আরব সাগরে ভারত-পাক নৌজাহাজের সংঘর্ষ, পাক কূটনীতিককে তলব নয়াদিল্লির
উত্তর আরব সাগরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় টহল দেওয়ার সময় ভারতীয় নৌসেনার একটি জাহাজের সঙ্গে পাকিস্তানি নৌসেনার একটি টহল জাহাজের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় দিল্লিতে নিযুক্ত…
পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথমবারের মতো একটি মহাকাশ অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে মহাকাশে দেশটির সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে কক্ষপথে মোতায়েন করা অস্ত্রটি কী ধরনের, এর সুনির্দিষ্ট সক্ষমতা কী এবং ঠিক কখন এটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি ওয়াশিংটন।
মার্কিন বিমান বাহিনীর সচিব ট্রয় মেইঙ্ক বলেছেন, শত্রুপক্ষের বৈরী কর্মকাণ্ড থেকে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখার জন্য কক্ষপথে থাকা এই অস্ত্র প্রয়োজনীয়। পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নতুন ধরনের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার কনফারেন্সে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রয় মেইঙ্ক মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তবে অস্ত্রটির কার্যপ্রণালি, অবস্থান, পাল্লা কিংবা এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি তিনি।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ভবিষ্যতের যেকোনো সংঘাতে মহাকাশ গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়া ও চীন মার্কিন সামরিক উপগ্রহের ওপর হামলা চালানো, সেগুলোর যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটানো এবং কার্যক্রম অকার্যকর করার সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে বলে দাবি করে আসছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন ঘোষণার পর মহাকাশে সম্ভাব্য অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে সতর্ক করেছে চীন। মঙ্গলবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া বন্ধ করা।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশে তাদের সামরিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানাই।’
মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের মোতায়েন করা অস্ত্রটি আসলে কী ধরনের, সে বিষয়ে এখনো কোনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়নি। মার্কিন কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেননি। ফলে এটি কোনো ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটানোর প্রযুক্তি, নাকি সরাসরি কোনো স্যাটেলাইট ধ্বংসে সক্ষম অস্ত্র, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মার্কিন স্পেস ফোর্সের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘স্পেস কন্ট্রোল’ বলতে মহাকাশ ক্ষেত্রকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মিশনকে বোঝায়। এসব মিশনের আওতায় প্রতিপক্ষের মহাকাশ সক্ষমতাকে বিঘ্নিত করা, দুর্বল করা এবং প্রয়োজন হলে ধ্বংস করার জন্য গতিশক্তিনির্ভর ও গতিশক্তিবিহীন উভয় ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হতে পারে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিচালনাকারী কমান্ডগুলোর নির্দেশনায় এসব সক্ষমতা আক্রমণাত্মক এবং প্রতিরক্ষামূলক উভয় উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা সম্ভব।
মহাকাশে সামরিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যে অস্ত্রের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, সেটি নিয়ে এখনো খুব সামান্য তথ্য জানা গেছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মহাকাশ ও যুদ্ধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. ব্লেডিন বোয়েন বিবিসিকে বলেন, এটি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবস্থার যেকোনো একটি হতে পারে।
রেডিও ফোরের টুডে অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় বোয়েন বলেন, তিনি পুরোপুরি অনুমানের ভিত্তিতে বলছেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা রেডিও জ্যামিং প্ল্যাটফর্মের কথা উল্লেখ করছে।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ ধরনের প্রযুক্তি পৃথিবীতেও ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট রেডিও যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটানো সম্ভব। মহাকাশে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা মোতায়েন করা হলে স্যাটেলাইট যোগাযোগ বা প্রতিপক্ষের মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
তবে আরেকটি সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন বোয়েন। তার মতে, এটি কোনো ধরনের গতিশক্তিনির্ভর ধ্বংসকারী অস্ত্রও হতে পারে। অর্থাৎ এমন কোনো ব্যবস্থা, যেখান থেকে প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করে অন্য কোনো উপগ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে সেটিকে ধ্বংস করা সম্ভব।
তবে এই সম্ভাবনাকে তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করেন তিনি। কারণ কোনো স্যাটেলাইটকে সরাসরি ধ্বংস করলে বিপুল পরিমাণ মহাকাশ আবর্জনা বা স্পেস ডেব্রিস তৈরি হতে পারে। এসব ধ্বংসাবশেষ কক্ষপথে ছড়িয়ে পড়লে অন্যান্য স্যাটেলাইট ও মহাকাশযানের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি দেশটির সামগ্রিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বলেছে, মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা এবং প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তাদের পরিকল্পিত ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেওয়া।
গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এতে মার্কিন স্পেস ফোর্সের ভূমিকাকে শুধু মহাকাশে থাকা মার্কিন সম্পদ রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োজন হলে আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা হিসেবেও তুলে ধরা হয়।
মার্কিন স্পেস ফোর্স প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০১৯ সালে। সাত দশকেরও বেশি সময় পর এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রথম নতুন শাখা। মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সুরক্ষা করাই ছিল এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এর মধ্যে সামরিক যোগাযোগ, নজরদারি ও নেভিগেশনের কাজে ব্যবহৃত শত শত স্যাটেলাইট রয়েছে।
বর্তমানে আধুনিক সামরিক ব্যবস্থায় স্যাটেলাইটের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবস্থান নির্ধারণ, ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন ধরনের নজরদারি কার্যক্রমে মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। ফলে কোনো দেশের স্যাটেলাইট ব্যবস্থা অকার্যকর করে দিতে পারলে যুদ্ধের ময়দানে তার বড় ধরনের কৌশলগত প্রভাব পড়তে পারে।
মহাকাশে অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৬৭ সালের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে কক্ষপথে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করা হয়। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রসহ গণবিধ্বংসী অস্ত্র মহাকাশে স্থাপন না করার বিষয়ে ওই চুক্তিতে বিধিনিষেধ রয়েছে।
তবে চুক্তির আওতার বাইরে মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা তৈরির জন্য বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের স্যাটেলাইট শনাক্ত করা, যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটানো এবং প্রয়োজনে সেগুলো অকার্যকর করার বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন করছে।
বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ভবিষ্যৎ সংঘাতে মার্কিন সামরিক স্যাটেলাইটকে লক্ষ্যবস্তু করার মতো সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে দুই দেশ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে দুটি রুশ স্যাটেলাইট অন্তত এক ডজন ইউরোপীয় স্যাটেলাইটের যোগাযোগে সম্ভবত আড়ি পেতেছিল। এর মাধ্যমে রুশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওই স্যাটেলাইটগুলোর পাঠানো সংবেদনশীল তথ্য পড়তে সক্ষম হয়ে থাকতে পারে। এমনকি তাত্ত্বিকভাবে এসব স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছিল, রাশিয়া এমন একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে, যেটি অন্য স্যাটেলাইটে হামলা চালাতে সক্ষম হতে পারে। তবে এ বিষয়ে রাশিয়া প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
মার্কিন স্পেস ফোর্সের ভাষ্য অনুযায়ী, চীন তার সামরিক আধুনিকীকরণ কৌশলের অংশ হিসেবে মহাকাশে বিভিন্ন ধরনের সক্ষমতা উন্নয়নের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে রাশিয়া মহাকাশকে যুদ্ধ পরিচালনার একটি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতে মহাকাশে প্রাধান্যকে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক উপাদান হিসেবে দেখে।
এ অবস্থায় কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের কথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি মহাকাশের সামরিকীকরণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে অস্ত্রটির প্রকৃতি ও সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী ধরনের ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে এবং সেটি ভবিষ্যতের সংঘাতে কীভাবে ব্যবহার করা হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
চীন ইতোমধ্যে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, পরিবর্তিত হুমকি মোকাবিলা এবং নিজস্ব মহাকাশ সম্পদ সুরক্ষার জন্য তাদের এই সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে প্রতিরক্ষামূলক প্রয়োজন আর মহাকাশে আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে সীমারেখা কোথায় থাকবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au