আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারসহ দুর্নীতির নতুন অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।…
কিছু আলোকচিত্র এমনভাবে একটি সময়ের ইতিহাস তুলে ধরে, যা একটি বই—এমনকি একাধিক বইও—হয়তো এতটা মর্মস্পর্শীভাবে প্রকাশ করতে পারে না।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সেই বিখ্যাত ছবিটির কথা মনে আছে? ন্যাপাম হামলার পর নগ্ন অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে এক ভিয়েতনামী শিশু। সায়গনের প্রায় ২৬ মাইল দূরের একটি গ্রামে তোলা পুলিৎজারজয়ী সেই ছবিটি একটি শিশুর আতঙ্কের মধ্য দিয়ে পুরো যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তুলে ধরেছিল।
অথবা ১৯৯৩ সালের মার্চে বর্তমান দক্ষিণ সুদানে দক্ষিণ আফ্রিকার আলোকচিত্রী কেভিন কার্টারের তোলা সেই বিখ্যাত—কিংবা কুখ্যাত—ছবিটির কথা ভাবুন। তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা একটি শিশু মাটিতে পড়ে আছে, আর তার কিছু দূরে ওত পেতে আছে একটি শকুন। সেই ছবি অঞ্চলটিকে গ্রাস করা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের নির্মমতা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেছিল। অনেকে তখন বলেছিলেন, ছবিটিতে আসলে দুটি শকুন ছিল—একটি শিশুটির পেছনে, অন্যটি ক্যামেরার পেছনে!
গত সপ্তাহে বাংলাদেশেও এমন একটি ছবি সামনে এসেছে, যা আমাদের গভীরভাবে বিচলিত করা উচিত।
প্রায় দুই বছর ধরে কারাবন্দী বাংলাদেশের হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে তাঁর মায়ের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের জন্য মাত্র পাঁচ ঘণ্টার প্যারোল দেওয়া হয়েছিল। সেখানে তিনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।
তাঁর ৭১ বছর বয়সী মা একটি অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়েই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন—মৃত্যুর আগে আর একবার বন্দী ছেলেকে দেখবেন। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ সেই শেষ সাক্ষাতের অনুমতি দেয়নি। মায়ের জীবিত অবস্থায় ছেলেকে তাঁর কাছে যেতে দেওয়া হয়নি; মায়ের মৃত্যুর পরই কেবল তাঁকে কারাগার থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য বের হতে দেওয়া হলো।
মায়ের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া এক হিন্দু সন্ন্যাসীর সেই ছবি নিছক ব্যক্তিগত শোকের দৃশ্য নয়। আমার কাছে এটি আজকের বাংলাদেশে একজন হিন্দু হিসেবে বেঁচে থাকার অর্থ কী, তারই এক প্রতিকৃতি—যেখানে জীবন অনিরাপদ, অধিকার ভঙ্গুর এবং ভবিষ্যৎ গভীর অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন।
এর অর্থ এই নয় যে ২০২৪ সালের আগে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অবস্থা ভালো ছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রকাশিত একটি মানবাধিকার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ৩ হাজার ৬০০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছিল। শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন।
সেই সময়েও নানা অজুহাতে মাঝেমধ্যেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ত এবং প্রায় প্রতিবারই একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতো।
ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল ২০২১ সালে, যখন একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপে পবিত্র কোরআনের একটি কপি পাওয়া যায়। পরে জানা যায়, একজন মুসলিম ব্যক্তি সেটি সেখানে রেখেছিলেন। কিন্তু সত্য প্রকাশিত হওয়ার আগেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সহিংসতায় ১১৭টি হিন্দু মন্দির অথবা পূজামণ্ডপ এবং ৩০১টি দোকান ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
হিন্দুদের ‘অপর’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বাংলাদেশের সমাজে ইতিমধ্যেই একটি ভয়াবহ ও ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠা বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বারবার সংঘটিত হলেও রাষ্ট্র সাধারণত পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হতো।
কিন্তু সংখ্যালঘুদের জন্য এসব ঘটনার সম্মিলিত পরিণতি ছিল ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়া—এক ধরনের নীরব মৃত্যু।
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হলেও দেশটিতে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ কমেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাতের গবেষণা বিশ্বাসযোগ্য হলে, বর্তমান হারে দেশত্যাগ অব্যাহত থাকলে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে কোনো হিন্দু অবশিষ্ট থাকবে না।
বাংলাদেশ থেকে সংখ্যালঘুদের চলে যাওয়ার আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ নিয়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা করা অধ্যাপক বারকাত গত ৪৯ বছরের দেশত্যাগের হার বিশ্লেষণ করে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সেই অর্থে ২০২৪ সালের আগের পরিস্থিতি বাংলাদেশকে নিয়ে মার্কিন লেখক রিচার্ড এল বেনকিনের বইয়ের শিরোনাম—A Quiet Case of Ethnic Cleansing—বা ‘জাতিগত নির্মূলের এক নীরব ঘটনা’র কাছাকাছি ছিল।
এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শব্দটি হচ্ছে—‘নীরব’।
আগেও হত্যা হয়েছে, নিয়মিতভাবে সম্পত্তি ও উপাসনালয় ভাঙচুর করা হয়েছে এবং সংখ্যালঘুরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে নীরবে দেশ ছেড়েছেন। পার্থক্য ছিল, হিন্দুদের বিরুদ্ধে সেই সহিংসতা প্রায়ই একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্যে সংঘটিত হতো। সেটি ছিল ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা এক মৃত্যু।
২০২৪ সালের আগস্টের পর জামায়াত নেতৃত্বাধীন যেসব ইসলামপন্থী শক্তিকে শেখ হাসিনা তাঁর ১৫ বছরের শাসনামলে কখনো সফলভাবে, আবার কখনো ব্যর্থভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে অনেক বেশি দৃশ্যমানতা এবং প্রভাব অর্জন করেছে।
তাদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের জীবন ও অধিকার যথাযথভাবে রক্ষা করা হবে—এমন লোকদেখানো প্রতিশ্রুতিটুকুও ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে।
এই বৈষম্যের দুটি মাত্রা রয়েছে—একটি ইসলামপন্থী, অন্যটি আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের হিন্দুদের দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শেখ হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এই ধারণা এমনিতেই অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি সম্প্রদায়কে আরও বেশি বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে হিন্দুধর্মের দুই মহান সন্ন্যাসী—আদি শঙ্করাচার্য ও স্বামী বিবেকানন্দের কথা মনে করিয়ে দেয়। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মতো তাঁরাও সন্ন্যাস গ্রহণের পর মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ ধরে রেখেছিলেন।
প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, আদি শঙ্করাচার্য সন্ন্যাসজীবনের প্রথাগত বিধিনিষেধ অতিক্রম করে অসুস্থ মায়ের মৃত্যুর আগে তাঁর সেবা করেছিলেন। সন্ন্যাসের নিয়ম ভাঙার কারণে নাম্বুদিরি সম্প্রদায়ের স্বজনদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। তাঁরা তাঁর মায়ের শেষকৃত্য বর্জন করেছিলেন এবং চিতা প্রস্তুত করতেও সহযোগিতা করেননি। শেষ পর্যন্ত শঙ্করাচার্যকে একাই মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে হয়েছিল।
১৮৯৩ সালে শিকাগোতে ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জনের পরও স্বামী বিবেকানন্দ কখনো তাঁর মায়ের কথা ভুলতে পারেননি। মায়ের আর্থিক কষ্ট লাঘবের জন্য তিনি বারবার বন্ধু ও অনুসারীদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন।
আধ্যাত্মিক মর্যাদার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেও মায়ের জন্য বিবেকানন্দের এই উদ্বেগ তাঁকে শুধু মানবিক করে তোলেনি; এটি সন্ন্যাসজীবন সম্পর্কেও একটি বিশেষ উপলব্ধি সামনে এনেছিল। আদি শঙ্করাচার্যের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন না যে জাগতিক আসক্তি ত্যাগ করার অর্থ মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও ভালোবাসাকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা।
মায়ের প্রতি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ভালোবাসা ও গভীর আকুলতার মধ্যেও একই ধরনের মানবিক বন্ধন প্রকাশ পেয়েছে। এই সম্পর্ক সন্ন্যাসজীবনের প্রথাগত বিধিনিষেধ অতিক্রম করে একটি উচ্চতর নৈতিক ও আবেগিক অবস্থান ধারণ করে।
একজন সন্তানকে মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো তাঁর মায়ের সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আজকের বাংলাদেশে একজন হিন্দু হিসেবে বেঁচে থাকার করুণ বাস্তবতারও প্রতীক।
একটি আলোকচিত্র দিয়ে কোনো দেশের সম্পূর্ণ বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা যায় না। একইভাবে একজন মানুষের শোক দিয়েও একটি দেশের রাজনীতি নিয়ে চলমান সব বিতর্কের নিষ্পত্তি সম্ভব নয়।
কিন্তু কখনো কখনো একটি ছবি এমন কিছু সত্য প্রকাশ করে, যা সরকারি বিবৃতি, কূটনৈতিক ভাষ্য এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের আড়ালে থেকে যায়।
মায়ের জন্য শোকাহত চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ছবিটি তেমনই একটি মুহূর্ত। আমার কাছে ছবিটি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দেয়, ঢাকা এখন ইসলামপন্থীদের শক্তিশালী প্রভাববলয়ের মধ্যে প্রবেশ করেছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকে নয়াদিল্লিরও বাংলাদেশের প্রতি তার নীতি পুনর্নির্ধারণের সময় এসেছে। ইসলামপন্থী শক্তিগুলো যদি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করতে থাকে, তাহলে ভারতের উচিত স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সম্ভাবনা নিয়ে অবশিষ্ট মোহ ত্যাগ করা।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেবল আরেকটি সাময়িক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না। সম্পর্কটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।
মায়ের নিথর দেহের পাশে এক সন্ন্যাসীর কান্নার ছবি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে—কেন এই সম্পর্ক আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে।
মূল নিবন্ধটি ভারতের সংবাদমাধ্যম Firstpost-এ প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই মতামত নিবন্ধটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করছে OTN Bangla।
লেখক পরিচিতি: উৎপল কুমার Firstpost ও News18-এর মতামত সম্পাদক। তিনি Bharat Rising: Dharma, Democracy, Diplomacy এবং Eminent Distorians: Twists and Truths in Bharat’s History গ্রন্থের লেখক।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au