শীতলক্ষ্যায় গোসলে নামার আগে সেলফিতে নারী–শিশুসহ ছয়জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন তলিয়ে গিয়েছিলেন। দুজনকে টেনে তোলা গেলেও অন্য তিনজন নিখোঁজ ছিলেন। গতকাল শনিবার দুজনের লাশ উদ্ধার হয়। অন্যজন এখনো নিখোঁজ। ছবি: সংগৃহীত
মেজ জামাতা সৌদি আরব থেকে ছুটিতে দেশে এসেছেন। তাই তিন মেয়ের পরিবারকে বাড়িতে দাওয়াত করেছিলেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক মজিবুর রহমান ওরফে সুখচাঁন। দুপুরে সবাই মিলে খাওয়াদাওয়া শেষে বাড়ির কাছেই শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে যান পরিবারের ছয় সদস্য।
সেই গোসলই কেড়ে নিল তাঁর সব সুখ।
নদীতে নেমে একে একে তলিয়ে যান পাঁচজন। শিশুসন্তানসহ মেজ মেয়ে শাহীনুর আক্তারকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও নিখোঁজ হন তাঁর স্বামী ওবায়দুল্লাহ, ছোট মেয়ে শান্তা এবং বড় মেয়ের একমাত্র ছেলে শান্ত। তাঁদের মধ্যে শনিবার দুজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। পরে উদ্ধার হয়েছে শান্তার মরদেহও। তবে নিখোঁজের প্রায় ৪৫ ঘণ্টা পরও হদিস মেলেনি নাতি শান্তর।
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামে সুখচাঁনের বাড়ি। বাড়ি থেকে শীতলক্ষ্যা নদী মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। সেই নদীতেই ছোট মেয়ে, মেজ জামাতা ও নাতিকে হারিয়ে এখন শোকে পাথর হয়ে গেছেন তিনি। কথা বলার শক্তিও যেন নেই। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছেন।
শনিবার বিকেলে লাখপুর গ্রামে সুখচাঁনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দোচালা টিনের ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে স্বজনদের আহাজারি। বাড়ির সামনে ও আশপাশে জড়ো হয়েছেন শত শত স্থানীয় মানুষ, প্রতিবেশী ও স্বজন। বিপদের এই সময়ে তাঁরা পরিবারটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সুখচাঁন জানান, ছোট মেয়ে শান্তার বিয়ের সময় মেজ জামাতা ওবায়দুল্লাহ সৌদি আরবে ছিলেন। ফলে ছোট জামাতার সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর কখনো সামনাসামনি দেখা হয়নি। অন্যদিকে, ওবায়দুল্লাহর ছুটিও শেষের দিকে ছিল। তাই তিন মেয়ের পরিবারকে একসঙ্গে বাড়িতে দাওয়াত করেছিলেন তিনি।
শুক্রবার দুপুর ১২টার মধ্যে স্বামী-সন্তান নিয়ে মেজ মেয়ে শাহীনুর বাড়িতে আসেন। তার আগেই চলে এসেছিলেন ছোট মেয়ে শান্তা এবং বড় মেয়ের একমাত্র ছেলে শান্ত। বড় মেয়েটি আগেই অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন।
জুমার নামাজের পর সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খান। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ওবায়দুল্লাহ বাড়ির কলপাড়ে গোসল করতে গেলে স্বজনেরা নদীতে গোসল করতে যাওয়ার কথা বলেন। এরপর দল বেঁধে তাঁরা শীতলক্ষ্যায় নামেন।
এরপরই ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার শীতলক্ষ্যায় গোসল করতে নেমে পাঁচজন পানিতে তলিয়ে যান। শিশুসন্তানসহ শাহীনুর আক্তারকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। অন্যদের উদ্ধারে গিয়ে নিখোঁজ হন সৌরভ মিয়া (১৮) নামের আরও একজন।
শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযান চালিয়েও নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরদিন শনিবার সকাল ১০টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ওবায়দুল্লাহ ও সৌরভের মরদেহ উদ্ধার করে।
এরপর দুপুরের দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ভেসে ওঠে শান্তার (২৫) মরদেহ। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ২৪ বছর বয়সী তরুণ শান্ত।
তাঁকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পরিবারের ওপর নেমে আসা এই শোক যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না সুখচাঁন। তাঁর কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছে একই আক্ষেপ।
তিনি বলেন, ‘এত কইরা কইলাম, নদীত যাওয়ার দরকার নাই, অন্য কোনোখান থাইক্যা ঘুইরা আসো। আমার কতা শুনল না, তারা নদীতই গেল।’
এরপর যেন এক নিঃশ্বাসে বলে যান পরিবারের একের পর এক শূন্যতার কথা।
‘তিন মাইয়ার ঘরে তিনজন নাই। বড় মেয়েডা অসুখে মারা যাওয়ার পর জামাই আর বিয়ে করে নাই। হেগর ছেলে শান্তরে ছোটত্তে একাই মানুষ করছে। মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়া দেশের বাইরে যাওয়ার নিয়ত করছিল। ওই নাতিই আর নাই। গত বছর বিয়া দিলাম যে মাইয়ারে, হেও নাই। কয়েক দিন পর সৌদি যাওয়ার কথা যে জামাইর, হেও আর নাই। এত কষ্ট কেমনে সহ্য করমু?’
নিহত তিনজন হলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ভঙ্গাল এলাকার সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ (৩৮), গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামের ইসমাইল চৌধুরীর স্ত্রী শান্তা আক্তার (২৫) এবং নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে সৌরভ মিয়া (১৮)।
নিখোঁজ শান্তর বাড়ি টাঙ্গাইলে।
শিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কোহিনুর মিয়া জানান, নিখোঁজ তরুণকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের অভিযান চলছে। কোনো অভিযোগ না থাকায় পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ধার হওয়া তিনজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে তাঁদের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
সুখচাঁনের প্রতিবেশী ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য মিন্টু মিয়া বলেন, দোচালা টিনের ঘরে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে থাকেন সুখচাঁন। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়েই তাঁর সংসার চলে।
তিন মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন তিনি। মেজ জামাতা বিদেশ থেকে ছুটিতে আসায় তিন মেয়ের পরিবারকে একসঙ্গে বাড়িতে ডেকেছিলেন। কিন্তু সেই আনন্দের আয়োজনই মুহূর্তে পরিণত হয়েছে শোকে।
মিন্টু মিয়ার ভাষায়, শুক্রবারের ঘটনার পর সুখচাঁন একেবারেই ভেঙে পড়েছেন।