ভারতীয়দের ৪০ শতাংশের বেশি স্টুডেন্ট ভিসা বাতিল করল অস্ট্রেলিয়া। ছবিঃ সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করা হয়েছে। এর ফলে দেশটিতে শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনে প্রত্যাখ্যানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাত দিয়ে এবিসি নিউজ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুনে অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী ভিসার মোট আবেদনের ২৪ দশমিক ২ শতাংশ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এক দশক আগে, ২০১৬ সালের জুনে এই প্রত্যাখ্যানের হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ গত ১০ বছরে শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।
দেশভেদে প্রত্যাখ্যানের হারেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ৪০ শতাংশের বেশি ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে অস্ট্রেলিয়া। একই সময়ে নেপাল থেকে করা শিক্ষার্থী ভিসার অর্ধেকেরও বেশি আবেদন বাতিল হয়েছে।
অন্যদিকে চীনা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। দেশটির শিক্ষার্থীদের আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বাড়ার পেছনে দেশটির আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও অভিবাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থী ভিসা ব্যবস্থায় বর্তমানে ‘জেনুইন স্টুডেন্ট’ বা প্রকৃত শিক্ষার্থী হওয়ার শর্তকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই ব্যবস্থার আওতায় আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হয় যে, অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য সত্যিই পড়াশোনা করা এবং তিনি ভিসার শর্ত অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হতে চান।
ভিসা আবেদনের সময় অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ একজন আবেদনকারীর নিজ দেশের পরিস্থিতি, অস্ট্রেলিয়ায় তার সম্ভাব্য পরিস্থিতি, নির্বাচিত শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ কোর্সটি তার ভবিষ্যতের জন্য কতটা উপযোগী, আগের অভিবাসনসংক্রান্ত ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে।
এর ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে ইচ্ছুক ভারতীয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদেরও এখন নিজেদের শিক্ষার পরিকল্পনা আরও পরিষ্কার ও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তুলে ধরতে হচ্ছে।
বিশেষ করে একজন শিক্ষার্থীর আগের শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় যে কোর্সে ভর্তি হতে চাইছেন, তার যৌক্তিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকার বলছে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বাড়ার অর্থ এই নয় যে নির্দিষ্ট কোনো দেশের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ভিসা বাতিল করা হচ্ছে। বরং যেসব আবেদন ভিসার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করছে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই বাড়ানো হয়েছে।
সরকারের অবস্থান হলো, প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয় এবং দেশটির অভিবাসন আইন ও সংশ্লিষ্ট ভিসা শর্তের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে এই কঠোরতা অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এবিসি নিউজের সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অতিরিক্ত কঠোর নীতির কারণে প্রকৃত ও যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাও অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে অস্ট্রেলিয়া যদি বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কম স্বাগতপূর্ণ একটি দেশ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে, তাহলে এর প্রভাব দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা খাতেও পড়তে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে একদিকে অভিবাসন ও ভিসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সঠিকতা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে প্রকৃত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়াকে আকর্ষণীয় রাখা, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির ৪০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়ায় অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে ইচ্ছুক ভারতীয় শিক্ষার্থীদের এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে আবেদন প্রস্তুত করতে হবে।
একইভাবে নেপালি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রত্যাখ্যানের হার ৫০ শতাংশের বেশি হওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভিসা ব্যবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার কঠোর অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট করছে। বিপরীতে চীনা শিক্ষার্থীদের আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হওয়ায় দেশভেদে আবেদন যাচাইয়ের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের শুধু কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেই হবে না। কেন নির্দিষ্ট কোর্সটি বেছে নেওয়া হয়েছে, সেটি আগের পড়াশোনা বা কাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত এবং ওই শিক্ষা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে কীভাবে কাজে লাগবে, এসব বিষয়ও আবেদনপত্রে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থী ভিসা ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ভিসা আবেদনের সংখ্যা নয়, আবেদনকারীর প্রকৃত শিক্ষাগত উদ্দেশ্য, পূর্ববর্তী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতাই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সূত্রঃ ইন্ডিয়া ট্যুডে