ে আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা বেড়ে পাঁচজনে…
আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টি বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিনাশী নাম। বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ জন্মগ্রহণকারী এবং ১৩৭৯ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র প্রয়াণ ঘটে যাওয়া এই মহামানবের লেখনী আর জীবনদর্শন কেবল একটি নির্দিষ্ট সময় বা সমাজের গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল এক সর্বগ্রাসী মানবপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রেরণা ও পথনির্দেশক।
নজরুলের সাহিত্য জুড়ে রয়েছে মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীন এক সুন্দর পৃথিবীর আকুতি। ধর্ম, গোত্র বা জাতপাতের ঊর্ধ্বে তিনি সবসময় মানুষকে বড় করে দেখেছেন। তাঁর অমর বাণীগুলো আজও আমাদের চেতনায় নাড়া দেয়— “গাহি সাম্যের গান— / মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” এছাড়া “জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াৎ খেলছে জুয়া, / ছুঁলেই জাত যায় তো জাত কি এতই সোজা সোজা?” কিংবা “মম এক হাতে বাঁশের বাঁশী, আর হাতে রণ-তূর্য” এর মতো পঙক্তিতে একদিকে যেমন রয়েছে কোমল প্রেমের সুর, অন্যদিকে রয়েছে শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের ডাক।
তিনি হিন্দু-মুসলমান বা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতে নিজেকে বাঁধেননি, তাই তো তিনি গেয়েছেন— “হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? / কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান আমার মোর।”নজরুলের কর্মজীবন ছিল তাঁর বিশ্বাসের এক বাস্তব প্রতিফলন। তিনি শুধু কলম দিয়েই অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেননি, নিজের জীবনেও তা চর্চা করেছেন। বাংলা গজল ও শ্যামাসংগীত উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল অতুলনীয়। একই সঙ্গে তিনি যেমন রচনা করেছেন কালজয়ী ইসলামি গান ও হামদ-না’ত, তেমনি সৃষ্টি করেছেন অমূল্য শ্যামাসংগীত ও কালীকীর্তন। তাঁর ব্যক্তিজীবনেও এর প্রভাব স্পষ্ট ছিল; প্রমিলা দেবীকে বিবাহ করার মধ্য দিয়ে তিনি সমাজ ও গোঁড়ামির দেয়াল ভেঙে এক সাহসী অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
কাজী নজরুল ইসলামকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা এবং তাঁকে ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদায় ভূষিত করার পেছনে রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা। ১৯৭২ সালের ২৪ মে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং বিশেষ ব্যবস্থাপনায় কবিকে কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
কবিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভূষিত করা হয় এবং ধানমন্ডির একটি বাড়িতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়, যা আজ ‘নজরুল ভবন’ হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করা হয় এবং ১৯৭৬ সালে তাঁকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম এবং বাঙালির জাতীয় মুক্তির স্লোগান ‘জয় বাংলা’-র সাথে নজরুলের সাম্য ও বিদ্রোহের চেতনার এক গভীর মেলবন্ধন রয়েছে। নজরুল সবসময় শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। তাঁর ‘চল্ চল্ চল্’ (যা আমাদের রণসংগীত) কিংবা তাঁর বিদ্রোহী সত্তা বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে শক্তি যুগিয়েছিল। একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিকামী বাঙালি যখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে এগিয়ে গেছে, তখন তাদের মানসপটে প্রেরণা যুগিয়েছে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক ও সংগ্রামী চেতনা।
আজকের দিনে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে লড়তে নজরুলের চেতনা আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আসুন, জাতীয় কবির আদর্শকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলি। জাতীয় কবির প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি )
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au