বাংলাদেশ

আগে ‘শিবির’, এখন ‘ছাত্রলীগ’: বদলায়নি ট্যাগিংয়ের রাজনীতি

  • 12:36 pm - September 07, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৪ বার
আগে ‘শিবির’, এখন ‘ছাত্রলীগ’: বদলায়নি ট্যাগিংয়ের রাজনীতি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত করে চিহ্নিত করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ক্ষমতার সমীকরণ বদলালেও এই প্রবণতা পুরোপুরি বদলায়নি, পরিবর্তন এসেছে মূলত ব্যবহৃত পরিচয়ের ভাষায়। একসময় কাউকে ‘শিবির’, ‘জামায়াত’, ‘বিএনপি’, ‘জঙ্গি’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ উঠত। সাম্প্রতিক সময়ে ‘আওয়ামী লীগ’, ‘ছাত্রলীগ’ কিংবা ‘ফ্যাসিস্ট’ পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার কলেজশিক্ষার্থী সিফাত আব্দুল্লাহকে একটি পুরোনো সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো এবং তাঁর সঙ্গে ‘ছাত্রলীগ’ পরিচয় যুক্ত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে যে মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেই মামলার এজাহারে তাঁর নাম নেই। ওই ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও এখনও তদন্তাধীন।

গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিফাতের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গাজীপুরের গাছা এলাকা থেকে তাঁকে আটক করে পুলিশ। ভিডিওতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগের সময় প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অশালীন ও আপত্তিকর ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। পরদিন তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

সিফাতকে আটকের পর তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানান, সিফাতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, সিফাত ছাত্রলীগের সঙ্গে মিলে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।

তবে গত ২৭ জুনের ঘটনা নিয়ে করা যে মামলায় সিফাতকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেখানে তিনি এজাহারভুক্ত আসামি নন। ওই মামলায় ৫০ থেকে ৬০ জন অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন। ওই ঘটনার সঙ্গে সিফাতের সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে সিফাতের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কাউকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করার মাধ্যমে জনমনে তাঁর সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করা হচ্ছে কি না। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ধরনের চর্চা নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে শুধু ট্যাগের নাম পরিবর্তিত হয়েছে।

সিফাতকে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য দেওয়াসহ রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের বিষয়ে নূর খান লিটন বলেন, শুরুতেই কাউকে একটি পরিচয়ে চিহ্নিত করে জনগণের সামনে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাঁর মতে, কেউ অপরাধ করলে তাঁর বিচার হওয়া উচিত। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে পুরোনো মামলায় আসামি করা অন্যায় ও দুঃখজনক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এ ক্ষেত্রে প্রমাণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কাউকে গ্রেপ্তারের পরপরই ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘আওয়ামী লীগ’ কিংবা এ ধরনের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। চলমান রাজনৈতিক ও ক্ষমতার সংকটও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তবে খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা সম্ভাব্য উদ্দেশ্য এক বিষয়, আর তিনি কোনো অপরাধ করেছেন কি না, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কী অপরাধ করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, সেটিই মূল বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত। তাঁর ভাষ্য, পুলিশ কাউকে রাজনৈতিক ট্যাগ দেয় না।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ট্যাগিং বলতে এমন একটি প্রবণতাকে বোঝায়, যেখানে কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড ও তাঁর বিরুদ্ধে থাকা প্রমাণ যাচাইয়ের আগেই তাঁকে কোনো রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা মতাদর্শের পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সময় ও ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে এই পরিচয়ের ভাষাও বদলেছে।

২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় তালিকাভুক্ত করা হয়। ফলে কোনো ব্যক্তি সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত কি না কিংবা সংগঠনটির কোনো আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন কি না, তা তদন্তের বিষয় হতে পারে। তবে কাউকে ‘ছাত্রলীগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং আইন, সাক্ষ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে তাঁর সেই পরিচয় ও কোনো অপরাধে সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।

সিফাতের ক্ষেত্রেও তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ বা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে তাঁর স্বজনদের দাবি, সিফাত আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত নন এবং তিনি জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।

‘অশালীন বক্তব্য’ আর ‘সন্ত্রাস’ কি এক?

সিফাতকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোনো ধরনের অশালীন বা আপত্তিকর বক্তব্য সমর্থনযোগ্য নয়। তবে কোনো বক্তব্য আইন লঙ্ঘন করলে প্রচলিত আইনে তার বিচার ও জবাবদিহির সুযোগ রয়েছে।

তাঁর মতে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো গুরুতর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধের উপাদান এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকা জরুরি। শুধু একটি অভিযোগের ভিত্তিতে অন্য একটি গুরুতর অপরাধের সঙ্গে কাউকে যুক্ত করা উচিত নয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের বিরুদ্ধে আপত্তিকর বক্তব্যের অভিযোগ এবং কোনো সংগঠনের কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া কিংবা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় অপরাধ করা এক বিষয় নয়। একটি অভিযোগ থেকে অন্য অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না।

সিফাতের গ্রেপ্তার নিয়ে আইন প্রয়োগে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল। গত ৫ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, অশালীন ভাষা ব্যবহার শাস্তিযোগ্য হতে পারে। তবে একই ধরনের বক্তব্যের ক্ষেত্রে সবার প্রতি সমানভাবে আইন প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক পরিচয়ের ভুল প্রয়োগের পরিণতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যাচাইহীন বা অনুমাননির্ভর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ভয়াবহ পরিণতির ঘটনাও রয়েছে। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকায় দর্জি বিশ্বজিৎ দাসকে শিবির মনে করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেননি। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হয়ে তিনি নিহত হন।

২০১৯ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ক্ষেত্রেও তাঁর সম্ভাব্য শিবির-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহের বিষয়টি সামনে আসে। তদন্তে উঠে আসে, এমন সন্দেহের ভিত্তিতে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে আবরার হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়েও হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার অভিযোগ কোনোভাবেই একজন ব্যক্তির ওপর অমানবিক নির্যাতনকে বৈধতা দিতে পারে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের পেছনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘস্থায়ী একটি সমস্যা রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যখন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন ব্যক্তির নিজস্ব দায়ের পরিবর্তে তাঁর রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয় সামনে চলে আসে।

ফলে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা, তাঁর নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড এবং প্রমাণ যাচাইয়ের আগেই রাজনৈতিক পরিচয়টি জনমনে সবচেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে। আর এ কারণেই সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচার ও তদন্তের আগে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সামাজিকভাবে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা করা জরুরি।

এই শাখার আরও খবর

দুই মামলায় চিন্ময়ের জামিন হলেও মুক্তি মিলছে না

সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী দুই মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আরও মামলা থাকায় আপাতত কারামুক্তি মিলছে না বলে…

দুর্গোৎসবের আবহে সিডনিতে ‘দশেরা এক্সিবিশন’, এক ছাদের নিচে মিলবে দেশীয় ফ্যাশনের বৈচিত্র্য

শতদল তালুকদার, সিডনি: প্রবাসের মাটিতে বাঙালি ও দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য, নান্দনিকতা এবং উৎসবের আবহকে আরও বর্ণিল করে তুলতে সিডনির গ্রানভিল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে…

অস্ট্রিয়ায় মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধের উদ্যোগ

‘রাজনৈতিক ইসলাম’ ও উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগে মুসলিম ব্রাদারহুডসহ কয়েকটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে অস্ট্রিয়া সরকার। দেশটির সংবিধানের আওতায় এসব সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের…

ইয়েমেনে ভয়াবহ সংঘর্ষ, একদিনেই নিহত ১৪১

ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার-সমর্থিত বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ১৪১ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। শনিবার দুপুর থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত কয়েকটি…

সন্তানকে সম্পত্তি দানের পরও বাবা-মায়ের অধিকার, সংসদে বিল পাস

সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও দখলে রাখার অধিকার নিশ্চিত করতে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে…

বিতর্কিত ১০০ কোটি ডলারের এলএনজি চুক্তি, বড় ধরণের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই রাজনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে উচ্চ ব্যয়ের একটি নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au