ঢামেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট, মরদেহ ও রোগী নিতে চরম ভোগান্তি। ছবিঃ সংগৃহীত
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘট চলছে। এতে হাসপাতাল থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর এবং মৃত ব্যক্তির মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে অনেককে বিকল্প যানবাহনে রোগী ও মরদেহ নিয়ে যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন ধর্মঘটের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত তাঁদের অ্যাম্বুলেন্স চলাচল বন্ধ থাকবে।
শাহাদাত হোসেনের অভিযোগ, হাসপাতালের নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো. ফরহাদ হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে তাঁদের সব অ্যাম্বুলেন্স সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্য তাঁদের জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে বলা হয়। সেখানে তাঁরা সিসি ক্যামেরা, লাইট ও গেট স্থাপন করেন। তবে পরবর্তী সময়ে ওই জায়গা থেকেও তাঁদের অ্যাম্বুলেন্স সরিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, হাসপাতালের ভেতরে অ্যাম্বুলেন্স রাখার সুযোগ না থাকায় রাস্তায় গাড়ি রাখতে হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও পুলিশের সার্জেন্ট মামলা দিচ্ছেন। হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচে অ্যাম্বুলেন্স রাখার ব্যবস্থা করতে তাঁরা কয়েক লাখ টাকা খরচ করেছেন। এ অবস্থায় পার্কিংয়ের দাবিতে ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।
শাহাদাত হোসেন আরও বলেন, নতুন ভবনের নিচে যে জায়গায় তাঁরা পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন, সেখানে প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে সরকারকে নির্ধারিত রাজস্ব দিতেও তাঁরা রাজি। তাঁদের দাবি, অ্যাম্বুলেন্স রাখার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাঁদের কোনো অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করছে না বলেও জানান তিনি।
এদিকে, ধর্মঘটের কারণে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রোগী ও মরদেহ নিয়ে স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন এমন গুরুতর অসুস্থ রোগী এবং মৃত ব্যক্তির মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে অনেক স্বজনকে অসহায় অবস্থায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা মো. শাহীন জানান, তাঁর ৭০ বছর বয়সী দাদি হালিমা বেগমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়েছিল। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে তিনি মারা যান। এরপর মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে শুরু করেন তাঁরা। কিন্তু তিন ঘণ্টার বেশি সময় খুঁজেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাননি।
শাহীন বলেন, “সরকারি হাসপাতালে এসেও এমন বিপদে পড়তে হবে, তা কখনো ভাবিনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও চোখে পড়েনি। স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছি।”
একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েন যাত্রাবাড়ী থেকে আসা মোহাম্মদ মনির হোসেন। তিনি জানান, তাঁর বড় ভাগিনা মো. রাসেল (২২) অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরে হাসপাতালের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে রাসেল মারা যান।
এরপর রাসেলের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে থাকেন স্বজনরা। কিন্তু দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও তাঁরা কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাননি।
মনির হোসেন বলেন, “হাসপাতালের একজন চিকিৎসক আমাদের ভ্যানে করে মরদেহ নিয়ে যেতে বলেছেন। স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে মরদেহ নেওয়ার গাড়ি না পেয়ে অসহায় মানুষের মতো বসে আছি। এত বড় সরকারি হাসপাতালে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, তা কল্পনাও করিনি।”
শুধু মরদেহ নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেই নয়, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরেও সংকট দেখা দিয়েছে। খুলনা থেকে গুরুতর আহত শাশুড়িকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন আব্দুল আহাদ। পরে তাঁর শাশুড়িকে কিডনি হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু দুপুর থেকে অ্যাম্বুলেন্স খুঁজেও তিনি পাননি বলে জানান।
আব্দুল আহাদ বলেন, “সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া যাচ্ছে না, কেউ কোনো সমাধান দিতে পারছেন না। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে। সময়মতো অন্য হাসপাতালে নিতে না পারলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকেই অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কারণে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এমনকি পিকআপভ্যানে করেও রোগী বা মরদেহ নিয়ে গেছেন।
তাঁরা জানান, হাসপাতালের বাইরে থেকেও অনেক অ্যাম্বুলেন্স আসছে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে রোগী ও মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বজনরা প্রয়োজনীয় অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছেন না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে গাড়ি না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন।
কর্মচারীদের মতে, অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আলোচনা করে দ্রুত সমস্যাটির সমাধান করা প্রয়োজন। পার্কিং নিয়ে বিরোধের কারণে যেন রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ভোগান্তি দীর্ঘায়িত না হয়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের অভিযোগ এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।
পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘটের কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি হাসপাতালে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী স্বজনরা। তাঁদের মতে, পার্কিং নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অসুস্থ রোগী ও স্বজন হারানো পরিবারগুলোকে।