“বাংলাদেশি হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস, যিনি প্রায় দুই বছর ধরে কারাগারে ছিলেন, মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পান। ছবি: রয়টার্স
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সেই বিখ্যাত ছবিটির কথা মনে আছে? ন্যাপাম হামলার পর নগ্ন অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে এক ভিয়েতনামী শিশু। সায়গনের প্রায় ২৬ মাইল দূরের একটি গ্রামে তোলা পুলিৎজারজয়ী সেই ছবিটি একটি শিশুর আতঙ্কের মধ্য দিয়ে পুরো যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তুলে ধরেছিল।
অথবা ১৯৯৩ সালের মার্চে তৎকালীন সুদানের দক্ষিণাঞ্চলে তোলা সেই আলোচিত ছবিটি। দক্ষিণ আফ্রিকার আলোকচিত্রী কেভিন কার্টারের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল অপুষ্টিতে ভোগা এক শিশু মাটিতে পড়ে আছে, আর তার পেছনে অপেক্ষা করছে একটি শকুন। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের নির্মম চিত্র তুলে ধরা ওই ছবিকে ঘিরে অনেকের ধারণা হয়েছিল, সেখানে যেন দুটি শকুন ছিল। একটি শিশুটির পেছনে, আরেকটি ক্যামেরার পেছনে।
গত সপ্তাহে বাংলাদেশও এমন একটি ছবি দেখল, যা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশি হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রায় দুই বছর কারাগারে থাকার পর মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পান। কিন্তু মায়ের মরদেহের পাশে গিয়ে তিনি নিজেকে সামলাতে পারেননি। শিশুর মতো কাঁদছিলেন তিনি।
৭১ বছর বয়সী তার মায়ের শেষ ইচ্ছাগুলোর একটি ছিল মৃত্যুর আগে একবার ছেলেকে দেখা। কিন্তু সেই সুযোগ তিনি পাননি। কর্তৃপক্ষ তাকে ছেলের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়নি। মা মারা যাওয়ার পরই কেবল ছেলেকে কারাগার থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
মায়ের মরদেহের পাশে ভেঙে পড়া এক হিন্দু সন্ন্যাসীর সেই ছবি শুধু ব্যক্তিগত শোকের দৃশ্য নয়। লেখকের দৃষ্টিতে, এটি বাংলাদেশে হিন্দুদের বর্তমান অবস্থার একটি প্রতীকী চিত্র, যেখানে নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ২০২৪ সালের আগে বাংলাদেশে সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। শেখ হাসিনার সরকারের সময় প্রকাশিত একটি মানবাধিকার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে লেখক দাবি করেছেন, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ৩ হাজার ৬০০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন।
সেই সময়েও বিভিন্ন অজুহাতে সময় সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২১ সালের ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহগুলোর একটি। সে সময় দুর্গাপূজার একটি মণ্ডপে কোরআনের একটি কপি পাওয়া যাওয়াকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরে জানা যায়, একজন মুসলিম ব্যক্তি সেখানে কোরআনের কপিটি রেখেছিলেন। তবে ততক্ষণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়।
লেখক উল্লেখ করেছেন, ওই ঘটনায় ১১৭টি হিন্দু মন্দির বা পূজামণ্ডপ এবং ৩০১টি দোকান ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
লেখকের মতে, বাংলাদেশি সমাজে হিন্দুদের ‘অন্য’ হিসেবে দেখার প্রবণতা অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল এবং ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা বারবার ঘটলেও রাষ্ট্র অনেক সময় পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেয়নি। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল সংখ্যালঘুদের ওপর ধীরে ধীরে চাপ তৈরি হওয়া এবং দেশ ছাড়ার প্রবণতা বাড়া।
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হলেও দেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ কমেছে বলে লেখায় দাবি করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাতের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক আরও বলেছেন, বর্তমান হারে দেশত্যাগ অব্যাহত থাকলে ৩০ বছর পর বাংলাদেশে কোনো হিন্দু অবশিষ্ট থাকবে না। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক বারকাত তার গবেষণার ভিত্তিতে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকের বিশ্লেষণে, ২০২৪ সালের আগের পরিস্থিতিকে মার্কিন লেখক রিচার্ড এল. বেনকিনের বাংলাদেশের ওপর লেখা A Quiet Case of Ethnic Cleansing বইয়ের শিরোনামের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এখানে ‘Quiet’ বা ‘নীরব’ শব্দটিকেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। কারণ, হত্যাকাণ্ড, সম্পত্তি ভাঙচুর ও দেশত্যাগের ঘটনা ঘটলেও সেগুলো অনেক সময় ধীরগতির ও তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার মতো চলেছে বলে তার দাবি।
লেখাটিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর শেখ হাসিনা যে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী শক্তিগুলোকে প্রায় ১৫ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও বেশি দৃশ্যমানতা ও রাজনৈতিক পরিসর পেয়েছে।
লেখকের মতে, এর ফলে সংখ্যালঘুদের জীবন ও অধিকার পর্যাপ্তভাবে সুরক্ষিত থাকবে, এমন প্রত্যাশাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও মনে করেন, হিন্দুদের প্রতি বৈষম্যের পেছনে ইসলামপন্থী রাজনীতির পাশাপাশি আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক মনোভাবও ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে হিন্দুদের দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই রাজনৈতিক পরিচয় তাদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ঘটনা লেখকের কাছে হিন্দুধর্মের দুই বিশিষ্ট সন্ন্যাসী আদি শঙ্করাচার্য ও স্বামী বিবেকানন্দের কথা মনে করিয়ে দেয়।
আদি শঙ্করাচার্য সন্ন্যাস গ্রহণের পরও অসুস্থ মায়ের প্রতি দায়িত্ব থেকে সরে যাননি বলে ধর্মীয় ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে। মায়ের মৃত্যুর আগে তার সেবায় থাকার কারণে তাকে সন্ন্যাসধর্মের প্রচলিত রীতির বাইরে যেতে হয়েছিল। এমনকি তার আত্মীয়দের একাংশ শেষকৃত্যেও সহযোগিতা করেননি বলে ঐতিহ্যগত বর্ণনায় পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত শঙ্করাচার্য নিজেই মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।
স্বামী বিবেকানন্দও সন্ন্যাসী হওয়ার পর মায়ের কথা ভুলে যাননি। ১৮৯৩ সালে শিকাগোর ঐতিহাসিক বক্তৃতার পর তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপরও মায়ের আর্থিক দুরবস্থা দূর করতে বন্ধু ও অনুসারীদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
লেখকের মতে, এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সন্ন্যাস গ্রহণ মানেই পারিবারিক দায়িত্ব ও মায়ের প্রতি সন্তানের কর্তব্য সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও শেষবার তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষাকেও লেখক একই ধরনের মানবিক ও নৈতিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, একজন ছেলেকে মায়ের মৃত্যুর আগে শেষবার দেখা করতে না দেওয়ার ঘটনা তাই শুধু ব্যক্তিগত বেদনার বিষয় নয়, বাংলাদেশের একজন হিন্দু নাগরিকের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
একটি ছবি দিয়ে কোনো দেশের পুরো বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা যায় না। একজন মানুষের ব্যক্তিগত শোক দিয়েও একটি দেশের রাজনীতি সম্পর্কে সব বিতর্কের নিষ্পত্তি সম্ভব নয়।
তবু কখনো কখনো একটি ছবি সরকারি বিবৃতি, কূটনৈতিক বার্তা কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়েও বেশি কিছু তুলে ধরে। লেখকের মতে, মায়ের মরদেহের পাশে চিন্ময় দাসের কান্নার ছবিটি তেমনই একটি মুহূর্ত।
লেখাটিতে এই ছবিকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে দাবি করা হয়েছে, দেশটি ইসলামপন্থী শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।
লেখকের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে ভারতের উচিত বাংলাদেশ নিয়ে নিজেদের নীতি নতুন করে বিবেচনা করা। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী শক্তির রাষ্ট্রীয় প্রভাব আরও বাড়তে থাকলে ভারতকে দুই দেশের স্বাভাবিক ও স্বাভাবিকীকৃত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
তার ভাষায়, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন শুধু আরেকটি কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না। বরং দুই দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
আর মায়ের মরদেহের পাশে কান্নারত এক সন্ন্যাসীর ছবি সেই বাস্তবতার একটি গভীর ও বেদনাদায়ক প্রতীক হয়ে উঠেছে বলে লেখাটির উপসংহারে বলা হয়েছে।
লেখক পরিচিতি: উৎপল কুমার। Bharat Rising: Dharma, Democracy, Diplomacy এবং Eminent Distorians: Twists and Truths in Bharat’s History বইয়ের লেখক।