পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও ইসলামাবাদমুখী পদযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে ইমরান খানের তিন বোনকে আটক করা হয়েছে এবং পিটিআইয়ের আইনপ্রণেতা, নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধেও ধরপাকড় শুরু হয়েছে।
পিটিআই বলছে, ইমরান খানকে মুক্তি দিতে হবে এবং ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি কোনোভাবেই বাতিল করা হবে না। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, ইসলামাবাদে এমন কোনো বিক্ষোভ বা পদযাত্রা করতে দেওয়া হবে না, যা রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও জনসাধারণের চলাচল ব্যাহত করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি পিটিআইকে কর্মসূচি থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দলটি কর্মসূচিতে এগিয়ে গেলে সরকার ‘পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা’ নেবে।
তিন বোনই আটক
২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির আগে ইমরান খানের তিন বোনকে আটক করা হয়েছে। প্রথমে রোববার লাহোরে তাঁর বোন আলিমা খানকে ৩০ দিনের জন্য আটক করার আদেশ দেওয়া হয়। লাহোরের ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয় পাঞ্জাবের জনশৃঙ্খলা রক্ষা অধ্যাদেশের (এমপিও) আওতায় এই আদেশ দেয়। পরে তাঁকে কোট লাখপত কারাগারে পাঠানো হয়।
এর একদিন পর সোমবার ইমরানের আরও দুই বোন, ডা. উজমা খান ও নোরিন নিয়াজিকেও ৩০ দিনের জন্য আটক করা হয়। ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদেরও একই আইনের আওতায় আটক করা হয়েছে।
পিটিআই এসব আটকের তীব্র প্রতিবাদ করেছে। দলটির নেতাদের অভিযোগ, ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি ঠেকাতেই ইমরানের পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের নথিতে জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার আশঙ্কাকে আটকের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিটিআইয়ের দাবি, দেড় হাজার কর্মী আটক
পিটিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গওহর আলী খান দাবি করেছেন, দলটির প্রায় ১ হাজার ৫০০ নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, পাঁচজন জাতীয় পরিষদ সদস্য, একজন সাবেক সিনেটর এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে এই সংখ্যা পিটিআইয়ের দাবি হিসেবে এসেছে। গ্রেপ্তার বা আটকের সব সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী ও পিটিআই নেতা সোহেইল আফ্রিদিও অভিযোগ করেছেন, জাতীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ের নেতাদের কর্মসূচির আগেই আটক করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, দলের কয়েকজন নেতাকে সাদা পোশাকের লোকজন তুলে নিয়ে গেছে। এসব অভিযোগেরও সবগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
তবে এসব পদক্ষেপের পরও ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি থেকে সরে আসেনি পিটিআই। দলটি জানিয়েছে, তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করবে।
২৫ সেপ্টেম্বর বিস্তারিত কর্মসূচি
পিটিআইয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে বিক্ষোভের পাশাপাশি ইসলামাবাদমুখী দীর্ঘ পদযাত্রা হওয়ার কথা রয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেইল আফ্রিদি এই পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সোমবার পেশোয়ারে সংবাদ সম্মেলনে আফ্রিদি বলেন, পিটিআইয়ের সংসদীয় কমিটি ২৭ সেপ্টেম্বর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার ‘জোরালোভাবে প্রয়োগ’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, কর্মসূচির বিস্তারিত ২৫ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করা হবে।
পিটিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির মূল দাবি ইমরান খানের মুক্তি, সংবিধানের প্রাধান্য এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। দলটি এর আগে জানিয়েছে, শুধু ইসলামাবাদ নয়, দেশের বিভিন্ন শহর ও জেলাতেও বিক্ষোভ হবে।
সরকারও কঠোর অবস্থানে
২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি নিয়ে পাকিস্তান সরকার ইতোমধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি ২১ সেপ্টেম্বর পিটিআইকে কর্মসূচি থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দলটি কর্মসূচিতে গেলে সরকার কোনো ‘ফাঁক’ রাখবে না এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
নকভি আরও বলেন, ইসলামাবাদে শহর অচল করে দেওয়ার মতো কোনো কর্মসূচি সরকার হতে দেবে না। তিনি পিটিআই নেতাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দলটির উচিত এমন পরিস্থিতিতে না যাওয়া, যা তাদের জন্য ‘শেষ গলি’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর নকভি বলেছিলেন, যে কোনো ধরনের ইসলামাবাদমুখী পদযাত্রা ঠেকাতে সরকার ‘সব ধরনের উপায়ে’ ব্যবস্থা নেবে। একই সময়ে রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদের প্রশাসন কর্মী আটক, সড়কে কনটেইনার স্থাপন, অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম প্রস্তুতের উদ্যোগ নেয়।
হাসপাতালগুলোতে জরুরি প্রস্তুতি
২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে ঘিরে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, ইসলামাবাদের হাসপাতালগুলোকেও উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।
ডনের ২১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতে কয়েকটি পদযাত্রা বা বিক্ষোভ পৌঁছানোর সম্ভাবনার কারণে রাজধানীর হাসপাতালগুলোকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ, রক্তব্যাংক কর্মকর্তা, নার্সিং কর্মকর্তা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও স্টোরকিপারদের কর্মস্থলে অবস্থান এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালগুলোর রক্তব্যাংকে অন্তত ১০০ ব্যাগ রক্ত মজুত রাখতে বলা হয়েছে। সব অ্যাম্বুলেন্স ও চালককে প্রস্তুত রাখতে এবং জরুরি বিভাগে পর্যাপ্ত ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অক্সিজেন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি বিভাগে পুরুষ ও নারী রোগীদের জন্য অতিরিক্ত শয্যাও সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব প্রস্তুতি ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে হাসপাতালগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় রাখার অর্থ এই নয় যে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মারণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি মূলত সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি হিসেবে কর্তৃপক্ষের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশনাও সামনে
২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি নিয়ে আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে। ইসলামাবাদ হাইকোর্ট ১৪ সেপ্টেম্বরের আদেশে বলেছে, কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা এমনভাবে রাজধানীর সড়ক, মহাসড়ক, আন্তঃসংযোগ সড়ক, টোল প্লাজা বা সরকারি ভবন দখল করতে পারবেন না, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসাসেবা বাধাগ্রস্ত হয়।
পরে আদালতের বিস্তারিত রায়ে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রতিবাদের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার দুটিই বিবেচনায় রাখতে হবে। কোনো কর্মসূচির কারণে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
সরকার জানিয়েছে, পিটিআই কর্মসূচিতে এগিয়ে গেলে আদালতের ওই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে। অন্যদিকে পিটিআই বলছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ তাদের সাংবিধানিক অধিকার।
ইমরান খান এখনো কারাগারে
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে রয়েছেন এবং বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি। ২০২২ সালের এপ্রিলে জাতীয় পরিষদে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ইমরানের মুক্তির দাবিতে পিটিআই এর আগেও একাধিকবার বিক্ষোভ ও পদযাত্রার কর্মসূচি নিয়েছে। তবে এবারের ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে দলটি দেশব্যাপী বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। দলটির কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নেতারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ ও সমাবেশ করছেন।
সোহেইল আফ্রিদি ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রদেশে দলীয় সমর্থকদের সংগঠিত করার কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বরের পদযাত্রায় বড়সংখ্যক মানুষ অংশ নেওয়ার লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে সরকার বলছে, রাজধানীর স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি করতে দেওয়া হবে না। ফলে ২৭ সেপ্টেম্বরকে সামনে রেখে পাকিস্তানে রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।