হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে সংশোধন বাংলাদেশে। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে ছেলে থাকলে মেয়েদের পারিবারিক সম্পত্তিতে সরাসরি উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। তবে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নতুন একটি আইনি সুযোগ তৈরি করেছে সরকার। গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ১৮৮২ সালের ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’ পাস হয়েছে।
সংশোধিত আইনে সম্পত্তির মালিক জীবিত থাকা অবস্থায় ছেলে-মেয়েসহ অন্য কাউকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন এবং দান করার পরও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ করার সুযোগ থাকবে। সাবেক আপিল বিভাগের বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ আইনটির এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা মূলত দায়ভাগ মতবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। পরিবারে পুত্রসন্তান থাকলে সাধারণত তিনিই বা তাঁরাই সম্পত্তির উত্তরাধিকার হন। পুত্রসন্তান না থাকলে বিধবা স্ত্রী ও মেয়েরা জীবনস্বত্ব পান। তাঁদের মৃত্যুর পর প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কর্মকার বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধর্মীয় ও পারিবারিক আইনগুলো বহাল থাকবে। তবে সংশোধিত আইনে সম্পত্তির মালিক জীবিত অবস্থায় নিজের ছেলে-মেয়েকে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন একটি আইনি সুযোগ পেয়েছেন।
তিনি বলেন, কোনো বাবা যদি নিজের ভোগাধিকার রেখে ছেলে বা মেয়েকে সম্পত্তি দান করতে চান, তাহলে এখন তাঁর জন্য সেই পথ সহজ হয়েছে। হিন্দু পরিবারে বাবা চাইলে মেয়েকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন এবং উইলও করতে পারবেন। দান করার পর দানগ্রহীতা যদি তাঁর দেখভাল না করেন, নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় দানপত্র বাতিলের সুযোগও রয়েছে।
দীপা সরকার বিবাহিত ও চাকরিজীবী। তাঁর এক ভাই বিদেশে থাকেন। ফলে মা-বাবার বিপদে-আপদে পাশে থাকা, বাজার করা থেকে শুরু করে হাসপাতালে নেওয়া পর্যন্ত নানা দায়িত্ব তিনিই পালন করেন।
কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তিতে কোনো অংশ না পাওয়ার বিষয়টি তাঁকে কষ্ট দেয়। দীপার ভাষায়, ছেলে যেমন মা-বাবার সন্তান, মেয়েও তেমনই। তিনি বলেন, মা-বাবার জন্য নিজের সামর্থ্যের সবটুকু করার পরও উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি তাঁকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
দীপা বলেন, বাবা কখনো ভেবেছিলেন কি না যে তিনি বা মা না থাকলে, আর ভাই বিদেশে থাকায়, নিজের বেড়ে ওঠার বাড়িতে ফিরে আসতে চাইলে তাঁর কোনো অধিকার থাকবে কি না। এসব ভাবলে তাঁর মনে হয়, সমাজ ও আইনের বাস্তবতায় মা-বাবার জীবনে তাঁর অস্তিত্ব যেন গুরুত্বহীন হয়ে গেছে।
সম্পত্তি হস্তান্তরের সংশোধিত আইনটি নিয়ে অবশ্য পুরোপুরি আশাবাদী নন দীপা সরকার। তাঁর মতে, এটি বাধ্যতামূলক কোনো ব্যবস্থা নয়, বরং সম্পত্তির মালিকের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
তাই হিন্দু পরিবারগুলো চাইলে প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন অনুসারেই সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণ করতে পারে। তাঁর মতে, শুধু আইন পরিবর্তন করলেই হবে না, এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও পারিবারিক মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।
বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পুলক ঘটক হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে অধিকারের পক্ষে। তাঁর মতে, সম্পত্তিতে নারীদের মালিকানা থাকলে তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা বাড়বে এবং মর্যাদাও শক্তিশালী হবে।
সব মিলিয়ে, সংশোধিত আইনটি হিন্দু নারীদের উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করছে না। বরং কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি ছেলে-মেয়ের মধ্যে বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করতে চাইলে তাঁর জন্য অতিরিক্ত একটি আইনি পথ তৈরি করছে। এর ফলে সম্পত্তি হস্তান্তর ও মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কিছুটা বিস্তৃত হলো।