বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক প্রাপ্তি নয়। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরবের অধ্যায়। এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আত্মপরিচয়, জাতীয় পতাকা, স্বাধীন ভূখণ্ড এবং একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরও যখন কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায় নিয়ে বিতর্ক, বাধা ও অসম্মানের অভিযোগ ওঠে, তখন তা শুধু একটি পরিবারের বেদনার ঘটনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে গোটা জাতির বিবেকের সামনে দাঁড়ানো এক কঠিন প্রশ্ন।
সম্প্রতি পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ দাফন এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের ক্ষেত্রে বাধার অভিযোগ আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফন ও গার্ড অব অনার প্রদান নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীদের বাধার কারণে তাঁরা জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েন। পরে পুলিশের সহায়তায় রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান এবং নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর নধ্যরাতের অন্ধকারে তাঁকে দাফন করতে হয়। কবর খুঁড়তে হয় তার স্ত্রী, কন্যা ও বোনকে। ভয়ে এগিয়ে আসতে সাহস পায়নি অন্য কেউ।এই করুন ইতিহাস আমাদের বিবেককে স্তব্ধ করে দেয়।
ঘটনার প্রতিটি অভিযোগ যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণের পাশাপাশি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনা জরুরি—একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর শেষ বিদায়টুকু কি রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না? একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মান ও দাফনের বিষয়টি নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার অভিযোগ কেন উঠবে? যে রাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য একজন মানুষ জীবন বাজি রেখেছিলেন, সেই রাষ্ট্রে তাঁর শেষ বিদায় নিশ্চিত করতেও যদি প্রশাসনিক নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়, তবে তা আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
মানিক পশারী কেবল একটি পরিবারের সদস্য ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একজন মানুষ। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ও সংবেদনশীল পরিচয় হলো—তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অন্যতম সাক্ষী ছিলেন। আর ঠিক এই একটিমাত্র কারণে মানিক পশারীকে অমুক্তিযোদ্ধা দাবি করে তাঁর শেষ বিদায় ও দাফনে বাধা দেওয়ার মতো ন্যক্কারজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন মানুষ জীবিত থাকাকালীন আদালতের বিচারে সাক্ষ্য দিয়েছেন—এই ক্ষোভ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে মৃত্যুর পর তাঁর দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ কখনোই হালকাভাবে নেওয়া যায় না।
মহান স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত অর্জন। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করা মানে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা নয়; বরং স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। একইভাবে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা, গবেষণা কিংবা কোনো ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে আইনসংগত প্রশ্ন তোলার অধিকারও থাকতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের মূল্যায়ন এবং মৃত মানুষের শেষকৃত্যে বাধা সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এই পার্থক্যটি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা খর্ব করা কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করার মধ্য দিয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সমৃদ্ধ করতে পারে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলাদা হতে পারে; কিন্তু কোনো আন্দোলনের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে খাটো করার প্রয়োজন নেই।
একাত্তরের স্বাধীনতাসংগ্রাম আমাদের রাষ্ট্রের জন্মের ভিত্তি। পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র, অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে মানুষের বিভিন্ন আন্দোলনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়কে তার নিজস্ব প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করাই যুক্তিসংগত। একটি অধ্যায়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে অন্য অধ্যায়ের অবদান অস্বীকার করা জাতিকে বিভক্ত করে। আমাদের প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হবে ঐক্যের ভিত্তি, বিভাজনের অস্ত্র নয়।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য নির্ধারিত প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন নিজেরাই বিচারক হয়ে সাক্ষ্য দেওয়া বা রাজনৈতিক মতাদর্শের জের ধরে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে বাধা দিতে পারে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর আইন ও প্রশাসনিক বিধিবিধানের মধ্যেই খুঁজতে হবে।
মানিক পশারীর দাফন নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কারা বাধা দিয়েছিল, কী পরিস্থিতিতে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল, রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের প্রক্রিয়ায় কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই প্রমাণ ছাড়াই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন অপরাধের বিচার প্রয়োজন, তেমনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাইও অপরিহার্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মতাদর্শগত সংঘাত নতুন নয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সাক্ষ্যদানকারীকে পরাজিত করার আকাঙ্ক্ষা যখন মানবিকতার মৌলিক সীমারেখা অতিক্রম করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা সমাজ। একজন মানুষ জীবিত থাকাকালীন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, বিশ্বাস কিংবা আদালতের সাক্ষ্য নিয়ে মতবিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের শোককে সম্মান জানানো, শেষকৃত্যে বাধা না দেওয়া এবং আইনসম্মতভাবে তাঁর অন্তিম বিদায়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সভ্য সমাজের মৌলিক দায়িত্ব। ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিক বিবেচনা—সব দিক থেকেই এই দায়িত্বের গুরুত্ব অপরিসীম।
মানিক পশারীর মৃত্যুকে ঘিরে যে পরিস্থিতির কথা প্রকাশিত হয়েছে, তার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—একটি পরিবারকে প্রিয়জনের শেষ বিদায়ের মুহূর্তেও অনিশ্চয়তা ও অসহায়তার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মৃত্যুর পর স্বজনেরা সাধারণত মানুষের সহমর্মিতা প্রত্যাশা করেন। প্রতিবেশীরা পাশে দাঁড়ান, পরিচিতজনেরা শোক ভাগ করে নেন, সমাজ শেষ বিদায়ের আয়োজনকে সহজ করে দেয়। সেই পরিচিত মানবিক দৃশ্যের পরিবর্তে যদি রাজনৈতিক বিরোধ ও সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষোভ থেকে বাধার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তা আমাদের সামাজিক সহনশীলতার জন্য অশনিসংকেত।
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষার অর্থ শুধু জাতীয় দিবসে তাঁদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া নয়। তাঁদের জীবদ্দশায় সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ বাড়ানো, তাঁদের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং মৃত্যুর পর যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আবেগঘন বক্তব্যের চেয়ে তাঁদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় বাস্তব পদক্ষেপ অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল অতীতের স্মৃতিচারণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা তখনই প্রকাশ পাবে, যখন একজন নাগরিকের অধিকার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সংকুচিত হবে না, যখন কোনো পরিবার শোকের মুহূর্তে নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে না এবং যখন রাষ্ট্রের আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা কী উত্তরাধিকার রেখে যেতে চাই—এই প্রশ্নও আজ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলব, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষোভ থেকে মৃত মানুষের দাফনে বাধা দেওয়া হবে, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করব, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব অক্ষুণ্ন রেখে সব নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা হবে? আমরা কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেব, নাকি যুক্তি, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে মতপার্থক্যের সমাধান করব?
পিরোজপুরের ঘটনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি তাই জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের নেতাকর্মীদের এমন আচরণ থেকে বিরত রাখা, যা মানবিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। কোনো রাজনৈতিক সংগঠন যদি সত্যিই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করে, তবে তার আচরণেও সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকতে হবে।
মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে হয় এবং একটি স্বাধীন দেশের জন্য সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেই শিক্ষাকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। মানিক পশারীর শেষ বিদায় নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগ যেন কেবল সাময়িক ক্ষোভের জন্ম দিয়ে হারিয়ে না যায়; বরং তা মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকে।
মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য। তাঁদের অবদান কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে জাতির স্থায়ী সম্পদ। তাঁদের প্রতি সম্মান জানানো মানে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের প্রতি সম্মান জানানো। তাই আমাদের প্রত্যয় হোক—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হতে দেব না, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে দেব না, আবার ন্যায়বিচারের প্রশ্নেও আপস করব না। কারণ স্বাধীনতার সত্যিকারের মর্যাদা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন এই দেশে ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, মানুষের প্রতি মানবিকতা এবং আইনের প্রতি আনুগত্য পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা পাবে।
মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি