যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিরক্ষা প্রতিনিধির সঙ্গে বাংলাদেশি সামরিক কর্মকর্তার বৈঠক। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার হাসান মাহমুদের সঙ্গে দুই দিনে পৃথক বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিনিধি। ২৬ ও ২৭ অক্টোবর ঢাকা সেনানিবাসে সেনা সদর দপ্তরে তাঁর কার্যালয়ে এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈঠক দুটির আলোচ্যসূচি, আলোচনার বিষয়বস্তু কিংবা ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ১০টা ৫ মিনিট থেকে ১১টা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সহকারী প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে মেজর কার্স্টেন ই ফ্লেচারের সঙ্গে বৈঠক করেন ব্রিগেডিয়ার হাসান মাহমুদ। পরদিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৯টা ৩৫ মিনিট থেকে ১০টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত তিনি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশনের (সিইটিসি) প্রতিনিধি লিউ ঝিওয়েইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।
দুই দিনের ব্যবধানে একই সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের পৃথক বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা সামরিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা অংশীদারত্বের ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ফেলছে। তবে বৈঠক দুটির সময় কাছাকাছি হওয়া থেকে এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল কিংবা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে পৃথক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। দুই দেশের সঙ্গেই সহযোগিতা বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাবিষয়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা ঢাকার জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চীন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ। বিভিন্ন ধরনের সামরিক প্ল্যাটফর্ম, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক সম্পর্কও রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নে বেইজিংয়ের ভূমিকা দীর্ঘদিনের।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিইটিসি একটি বড় ইলেকট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিকস, যোগাযোগব্যবস্থা, রাডার, নজরদারি প্রযুক্তি এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম যুক্ত। বেসামরিক ও সামরিক উভয় ধরনের প্রযুক্তি খাতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে।
তবে সিইটিসির প্রতিনিধি লিউ ঝিওয়েইয়ের সঙ্গে ব্রিগেডিয়ার হাসান মাহমুদের বৈঠকের উদ্দেশ্য কী ছিল, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রযুক্তি বা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, কিংবা কোনো চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। একইভাবে, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক স্বার্থ বা বৈঠকের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কেও বিস্তারিত জানা যায়নি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের চেষ্টা করে আসছে। সামরিক সংলাপ, পেশাগত পর্যায়ের মতবিনিময়, প্রশিক্ষণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাবিষয়ক আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত গুরুত্বের কারণে দেশটির সঙ্গে বিভিন্ন শক্তিধর রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক যোগাযোগ তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাণিজ্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, সামরিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
ঢাকার জন্য একাধিক দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখার কিছু বাস্তব সুবিধাও রয়েছে। বিভিন্ন অংশীদারের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ভিন্ন দেশের প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীলতা সামরিক ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্যের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত মান, যোগাযোগব্যবস্থার সামঞ্জস্য এবং সংবেদনশীল তথ্যের সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার শর্ত ও প্রভাব বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় অংশীদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত অগ্রাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে ২৬ ও ২৭ অক্টোবরের বৈঠক দুটির আলোচ্যসূচি প্রকাশ না হওয়ায় এগুলোতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ কিংবা বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বৈঠক দুটির মধ্যে কোনো সমন্বিত উদ্যোগ বা পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল, এমন প্রমাণও প্রকাশিত তথ্যে নেই।
ফলে এসব বৈঠকের প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করবে আলোচনার বিষয়বস্তু, পরবর্তী সময়ে কোনো সমঝোতা বা উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না এবং সেগুলোর বাস্তব ফলাফলের ওপর। আপাতত এই বৈঠকগুলো থেকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে কোনো নির্দিষ্ট কৌশলগত পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এবং চীনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক কর্মকর্তাদের যোগাযোগ অবশ্য দুই দেশের সঙ্গেই ঢাকার বিদ্যমান সম্পর্কের ধারাবাহিকতার একটি চিত্র তুলে ধরে। প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্বার্থ রক্ষা করাই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ