বাংলাদেশ

‘ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরব,প্রশ্ন কখন নয়, কীভাবে’: এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা

  • 9:46 pm - September 22, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬৮১ বার
শেখ হাসিনা। ছবিঃ সংগৃহীত

ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা কীভাবে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করবেন, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যেতে হলেও দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াবেন না বলে এনডিটিভিকে দেওয়া এক লাইভ অনলাইন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর দেশে ফেরার প্রশ্নটি এখন আর ‘কখন’ নয়, বরং ‘কীভাবে’ নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে দেশে ফেরা যায়, সেটিই মূল বিষয়। তিনি বলেছেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নিজের দেশে ফেরার জন্য তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান এবং দেশের মানুষের কাছে ফিরে যাওয়াকে নিজের অধিকার বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়, দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি এখনো ঠিক হয়নি। তবে প্রত্যাবর্তনটি শান্তিপূর্ণভাবে এবং আইনের কাঠামোর মধ্যেই হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, “আমি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আমার মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমার দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং বাংলাদেশের কোনো আইন ন্যায়সংগতভাবে আমাকে তা থেকে বিরত রাখতে পারে না।”

শেখ হাসিনা আরও বলেন, “আজ আমি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছি, আমি আমার মাতৃভূমি ও আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই। প্রশ্ন হলো না আমি ফিরব কি না, বরং কীভাবে এমনভাবে ফিরব, যাতে আমাদের দেশ ও দেশের নাগরিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।”

তবে তাঁর দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ বা ভারতের সরকারের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক কিংবা গোপন যোগাযোগ হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো তথ্য দেননি শেখ হাসিনা। তিনি শুধু বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং নানা ধরনের জল্পনা রয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের আগস্টে নয়াদিল্লিতে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনেও ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, দেশে ফিরে তাঁকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানো হতে পারে, এমনকি তাঁর জীবনের ঝুঁকিও থাকতে পারে।

মৃত্যুদণ্ডের রায়কে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বললেন শেখ হাসিনা

বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়েও এনডিটিভির কাছে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন শেখ হাসিনা। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রায়টি তিনি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘অন্যায্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।ছবিঃ বিবিসি

শেখ হাসিনার দাবি, তাঁর দেশত্যাগের পর গঠিত সরকার ছিল অসাংবিধানিক এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ উদ্দেশ্যে কাজ করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়া এবং দেওয়া রায়কে তিনি ‘প্রহসন’ বলেও অভিহিত করেছেন।

তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, দেশে ফিরে আইনি পরিণতি মোকাবিলায় তিনি প্রস্তুত। এমনকি কারাগারে যেতে হলেও তিনি রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াবেন না।

শেখ হাসিনা বলেন, “রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশের মানুষের সেবা করে যাওয়ার জন্য যদি কারাগারে যেতে হয়, তাহলে আমি সেই আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।”

তিনি আরও বলেন, তাঁর প্রত্যাশা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা তাঁর ক্ষেত্রে আইনকে ন্যায়সংগতভাবে প্রয়োগ করবে।

নিজের পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, সারা জীবন তিনি আইন ও ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করেছেন। তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিচারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজের ক্ষেত্রেও একইভাবে আইনের ন্যায়সংগত প্রয়োগ তিনি প্রত্যাশা করেন।

দেশে ফিরে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হলে নিজের অধিকার রক্ষায় ‘পূর্ণ আইনি সুরক্ষা’ দাবি করেছেন শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনে সক্রিয় থাকার ঘোষণা

দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকলেও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো ইঙ্গিত দেননি শেখ হাসিনা। বরং দলটির সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন এবং সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া দল এবং দেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ‘অভিভাবক’ হিসেবে তিনি দলটিকে দেখেন।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি পুনর্গঠন এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলের সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের কাজ তিনি ইতোমধ্যে শুরু করেছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “আমি এই পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়ায় একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের বিষয়টি দেখছি।”

নিজের বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ ও সম্মান করার কথাও বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের লক্ষ্য হচ্ছে গণতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের সব নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের এই ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে, যখন তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাঁকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ ভারতের কাছে রয়েছে এবং ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি প্রচলিত প্রক্রিয়ার আওতায় পরীক্ষা করা হচ্ছে।

উগ্রপন্থার হুমকি নিয়ে সতর্কতা

সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং উগ্রপন্থা নিয়েও কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হুমকিকে ‘গুরুতর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, এই হুমকিকে কোনোভাবেই অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পেয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

উগ্রপন্থা মোকাবিলায় গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নাগরিক স্বাধীনতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনার মতে, উগ্রপন্থার হুমকি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি আঞ্চলিক বিষয়ও। কারণ উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক ও মতাদর্শ কোনো একটি দেশের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

তিনি বলেন, “উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক ও মতাদর্শ কোনো একটি দেশের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে না, তারা সীমান্ত অতিক্রম করে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন রাখা বাস্তবসম্মত বা ফলপ্রসূ নয়।”

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: ফাইল

আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামনে দুটি পথ রয়েছে বলেও মনে করেন শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একদিকে রয়েছে আরও বেশি দমননীতি ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অন্যদিকে রয়েছে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি ও সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ।

তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং তাঁর মতে, একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামো নিরাপত্তাকেও শক্তিশালী করতে পারে।

শেখ হাসিনার ভাষায়, “কৌশলগত সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট। নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি পরস্পরকে শক্তিশালী করে।”

এদিকে তাঁর ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা এখন পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবেই রয়েছে। তিনি দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, কোন পথে ফিরবেন কিংবা কার সঙ্গে সমন্বয় করে ফিরবেন, সে বিষয়ে এনডিটিভিকে বিস্তারিত জানাননি। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারেও তিনি ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা বলেছেন এবং জানিয়েছেন, দেশে ফিরে গ্রেপ্তার বা অন্য আইনি পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তিনি বিবেচনায় রেখেছেন।

ফলে শেখ হাসিনার নতুন বক্তব্যে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তটি আরও স্পষ্ট হলেও, সেই প্রত্যাবর্তনের বাস্তব প্রক্রিয়া, তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি ব্যবস্থা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

সূত্রঃ এনডিটিভি

এই শাখার আরও খবর

রানি মুখোপাধ্যায়ের মা কৃষ্ণা মুখোপাধ্যায় আর নেই

বলিউড অভিনেত্রী রানি মুখোপাধ্যায়ের মা কৃষ্ণা মুখোপাধ্যায় মারা গেছেন। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান যশ রাজ ফিল্মস এক…

২০ লাখ এককালীন মাসে ২ লাখ চাঁদা দাবির অভিযোগ, কৃষকদল নেতা গ্রেপ্তার

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে পদ্মা অয়েল পিএলসির গোদনাইল ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে এককালীন ২০ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর কৃষকদলের…

‘বন্দে মাতরম্’ না গাইলেই ফৌজদারি মামলা নয়, বলল সুপ্রিম কোর্ট

ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকগত কারণে কেউ ‘বন্দে মাতরম্’ না গাইলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয় বলে পর্যবেক্ষণ করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। তবে এ…

হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ২৪ ঘণ্টার স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রাম্প টিভি’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চালু করেছে ২৪ ঘণ্টার স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রাম্প টিভি: দ্য এসেনশিয়ালস স্টেশন’। হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্মে…

জ্বলানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরদিনেই বাড়ল বাসভাড়া

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর দেশের বিভিন্ন রুটে বাসের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দূরপাল্লা ও রাজধানীসহ মহানগর এলাকায় কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা করে ভাড়া বাড়ানো…

ইয়েমেনে তীব্র লড়াই, দুই দিনে নিহত ১৫৪

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী এবং সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। গত দুই দিনের সংঘাতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫৪ জন নিহত হয়েছেন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au