বাংলাদেশ

সৌদিতে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ আরও ২০ বাংলাদেশি, শাস্তির তথ্য জানে না কনস্যুলেট

  • 4:36 am - October 23, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৭ বার
সৌদি আরবের হায়ের কারাগার। ছবি: রয়টার্স

সৌদি আরবের কারাগারে থাকা ২২ বাংলাদেশির নামের পাশে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ লেখা থাকলেও তাঁদের কী শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা জানে না জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট। সৌদি সরকারের পাঠানো বন্দীদের তালিকায় তাঁদের কারও সাজা কত বছরের কারাদণ্ড, কারও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ২২ বাংলাদেশির সাজার বিস্তারিত জানতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়েছে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট।

এই ২২ জনের মধ্যে রয়েছেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার। সম্প্রতি তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর বাংলাদেশে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি করে। তাঁদের মতো বাকি ২০ বাংলাদেশির ভাগ্য নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে তালিকায় ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ লেখা থাকলেও তাঁদের কারও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

গত ১৯ অক্টোবর সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা অঞ্চল শাখা, জেদ্দার কাছে পাঠানো চিঠিতে সংশ্লিষ্ট বন্দীদের রায়ের সারসংক্ষেপ দ্রুত সরবরাহ করার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট। কনস্যুলেটের বক্তব্য, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করতে তাঁদের মামলার রায় ও সাজার বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন।

জেদ্দায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. শাখাওয়াত হোসেন বৃহস্পতিবার  বলেন, বাংলাদেশের দণ্ডিত নাগরিকদের কনস্যুলার সুবিধা নিশ্চিত করার স্বার্থে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সুস্পষ্ট তথ্য চাওয়া হয়েছে।

সৌদি সরকারের তালিকায় শাস্তির তথ্য নেই

সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে ২ হাজার ৪৬১ জন বাংলাদেশি বন্দীর একটি তালিকা পাঠায়। কনস্যুলেটের কর্মপরিধির আওতাধীন বিভিন্ন কারাগারে থাকা এসব বন্দীর কারও বিরুদ্ধে আদালতের রায় হয়েছে, আবার কারও মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

তালিকাটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা দেখতে পান, কয়েকজন বন্দীর ক্ষেত্রে ‘অবস্থা’ বা স্ট্যাটাসের ঘরে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ লেখা থাকলেও ‘রায়ের সারসংক্ষেপ’ অংশটি ফাঁকা রাখা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কী ধরনের সাজা দেওয়া হয়েছে, সাজা কত দিনের কিংবা তাঁদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে কি না, তা বোঝার উপায় নেই।

এ পরিস্থিতিতে ১৯ অক্টোবর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জেদ্দা শাখার কাছে পাঠানো চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত রায়ের সারসংক্ষেপ সরবরাহ করার অনুরোধ জানায় কনস্যুলেট। চিঠিতে বলা হয়, কনস্যুলার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য এসব তথ্য প্রয়োজন।

চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত নয় পৃষ্ঠার তালিকায় সংশ্লিষ্ট বন্দীদের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ঠিক কতজনের সাজার তথ্য অনুপস্থিত, তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে সংযুক্ত তালিকা পর্যালোচনা করে ২২ জনের নাম পাওয়া গেছে।

২২ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে কী ধরনের মামলা

সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তালিকা এবং জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই ২২ বাংলাদেশির মধ্যে আটজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, পাঁচজনের বিরুদ্ধে মাদক পাচার এবং পাঁচজনের বিরুদ্ধে ‘ব্যক্তিগত অধিকার’–সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। এ ছাড়া দুজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা হয়েছে। বাকি দুজনের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং অন্যজনের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মামলা রয়েছে।

কারাগারের তথ্য অনুযায়ী, এই বন্দীদের মধ্যে ছয়জন জেদ্দার জাহবান কারাগারে, ছয়জন শুমাইসি কারাগারে এবং চারজন জেদ্দা জেনারেল কারাগারে রয়েছেন। বাকি ছয়জন নাজরান, খামিস, আল–বাহা, হাদ্দাহ ও জেদ্দার নারী কারাগারে আটক রয়েছেন।

তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ‘ব্যক্তিগত অধিকার’–সংক্রান্ত মামলায় থাকা পাঁচজনই শুমাইসি কারাগারে রয়েছেন। সাধারণত এ ধরনের মামলা ব্যক্তিগত দাবি বা ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তা মামলার নথি ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

একইভাবে, মামলার ধরন থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চূড়ান্ত সাজা অনুমান করার সুযোগ নেই। হত্যা মামলায় সৌদি আইনে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, আবার মামলার পরিস্থিতি ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে অন্যভাবেও নিষ্পত্তি হতে পারে। তাই তালিকায় ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ লেখা থাকলেও ওই ২২ জনের মধ্যে কারও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে কি না, তা রায়ের বিস্তারিত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ডের পর বাড়তি উদ্বেগ

সৌদি আরবে আটক বাংলাদেশিদের সাজার তথ্য না থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের পর। তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের খবর প্রকাশ্যে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, বিদেশের কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হচ্ছে, তাঁদের বিচার কীভাবে হচ্ছে এবং সাজা কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ কতটা তথ্য পাচ্ছে।

কনস্যুলেটের কাছে রায়ের সারসংক্ষেপ না থাকলে সংশ্লিষ্ট বন্দীর আইনি অবস্থান বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর সাজা চূড়ান্ত হয়েছে কি না, আপিলের সুযোগ রয়েছে কি না, আইনজীবীর সহায়তা প্রয়োজন কি না কিংবা কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমা বা ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত সমঝোতার সুযোগ আছে কি না, এসব বিষয় নির্ধারণে রায়ের বিস্তারিত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে গুরুতর অপরাধের মামলায় সাজা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট বন্দীর পরিবারও মামলার প্রকৃত অবস্থা না জানলে আইনি সহায়তা নেওয়া বা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারে।

এ কারণে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের পর সৌদি আরবের কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের মামলা ও সাজার তথ্য সংগ্রহে কনস্যুলেটের তৎপরতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বন্দীদের মুক্তি ও দেশে ফেরানোর উদ্যোগ

রায়ের তথ্য চাওয়ার পাশাপাশি ১৯ অক্টোবর সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আরেকটি চিঠি পাঠিয়েছে জেদ্দা কনস্যুলেট। এতে ২ হাজার ৪৬১ জন বাংলাদেশি বন্দীকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করে তাঁদের বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

কনস্যুলেটের অনুরোধের মধ্যে রয়েছে, কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়া বন্দীদের দ্রুত মুক্তি দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা, ভালো আচরণ করা বন্দীদের রাজকীয় ক্ষমার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রথমবার আটক হওয়া ও ছোটখাটো অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অবশিষ্ট সাজা মওকুফের বিষয়টি বিবেচনা করা।

এ ছাড়া বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ কামনা করেছে কনস্যুলেট। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে, যেসব বন্দীর মুক্তি বা দেশে ফেরার আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার ঝুঁকি কমানো।

তবে এসব অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষকে চিঠি

এদিকে, আরও দুই বাংলাদেশির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট। তাঁদের পরিবারের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী ওই দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে তাঁদের কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিংবা কোথা থেকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারগুলো নিশ্চিত তথ্য জানে না।

এ ধরনের ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের অবস্থান, গ্রেপ্তারের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট মামলার তথ্য জানা পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এসব তথ্য প্রয়োজন।

সৌদি আরবে আটক বাংলাদেশিদের সাজার বিস্তারিত, বন্দীদের মুক্তি ও দেশে ফেরত পাঠানো এবং দুই বাংলাদেশির গ্রেপ্তারের বিষয়ে পাঠানো চিঠিগুলোর জবাব এখনো জানা যায়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষ কবে এসব তথ্য দেবে এবং সংশ্লিষ্ট বন্দীদের আইনি অবস্থান সম্পর্কে কী জানা যাবে, তা এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: প্রথম আলো

এই শাখার আরও খবর

নোয়াখালীতে দুর্গামন্দিরের সীমানাপ্রাচীর ভাঙচুর, আতঙ্কে হিন্দু সম্প্রদায়

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী পৌর এলাকায় শ্রী শ্রী গদাধর কুন্ড দুর্গামন্দিরের সীমানাপ্রাচীর ভাঙচুর করে ভেতরে প্রবেশ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে…

ইসলামি ঐতিহ্যের কথা বলে নারী শিল্পীর গানে আপত্তি, বন্ধ বাউল গানের আসর

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় বাউল গানের আসরে নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি ওঠার পর অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছেন আয়োজকেরা। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া-রাধানগর…

খুলনায় ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই খুন, দুটিতেই মাদক-সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ

খুলনা নগরে প্রায় ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে গুলি করে এক যুবক ও এক গৃহবধূকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে নগরের পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল…

চীনের তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তিব্বত অঞ্চলে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে এ ভূমিকম্প হয়। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত…

দুর্গাপূজার পর দিল্লিতে আবারও ‘জ্ঞানেশ হটাও’ আন্দোলনের ডাক

দুর্গাপূজা, দশেরা ও নবরাত্রির উৎসব শেষ হতেই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আবারও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড়…

সাইবার হামলার শঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট, কারণ কী?

পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সাইবার হামলার ঝুঁকি এড়াতে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। ত্রুটি দুটি কাজে লাগিয়ে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au