বাংলাদেশ

তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন

ক্ষতসহ দীর্ঘ সময় জীবিত ছিলেন সাগর-রুনি, ১৪ বছরেও শনাক্ত হয়নি দুই অজ্ঞাত ব্যক্তির ডিএনএ

  • 6:12 am - October 28, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৭ বার
সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনী।ছবিঃ সংগৃহীত

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পরও অপরাধী শনাক্ত ও হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। ঘটনাস্থলে পাওয়া দুই অজ্ঞাতনামা পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে সন্দেহভাজন বা তদন্তে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের নমুনার মিল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগর ও রুনির শরীরে একাধিক ক্ষত ছিল এবং তাঁরা মৃত্যুর আগে দীর্ঘ সময় আহত অবস্থায় জীবিত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়।

বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। তদন্ত শেষ করতে রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আরও ছয় মাস সময় দিয়েছেন। আগামী ২৯ এপ্রিল পরবর্তী আদেশের দিন ধার্য করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের বিশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সাগর ও রুনির শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে উল্লেখযোগ্য আঘাতের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে তাঁদের দেহে একাধিক ক্ষত ছিল, যেগুলো থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে থাকতে পারে। ঘাড়, পিঠ ও চোখের নিচে আঘাতের চিহ্নও ছিল। সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের তথ্য এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে টাস্কফোর্সের পর্যবেক্ষণ, ক্ষত থাকা অবস্থায় ভুক্তভোগীরা মৃত্যুর আগে অনেকক্ষণ জীবিত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং ভুক্তভোগীদের শরীরে পাওয়া ক্ষতের ধরন ও সংখ্যা বিবেচনায় হত্যাকারীরা তাড়াহুড়া করে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, এমন ধারণা পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডটি পেশাদার খুনিদের অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পর্যবেক্ষণ থেকে হত্যাকারীদের পরিচয় বা হত্যার উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি।

দুই অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ, পরিচয় শনাক্তে ব্যর্থতা

তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগর সরওয়ারকে বেঁধে রাখতে ব্যবহৃত চাদর এবং মেহেরুন রুনির টি–শার্ট থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষায় দুই অজ্ঞাতনামা পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। তবে দীর্ঘ তদন্তেও তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অজ্ঞাত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি পরীক্ষাগারে ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধীদের সম্ভাব্য ছবি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ডিএনএর নমুনায় একাধিক ব্যক্তির জৈবিক উপাদান মিশে থাকায় নির্ভরযোগ্য ছবি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে তাঁদের শনাক্ত করার মতো কোনো মিলও পাওয়া যায়নি।

মামলার তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও আসামির ডিএনএ নমুনার সঙ্গে ঘটনাস্থলে পাওয়া অজ্ঞাত ডিএনএর মিল রয়েছে কি না, তা–ও পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো নমুনার সঙ্গে ওই ডিএনএ প্রোফাইলের মিল পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে চিহ্নিত ছুরি, বঁটি, ছুরির হাতল, সাগর ও রুনির পরিধেয় বস্ত্রসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করেন। এসব আলামত এবং ২৫ জন ব্যক্তির বাকাল সোয়াব বা মুখের ভেতরের অংশ থেকে সংগৃহীত নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য বিদেশের একাধিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়।

পরীক্ষাগারগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে মোট চারজন ব্যক্তির ডিএনএ থাকার তথ্য পান। তাঁদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী। তিনজন পুরুষের একজন নিহত সাগর সরওয়ার এবং নারীটি নিহত মেহেরুন নাহার রুনি হিসেবে শনাক্ত হন। বাকি দুই পুরুষের পরিচয় অজানা রয়ে গেছে।

তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলামত থেকে পাওয়া ডিএনএর সঙ্গে পরীক্ষার জন্য পাঠানো ব্যক্তিদের নমুনার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাস্থলে পাওয়া দুই অজ্ঞাত পুরুষের পরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডে তাঁদের ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চললেও হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য বা মোটিভ এবং কারা এতে জড়িত, তা এখনো সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি। তদন্তকারীদের মতে, অজ্ঞাত ডিএনএর পরিচয় শনাক্ত করা গেলে মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।

পারিবারিক ও পেশাগত বিরোধের প্রমাণ মেলেনি

সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক বিরোধ, দাম্পত্য কলহ কিংবা পেশাগত শত্রুতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখেছেন তদন্তকারীরা। তবে এসব বিষয়ে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাম্পত্য কলহের কারণে একজনকে হত্যার পর অপরজন আত্মহত্যা করেছেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে, সাংবাদিকতার পেশাগত কারণে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, এমন তথ্যপ্রমাণও তদন্তে মেলেনি।

সাগর সরওয়ার বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা টেলিভিশনে কর্মরত ছিলেন। তাঁর কর্মস্থলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে পেশাগত কোনো শত্রুতা বা বিরোধের তথ্য খোঁজার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেখান থেকেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বিরোধের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সাগর ও রুনি দীর্ঘদিন জার্মানিতে ছিলেন এবং মৃত্যুর প্রায় সাত মাস আগে দেশে ফেরেন। তাঁদের বিদেশে অবস্থান, দেশে ফেরার পরের পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়।

সামিট গ্রুপের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্টের নির্মাণকাজ ২০১৩ সালে শুরু এবং ২০১৫ সালে কার্যক্রম শুরুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাগর–রুনির মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ও কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সামিট গ্রুপের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

অর্থসম্পদ কিংবা জমিজমা নিয়ে বিরোধের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না, তাও তদন্ত করা হয়। নিহতদের গ্রামের বাড়িতে খোঁজখবর নিয়ে কারও সঙ্গে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব সম্ভাব্য কারণের কোনোটি থেকে প্রমাণ না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হত্যার উদ্দেশ্য এখনো অজানা।

উদ্ধার হয়নি মোবাইল ফোন ও দুটি ল্যাপটপ

সাগর–রুনি হত্যা মামলায় লুণ্ঠিত মোবাইল ফোন ও দুটি ল্যাপটপ এখনো উদ্ধার করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পিবিআই, সিআইডি, পুলিশ সদর দপ্তর ও র‍্যাবের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পরও এসব সামগ্রী উদ্ধারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি।

তদন্তকারীদের মতে, লুণ্ঠিত ডিভাইসগুলো উদ্ধার করা গেলে সেগুলোতে থাকা তথ্য, যোগাযোগের রেকর্ড কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল উপাত্ত মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটনে সহায়ক হতে পারে। তবে ডিভাইসগুলোতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো তথ্য রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাবেক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের মধ্যে সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা মনে করছেন, এসব ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হলে মামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা তদন্তের নতুন দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে। তবে প্রতিবেদনে তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণের কথা বলা হয়নি। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে না পারার বিষয়টি তদন্তের অগ্রগতির সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সাংবাদিক রুমী নোমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বাকি ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর নাম কীভাবে এল

সাগর–রুনি হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর নামও এসেছে। তবে তাঁদের নাম এসেছে মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের বক্তব্য ও তাঁদের হাতে থাকা ডিজিটাল আলামতসংক্রান্ত তথ্যের সূত্র ধরে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্তের ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩০ আগস্ট বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বক্তব্য দেন। তিনি জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এনটিএমসির সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু ডিজিটাল আলামত জব্দ করেছে।

জব্দ করা আলামতের মধ্যে বিভিন্ন জিও লোকেশন, খুদে বার্তা এবং কল ডিটেইল রেকর্ডের (সিডিআর) মুদ্রিত কপি ছিল বলে ওই বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। এ–সংক্রান্ত বিষয়ে জিয়াউল আহসানের একজন অর্ডারলি, অর্থাৎ তাঁর দায়িত্বে নিয়োজিত এক সেনাসদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল বলেও জানানো হয়।

প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান এবং একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তাঁরা ধারণা করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে একই ধরনের বক্তব্য দেন।

তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাস্কফোর্সের সদস্যরা চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে আলোচনা করেন। ওই আলোচনায় তাঁরা প্রাথমিকভাবে সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা পেয়েছেন বলে জানান। তবে তাঁদের প্রাথমিক তদন্ত তখনো চলছিল এবং তথ্যগুলো যাচাই–বাছাই করা হচ্ছিল।

প্রসিকিউটররা তাঁদের প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে সংগৃহীত তথ্য–উপাত্ত পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করবেন বলে জানান। সেই অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি চিফ প্রসিকিউটর বরাবর একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর তারিখে পাঠানো ওই চিঠিতে তাঁদের কাছে সংরক্ষিত মামলাসংশ্লিষ্ট ডিজিটাল আলামত ও তথ্য–উপাত্ত তদন্তের স্বার্থে হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়। তবে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় পর্যন্ত এসব তথ্য–উপাত্ত পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর নাম তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এলেও তাঁদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। প্রসিকিউটরদের প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্য পিবিআইয়ের হাতে পৌঁছানো এবং সেগুলো যাচাই–বাছাই করার পরই এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তাঁদের বিরুদ্ধে উল্লিখিত সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।

তদন্ত শেষ করতে আরও ছয় মাস সময়

সাগর–রুনি হত্যা মামলার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটন, অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে আরও সময় প্রয়োজন বলে অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে টাস্কফোর্স।

প্রতিবেদনটি হাইকোর্টে উপস্থাপনের পর রাষ্ট্রপক্ষ তদন্ত শেষ করতে আরও সময় চায়। শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রতিবেদনের অংশবিশেষ তুলে ধরেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী।

রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। নিহতদের পরিবারের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আরও ছয় মাস সময় দেন এবং আগামী ২৯ এপ্রিল পরবর্তী আদেশের দিন নির্ধারণ করেন। এর ফলে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের তদন্তের সময়সীমা আবারও বাড়ল।

২০১২ সালে হত্যা, এরপর দীর্ঘ তদন্ত

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। সে সময় সাগর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা টেলিভিশনে এবং রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পর রুনির ভাই নওশের আলম রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। প্রথমে মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে ছিল গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্ট মামলাটির তদন্তভার র‍্যাবের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে র‍্যাব মামলাটির তদন্ত করে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং অপরাধীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তদন্তের পদ্ধতি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব র‍্যাবের কাছ থেকে পরিবর্তনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রসচিবের পক্ষে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তদন্ত শেষে ছয় মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।

আদালতের নির্দেশের পর টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এতে পিবিআই, সিআইডি, পুলিশ সদর দপ্তর ও র‍্যাবের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তদন্ত পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এরপর ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল মামলাটি আদালতে উঠলে তদন্ত চলমান থাকার কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আরও নয় মাস সময় চায়। আদালত ছয় মাস সময় মঞ্জুর করেন। একই বছরের ২৩ অক্টোবর আবারও সময় চাওয়া হলে আদালত আরও ছয় মাস সময় দেন।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল মামলাটি আদালতে ওঠে। সেদিনও রাষ্ট্রপক্ষ তদন্তের জন্য সময় চায় এবং আদালত ছয় মাস সময় মঞ্জুর করেন। সর্বশেষ ২৭ অক্টোবর অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর আবারও ছয় মাস সময় দেওয়া হলো।

এভাবে তদন্তের সময় একাধিকবার বাড়লেও এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য, অপরাধীদের পরিচয় এবং তাঁদের শনাক্ত করার মতো চূড়ান্ত তথ্য সামনে আসেনি।

সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডের পর ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে। ঘটনাস্থলে পাওয়া দুই অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ শনাক্ত করা যায়নি, লুণ্ঠিত মোবাইল ফোন ও দুটি ল্যাপটপ উদ্ধার হয়নি এবং হত্যার উদ্দেশ্যও অজানা রয়ে গেছে। জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীকে ঘিরে প্রসিকিউটরদের প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্যও এখনো তদন্তকারী সংস্থার কাছে পৌঁছায়নি। এসব বিষয় যাচাই করে অপরাধী শনাক্ত ও মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে আরও সময় চেয়েছে টাস্কফোর্স।

আদালতের দেওয়া নতুন সময়সীমার মধ্যে তদন্তে কী অগ্রগতি হয়, অজ্ঞাত ডিএনএর পরিচয় শনাক্ত করা যায় কি না এবং ডিজিটাল আলামত থেকে নতুন তথ্য পাওয়া যায় কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রত্যাশী পরিবারটির জন্য মামলার নির্ভরযোগ্য তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করাই এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এই শাখার আরও খবর

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর শেষ বিদায়েও বাধা: আমরা কোন বাংলাদেশের পথে?

​বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক প্রাপ্তি নয়। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। ১৯৭১…

আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে ফেরানোর দাবি নিয়ে জাতিসংঘের দ্বারস্থ শেখ হাসিনা

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দলটিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়ে নতুন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের কাছে…

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিরক্ষা প্রতিনিধির সঙ্গে বাংলাদেশি সামরিক কর্মকর্তার বৈঠক, যা জানা যাচ্ছে

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার হাসান মাহমুদের সঙ্গে দুই দিনে পৃথক বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এবং চীনের…

ঢামেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট, মরদেহ ও রোগী নিতে চরম ভোগান্তি

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘট চলছে। এতে হাসপাতাল থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর এবং মৃত ব্যক্তির মরদেহ…

ময়মনসিংহে এবার আরেক হিন্দু যুবক রবেন্দ্র ঋষিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

ময়মনসিংহের ভালুকায় সেলুনে ঢুকে রবেন্দ্র ঋষি নামে এক নরসুন্দরকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলার জামিরদিয়া এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট এলাকায় এ ঘটনা…

ভারতীয় গোয়েন্দার সঙ্গে বৈঠক কেন অস্বীকার করছে জামায়াত

ভারতের উচ্চপর্যায়ের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের গোপন বৈঠকের অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au