সৌদিগামী ১৪১ ফ্লাইট বাতিল, ভোগান্তিতে ২১ হাজারের বেশি যাত্রী
ঢাকা থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মামগামী ১৪১টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন ২১ হাজার ৯৩৩ জন যাত্রী। গত ১০ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর রাত…
দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে গত আড়াই মাসে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড ও পানিতে ডুবে অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন, পানিতে ডুবে ১০ জন, সড়ক দুর্ঘটনায় চারজন এবং প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে একজন প্রাণ হারিয়েছেন। একের পর এক এসব ঘটনায় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পর্যটনের অন্যতম প্রধান গন্তব্য কক্সবাজারে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ নামের একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নারী ও শিশুসহ ১০ পর্যটক মারা যান। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সমুদ্রে গোসল করতে নেমে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, রাঙামাটির সাজেকে অবরোধ ও গোলাগুলির ঘটনায় আটকা পড়েন প্রায় তিন হাজার পর্যটক। পরে তাঁদের নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এসব ঘটনায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তার ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে পর্যটকদের নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র পুলিশ সুপার মো. মারুফাত হোসাইন। তিনি বলেন, পর্যটন এলাকায় পুলিশ ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় পুলিশের কোনো ঘাটতি নেই। দুর্গাপূজার ছুটি ও পর্যটনের মৌসুম সামনে রেখে কক্সবাজারে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে পর্যটকদের অসচেতনতা ও সতর্কবার্তা অমান্য করার কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে।
অনুমোদনহীন রিসোর্ট ও অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর পর কক্সবাজারের হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কক্সবাজার জেলায় দুই হাজারের বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার শহর ও আশপাশের এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টের মতো অনুমোদনহীন স্থাপনার সংখ্যা ছয় শতাধিক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মাত্র ১১৫টি হোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা সনদ রয়েছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের। ফলে পর্যটনসংশ্লিষ্ট অনেক স্থাপনার অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ফারিহা কবিরের বাবা জিয়াদুল কবির বলেন, পর্যটন এলাকার অনিয়ম ও ঝুঁকি তদারকির দায়িত্ব যেসব সরকারি বিভাগ ও দপ্তরের, তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে না। তাঁর অভিযোগ, অনুমোদনহীন রিসোর্ট নির্মাণের পাশাপাশি পর্যটন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন চাঁদের গাড়িও চলাচল করছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন জানান, অবৈধভাবে নির্মিত দেড় শতাধিক স্থাপনাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আরও স্থাপনা সরেজমিনে পরিদর্শন করে তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সমুদ্রে ডুবে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু
রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পরদিন ১৮ অক্টোবর ঢাকা থেকে সাত বন্ধু বান্দরবানে বেড়াতে যান। পাহাড়ে দুই দিন কাটিয়ে গত বুধবার তাঁরা কক্সবাজারে পৌঁছান এবং হিমছড়ির প্যাঁচারদ্বীপ জাদুঘরসংলগ্ন একটি রিসোর্টে ওঠেন। পরে সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে তাঁদের দুজন ভেসে যান। একই সৈকতে চট্টগ্রাম থেকে বেড়াতে আসা আরও দুই বন্ধুর মৃত্যু হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে এ ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম থেকে আসা চাকরিজীবী রয়েছেন।
পাহাড়ে অবরোধ ও সড়ক দুর্ঘটনাতেও প্রাণহানি
দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে বান্দরবান ও রাঙামাটির সাজেকে বেড়াতে গিয়েছিলেন কয়েক হাজার পর্যটক। গত বুধবার সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন নামের দুটি সংগঠন সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেয়। একই দিন পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এতে প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন। তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের মধ্যে অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। ফলে পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে আতঙ্কের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরতে হয় পর্যটকদের।
এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনাতেও প্রাণহানি ঘটেছে। গত ৫ অক্টোবর বান্দরবানের থানচি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র তিন্দুতে পর্যটকবাহী একটি চাঁদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে দুজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের হিমছড়ি মেরিন ড্রাইভে একটি পর্যটকবাহী চাঁদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেলে একজন নিহত হন। গত ২৪ আগস্ট সিলেটের জাফলং যাওয়ার পথে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের হরিপুর এলাকায় বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে আরও একজন পর্যটকের মৃত্যু হয়।
গত ১ আগস্ট কক্সবাজারের দরিয়ানগর প্যারাসেইলিং এলাকায় সমুদ্রে পড়ে শৌভিক রায় নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর অনিরাপদ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ছাড়া গত ২৬ আগস্ট ও ১৮ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্টে পৃথক ঘটনায় তিনজন পানিতে ডুবে মারা যান। গত ৭ আগস্ট সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় গোসল করতে নেমে একজন এবং ১৫ আগস্ট সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথরে পানিতে ডুবে আরও একজনের মৃত্যু হয়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান মনে করেন, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং পর্যটকদের অসচেতনতার কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
তিনি বলেন, অনেক পর্যটন স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। সড়ক অবকাঠামোরও ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
সাইদুর রহমান আরও বলেন, সাঁতার না জানা সত্ত্বেও অনেক পর্যটক সমুদ্রে গোসল করতে নামেন। আবার অনেক স্থানে পর্যাপ্ত জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম ও জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেটের ব্যবস্থা নেই। এসব ঝুঁকি কমাতে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
একদিকে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি, অন্যদিকে পানিতে ডুবে মৃত্যু, সড়ক দুর্ঘটনা ও পাহাড়ে নিরাপত্তাঝুঁকি, সব মিলিয়ে দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে। পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে অনুমোদনহীন স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উদ্ধারব্যবস্থা উন্নত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au