নিহত শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৪) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধানগাছ এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকায় সেখানে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের ধারণা, হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে পালানোর চেষ্টা করেছিল তাজমিন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে ধানক্ষেতের বিভিন্ন স্থানে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন দেখা যায়।
জগতপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া নির্জন পাকা সড়কটির দুই পাশে বিস্তৃত ফসলি জমি। সড়কের মাঝামাঝি অংশের দুই পাশের কয়েকটি ধানক্ষেতে ধানগাছ মাড়ানো ও এলোমেলো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সড়কের এক পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও পড়ে ছিল। পরে স্থানীয়রা সেটি টেনে সড়কের ওপর তোলেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ধানক্ষেতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে থাকার খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। অটোরিকশা থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ দেখতে পান তাঁরা। আশপাশের ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্নও ছিল। সেসব চিহ্ন ধরে কিছুটা সামনে এগিয়ে একটি ধানক্ষেতে নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তাঁরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মরদেহটির মাথা কাদার মধ্যে ছিল এবং শরীরে কোনো পোশাক ছিল না। গলায় প্যাঁচানো ছিল একটি গামছা। পরে লোকজনের উপস্থিতি বাড়লে গামছা দিয়ে মরদেহের শরীর ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
স্থানীয়দের ধারণা, তাজমিনকে হত্যার আগে ঘটনাস্থলে ধস্তাধস্তি হয়েছিল। ধানক্ষেতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা চিহ্ন দেখে তাঁদের মনে হয়েছে, সে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। তবে কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ঘটনাস্থলে সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি পড়ে থাকা নিয়েও রহস্য তৈরি হয়েছে। এটি কার, কীভাবে সেখানে গেল এবং ঘটনার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয়।
তিনি বলেন, নিহতের শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা অটোরিকশাটির নিবন্ধন রয়েছে। সেটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
এদিকে, ময়নাতদন্ত শেষে তাজমিনের মরদেহ নিয়ে যশোরের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাঁরা কুমিল্লা থেকে যশোরের পথে যাত্রা করেন। যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে আর স্কুলে যায়নি।
তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করেন। পরিবারের সদস্যরা কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে লালমাই থানায় হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।