বিশ্ব

জাতিসংঘে ইরানকে ট্রাম্পের দুটি প্রস্তাব, চুক্তি না হলে ‘ধ্বংস’ করার হুঁশিয়ারি

  • 3:32 am - September 23, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১১৩ বার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবিঃ সংগৃহীত

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইরানের সামনে মূলত দুটি পথ তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছে নতুন করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের পথে যাওয়া, অন্যটি হলো চুক্তিতে রাজি না হলে আরও কঠোর মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হওয়া।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত তেহরান একটি চুক্তিতে আসবে বলে তিনি আশাবাদী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন নভেম্বরে শেষ হওয়ার পর ইরানের সঙ্গে নতুন চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

ইরানকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প বলেন, তাঁর সামনে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করার ক্ষমতা রয়েছে, যেখানে দেশটির টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে না এলে ইরান ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়তে পারে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের সারকথা ছিল, তেহরানের জন্য চুক্তিতে না যাওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই। একই সঙ্গে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা হিসেবে উপস্থাপন করেন।

চুক্তির আশ্বাস, পাশাপাশি কঠোর হুঁশিয়ারি

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সামরিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই ট্রাম্পের এই বক্তব্য এলো। ওয়াশিংটন একদিকে তেহরানের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করেনি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প জাতিসংঘের ভাষণে ইরানকে নিয়ে একদিকে কঠোর অবস্থান নিলেও অন্যদিকে ভবিষ্যতে একটি চুক্তি হওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে।

ইরানের পক্ষ থেকেও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই দিনে রয়টার্স জানায়, একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং অবরোধ প্রত্যাহার করলে হরমুজ প্রণালি এক সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এ পথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবহন করা হয়। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। মঙ্গলবার সম্ভাব্য কূটনৈতিক অগ্রগতির আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও কমেছে।

যুদ্ধের পক্ষে ট্রাম্পের যুক্তি

জাতিসংঘের ভাষণে ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের ইরান নীতিরও ব্যাখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ফলে তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে আগের মার্কিন প্রশাসনগুলোর দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার বিপরীতে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থকে একই কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করা হয়।

তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত তেহরানকে একটি চুক্তির পথেই আসতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

ফলে ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থানকে একদিকে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ আলোচনার সুযোগ ধরে রাখার নীতি হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক চুক্তি

জাতিসংঘে ভাষণের পর ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের নেতাদের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছেন। চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে ট্রাম্প, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করে নেওয়ার ট্রাম্পের আগের দাবির পর্যায়ে যায়নি। তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও খনিজসম্পদসমৃদ্ধ এই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পথ তৈরি হয়েছে।

চুক্তির আগে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কথা তুলে ধরেন। জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ দেবে।

চুক্তি অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এর আগে বলা হয়েছিল, দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডে শীতল যুদ্ধের সময়কার একটি পুরোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পুনরায় চালু করা এবং পূর্বাঞ্চলে নতুন সামরিক উপস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগের অবস্থান ছিল আরও বিস্তৃত। তিনি একাধিকবার দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। তবে নতুন চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড করার বিষয়টি রাখা হয়নি। বরং নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ প্রশমনের পথ তৈরি হয়েছে।

‘চিরস্থায়ী হতে পারে’ চুক্তি

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন চুক্তিটিকে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মতো একটি সমঝোতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এতে ন্যাটো জোটের গুরুত্বও প্রতিফলিত হয়েছে এবং গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সম্মান করা হয়েছে।

ফলে চুক্তিটি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের কাঠামোও বজায় রাখছে।

রাশিয়া ও চীনের আর্কটিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও বেড়েছে। দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এখানে উল্লেখযোগ্য খনিজসম্পদ রয়েছে।

একই দিনে দুই ভিন্ন কূটনৈতিক বার্তা

ট্রাম্পের জাতিসংঘ ভাষণ এবং গ্রিনল্যান্ড চুক্তি একই দিনে হওয়ায় তাঁর পররাষ্ট্রনীতির দুটি দিক স্পষ্ট হয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা দেখিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধকে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি নতুন কাঠামোর মাধ্যমে সামাল দেওয়ার পথ নিয়েছেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের অধিবেশনে যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

এর মধ্যেই ইরানকে নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নতুন চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। ইরানের ক্ষেত্রে সামরিক চাপ ও আলোচনার সম্ভাবনা পাশাপাশি থাকলেও, কোনো চুক্তি কবে বা কী শর্তে হবে তা এখনো অনিশ্চিত।

অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে। ফলে জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনের শুরুতেই ইরান ও আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই শাখার আরও খবর

ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানজুড়ে বিক্ষোভের ডাক

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও ইসলামাবাদমুখী পদযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। কর্মসূচিকে কেন্দ্র…

১৫ মিনিটের জন্য বোয়িং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করবেন তারেক রহমান

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৩ সেপ্টেম্বর মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডন নেলসনের সঙ্গে…

১৪ কোটি টাকার সার কালোবাজারির অভিযোগ, ১০ ডিলারসহ কারাগারে ১৫

শেরপুরে সরকারি বরাদ্দের প্রায় ১৪ কোটি টাকা মূল্যের সার কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগে করা মামলায় ১০ বিসিআইসি সার ডিলারসহ ১৫ জনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (২২…

তিন শিশুকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ, একজন নিহত: নারীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা

অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের ব্লু মাউন্টেনস এলাকায় গাড়ির ভেতরে তিন শিশুকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগে ৪২ বছর বয়সী এক নারীর বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে। হামলায়…

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: পাম্প থেকে বাজার—প্রভাব পড়বে সর্বত্র

দেশে যেন নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবর। সাধারণ মানুষ যখন মূল্যস্ফীতির চাপে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে আবারও চার…

রানি মুখোপাধ্যায়ের মা কৃষ্ণা মুখোপাধ্যায় আর নেই

বলিউড অভিনেত্রী রানি মুখোপাধ্যায়ের মা কৃষ্ণা মুখোপাধ্যায় মারা গেছেন। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান যশ রাজ ফিল্মস এক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au