আরব সাগরে ভারত-পাক নৌজাহাজের সংঘর্ষ, পাক কূটনীতিককে তলব নয়াদিল্লির
উত্তর আরব সাগরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় টহল দেওয়ার সময় ভারতীয় নৌসেনার একটি জাহাজের সঙ্গে পাকিস্তানি নৌসেনার একটি টহল জাহাজের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় দিল্লিতে নিযুক্ত…
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। আগামী ডিসেম্বরেই চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগে বাংলাদেশকে নিজেদের পানির চাহিদা, অগ্রাধিকার ও আলোচনার সীমা স্পষ্ট করে একটি সুসংহত কৌশল নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
গঙ্গা অববাহিকা বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত। এই নদীর পানির ওপর দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ নির্ভরশীল। ফলে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু একটি পুরোনো চুক্তি নবায়নের বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গেও এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত।
১৯৯৬ সালের চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে পানি ভাগাভাগির নির্দিষ্ট কাঠামো, যৌথভাবে পানিপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ, জরুরি পরিস্থিতিতে পরামর্শ এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর চুক্তি পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তবে ওই চুক্তির পানি বণ্টন কাঠামো তৈরির সময় ফারাক্কায় ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত নথিভুক্ত পানিপ্রবাহের তথ্যকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত তিন দশকে গঙ্গার পানিপ্রবাহ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিস্থিতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে।
উজানে পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, সেচের সম্প্রসারণ, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহের পূর্বানুমান আরও কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সেচের কাজে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে নদী ও জলাধারে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের স্বার্থ জড়িত। ভারতের সংসদীয় পর্যালোচনার নথিতেও এই দুই রাজ্যের সঙ্গে পরামর্শের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিহারের পক্ষ থেকেও গঙ্গার পানি ও ফারাক্কা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজেদের স্বার্থের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে সামনে এসেছে। ফলে বাংলাদেশের আলোচনায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানের পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ সমীকরণও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশও নতুন চুক্তির জন্য ইতোমধ্যে কিছু প্রস্তুতি নিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে ১০ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিটি বিদ্যমান গঙ্গা চুক্তির আওতায় কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে। এর আগে মে মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের একটি যৌথ দল ফারাক্কা ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন এবং পানিপ্রবাহ পরিমাপের কাজ করে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং আরও পূর্বানুমানযোগ্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিল। নতুন আলোচনায় প্রতি সেকেন্ডে ৪০ হাজার ঘনফুট পানি পাওয়ার একটি লক্ষ্যের কথাও এসেছে। তবে এই লক্ষ্যের বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ভিত্তি কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ৩৫ হাজার ঘনফুট পানিপ্রবাহের একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তাই নতুন আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে দেশের প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণ বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে আলোচনায় সর্বনিম্ন কতটুকু পানি নিশ্চিত করা জরুরি, কোন বিষয়গুলোতে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে এবং কোন বিষয়গুলো বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য, সেগুলোও আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়েও দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ ১৪টি অভিন্ন নদীকে কেন্দ্র করে একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বিদ্যমান যৌথ নদী কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে নতুন চুক্তিতে শুধু কোন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করবে তা নয়, খরার সময় দুই দেশের মধ্যে কত দ্রুত তথ্য বিনিময় হবে, জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তা কীভাবে সমাধান করা হবে, সেসব বিষয়ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন চুক্তির প্রস্তুতিতে শুধু পানি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ গঙ্গার পানির সঙ্গে কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি, জনজীবন ও নদীনির্ভর মানুষের জীবিকার বিষয়গুলো সরাসরি জড়িত।
বাংলাদেশ চলতি বছরের জুনে নতুন গঙ্গা পানি বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার তারিখ নির্ধারিত হয়নি। এর মধ্যেও দুই দেশের কারিগরি পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। এই যোগাযোগকে ভবিষ্যৎ আলোচনার প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হলেও, কারিগরি সহযোগিতা আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার বিকল্প নয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেলেও দুই দেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন শুরুর কথা বলেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন গঙ্গা চুক্তিতে এমন কিছু কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিলেও পানি নিয়ে কারিগরি সহযোগিতা অব্যাহত রাখা যায়।
যৌথ পানিপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত তথ্য বিনিময়, নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যালোচনা এবং মতবিরোধ নিষ্পত্তির সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নতুন চুক্তিকে আরও কার্যকর করতে পারে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যতে পানিপ্রবাহের সম্ভাব্য পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে চুক্তিতে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যালোচনা ও অভিযোজনের সুযোগ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে আগামী গঙ্গা চুক্তি শুধু ১৯৯৬ সালের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয় নয়। পরিবর্তিত নদীপ্রবাহ, জলবায়ু পরিস্থিতি, বাংলাদেশের পানির চাহিদা এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর একটি পানি বণ্টন কাঠামো তৈরি করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগেই বাংলাদেশকে নিজেদের চাহিদা, অগ্রাধিকার, সীমা এবং সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রগুলো স্পষ্ট করে একটি শক্তিশালী ও সুসংহত আলোচনার কৌশল প্রস্তুত করতে হবে।
সুত্রঃ দ্য ডেইলি স্টার
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au