মেঘালয়ে তামাকমুক্ত গ্রাম কর্মসূচি। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের মেঘালয়ে তামাকমুক্ত গ্রাম (Tobacco-Free Village) কর্মসূচি দ্বিতীয় বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। রাজ্যের ইস্ট খাসি হিলস ও ওয়েস্ট জয়ন্তিয়া হিলস জেলার ১ হাজার ২৯৫টি গ্রাম স্বাস্থ্য পরিষদের (VHC) মধ্যে ৫৩১টি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে তামাকমুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে।
জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন (NHM) মেঘালয়, মেঘালয়া স্টেট রুরাল লাইভলিহুডস সোসাইটি (MSRLS) এবং সম্বন্ধ হেলথ ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে ২০২৪ সালে কর্মসূচিটি চালু হয়। প্রথম বছরে তামাকমুক্ত VHC-এর সংখ্যা ছিল ২৬৪টি। দ্বিতীয় বছরে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
NHM মেঘালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুই জেলায় ১ হাজার ৩৯টি VHC এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। দ্বিতীয় বছরে ৫ হাজার ৫০০টির বেশি তামাকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মেঘালয়ের স্টেট নোডাল অফিসার ডা. নবনীতা ডি. মাওরি বলেন, শুধু কাগজে-কলমে কোনো গ্রামকে তামাকমুক্ত ঘোষণা করাই এই কর্মসূচির লক্ষ্য নয়। বরং তামাক নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা এবং নিজেদের উদ্যোগে পরিবর্তন আনার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মেঘালয়ের এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি VHC-কে তামাকমুক্ত গ্রামবিষয়ক একজন নোডাল কর্মকর্তা নিয়োগ, জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন, বিদ্যালয়ের আশপাশে তামাকজাত পণ্য বিক্রি সীমিত করতে স্থানীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জনসমাগমস্থলে ধূমপানবিরোধী ব্যবস্থা কার্যকর এবং তামাকবিরোধী সাইনবোর্ড স্থাপনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হয়।
নির্ধারিত ছয়টি কার্যক্রমের মধ্যে অন্তত পাঁচটি সম্পন্ন ও যাচাই হওয়ার পর একটি VHC-কে তামাকমুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
কর্মসূচির ফলে VHC-এর সভা, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) বৈঠক এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তামাক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা বেড়েছে।
শেলা ব্লকের মাওমলুহ গ্রামের VHC-এর চেয়ারম্যান জানান, কর্মসূচির কারণে গ্রামটিতে তামাক ব্যবহারের অভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। তার দাবি, গ্রামের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ চায়ের দোকান, বাসস্ট্যান্ড ও সামাজিক অনুষ্ঠানের মতো জনসমাগমস্থলে ধূমপান বা তামাক ব্যবহার বন্ধ করেছেন। এছাড়া ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ বাড়ির ভেতরে ধূমপান বন্ধ করেছেন, বিশেষ করে শিশু ও নবজাতকদের আশপাশে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাকজাত পণ্য বিক্রি বন্ধ করাও কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য VHC-এর নোডাল কর্মকর্তারা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের এলাকায় নজরদারি করছেন।
তামাকবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে MSRLS। প্রতিষ্ঠানটির ভিলেজ অর্গানাইজেশন, স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও VHC-এর বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে তামাকবিরোধী বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
MSRLS-এর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রোনাল্ড কিন্টা বলেন, গ্রাম পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের প্রতি মানুষের যে আস্থা রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে তামাক প্রতিরোধের বার্তা ঘরে ঘরে এবং দৈনন্দিন আলোচনায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে একটি সামাজিক লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে শিলংয়ে আয়োজিত রাজ্য পর্যায়ের অনুষ্ঠানে ভালো পারফরম্যান্সের জন্য তিনটি VHC-কে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে মেঘালয় সরকার। তাদের প্রশংসাপত্রের পাশাপাশি নগদ পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে।
সম্বন্ধ হেলথ ফাউন্ডেশনের ডিজিটাল কর্মসূচি বাস্তবায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে কর্মসূচিটি পরিচালিত হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে VHC, তামাকমুক্ত গ্রামবিষয়ক নোডাল কর্মকর্তা এবং কমিউনিটি জেন্ডার অ্যান্ড হেলথ অ্যাক্টিভিস্টরা বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছেন।
ডা. মাওরি জানান, তামাক নিয়ন্ত্রণে এই কমিউনিটিনির্ভর পদ্ধতি ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তামাকমুক্ত গ্রাম গড়ে তোলার স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছে।
২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মসূচির তৃতীয় বছর শুরু হয়েছে। আগামী দিনে মেঘালয়ের দুই অংশগ্রহণকারী জেলায় গ্রাম পর্যায়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র-নর্থইস্ট নিউজ