পলিন হ্যানসন । ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ায় যেসব প্রার্থনাকেন্দ্রে ঘৃণা ও সহিংসতার প্রচার করা হয়, সেগুলো বন্ধ করার ক্ষমতা চান ওয়ান নেশন পার্টির নেতা পলিন হ্যানসন। একই সঙ্গে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া বিদেশি ধর্মীয় প্রচারকদের দেশ থেকে বহিষ্কারের অঙ্গীকার করেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ায় উগ্র ইসলামবাদকে দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে দেওয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন কুইন্সল্যান্ডের এই সিনেটর।
শুক্রবার মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়া-ইসরায়েল চেম্বার অব কমার্সের এক মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে হ্যানসন এসব কথা বলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে সিডনির বন্ডাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ওই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। তাঁর মতে, এটি ছিল উগ্র ইসলামবাদের সমস্যা, যা অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে।
হ্যানসন বলেন, ‘যেসব প্রার্থনাকেন্দ্রে ঘৃণা ছড়ানো হয়, সেগুলো বন্ধ করার ক্ষমতা আমি চাই। সহিংসতায় উসকানি দেওয়া বিদেশি ধর্মীয় প্রচারকদের বিমানে তুলে দেশ থেকে বের করে দিতে চাই। আর যারা অস্ট্রেলিয়ায় জন্মেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে চাই। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এএসআইও (ASIO) এবং ফেডারেল পুলিশের প্রয়োজনীয় সব সম্পদ ও সক্ষমতা থাকা উচিত।’
বক্তব্যে তিনি মেলবোর্নের এক ধর্মীয় প্রচারকের কথাও উল্লেখ করেন। গত মাসে ওই প্রচারকের বিরুদ্ধে অনুসারীদের খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানানোর অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল।
হ্যানসন অস্ট্রেলিয়া সরকারের প্রস্তাবিত ঘৃণাবিরোধী আইন নিয়েও সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, সরকার নির্দিষ্ট হুমকি বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে চিহ্নিত না করে এমনভাবে আইন প্রণয়ন করছে, যেন অস্ট্রেলিয়ার সব মানুষই সমস্যার অংশ।
তিনি বলেন, ‘খ্রিষ্টানরা জিহাদের ডাক দিচ্ছে না, হিন্দুরা জিহাদের ডাক দিচ্ছে না, ইহুদিরাও জিহাদের ডাক দিচ্ছে না। তাহলে এমন আইন কেন তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে সবাইকে একইভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে?’
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, তাঁর বক্তব্য অস্ট্রেলিয়ার সব মুসলিমকে লক্ষ্য করে নয়। বন্ডাই হামলাকারীদের একজনের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেওয়া মুসলিম ব্যক্তি আহমেদ আল-আহমেদের প্রশংসা করে তাঁকে ‘নায়ক’ হিসেবে অভিহিত করেন হ্যানসন।
তিনি বলেন, ‘কেউ যেন আপনাদের এটা বলতে না পারে যে আমি এই দেশের সব মুসলিমের কথা বলছি। আমি তা বলছি না।’
গত ডিসেম্বরে বন্ডাইয়ে ইহুদিদের হনুক্কা উৎসবকে কেন্দ্র করে চালানো সন্ত্রাসী হামলায় ১৫ জন নিহত হন। এ হামলার পর প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজে হামলাকারীদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বক্তব্য দিতে প্রায় দুই দিন সময় নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন হ্যানসন। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার দুই দিন পর সিডনির অপেরা হাউসের বাইরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। ওই বিক্ষোভের সময় সিডনির ইহুদি বাসিন্দাদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন হ্যানসন।
তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অস্ট্রেলীয়কে বাড়িতে অবস্থান করতে বলা মেনে নেব না, যেমনটি সিডনিতে ঘটেছিল। ইহুদি অস্ট্রেলীয়দের ক্ষেত্রেও নয়, অন্য কারও ক্ষেত্রেও নয়। আর কখনো নয়।’
অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে ইহুদিবিদ্বেষ নির্মূলের আহ্বান জানিয়ে হ্যানসন বলেন, গ্রিনস পার্টির মধ্যে ইহুদিবিদ্বেষ ব্যাপকভাবে রয়েছে এবং লেবার পার্টির ভেতরেও এটি ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অন্যদের কাছে যে মানদণ্ড প্রত্যাশা করেন, নিজের দল ওয়ান নেশনকেও সেই একই মানদণ্ডে বিচার করবেন বলে জানান তিনি।
হ্যানসনের বক্তব্যকে স্বাগত, তবে সব পক্ষের জন্য একই মানদণ্ডের আহ্বান
অস্ট্রেলিয়ার জায়নিস্ট ফেডারেশনের সভাপতি জেরেমি লাইবলার হ্যানসনের বক্তব্যের কয়েকটি দিককে স্বাগত জানিয়েছেন। বিশেষ করে, তিনি যে অস্ট্রেলিয়ার সব মুসলিমকে তাঁর সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু করছেন না, তা স্পষ্ট করায় সন্তোষ প্রকাশ করেন লাইবলার।
তিনি বলেন, ‘অন্য অস্ট্রেলীয়দের হেয় বা কলঙ্কিত না করেও আমাদের ইহুদিবিদ্বেষ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিতে সক্ষম হতে হবে।’
ওয়ান নেশন পার্টিকেও একই মানদণ্ডে বিচার করার বিষয়ে হ্যানসনের অঙ্গীকারকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন লাইবলার। তাঁর মতে, উগ্র বামপন্থা কিংবা উগ্র ডানপন্থা, যেখান থেকেই ইহুদিবিদ্বেষ ছড়াক না কেন, তা সমানভাবে মোকাবিলা করতে হবে। রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া উচিত নয়।
লাইবলার ওয়ান নেশন পার্টির প্রতি আহ্বান জানান, দলটির প্রার্থী, সদস্য কিংবা দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি যেন হলোকাস্ট অস্বীকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার কিংবা অস্ট্রেলীয় ইহুদিদের ওপর হামলাকে সাজানো ঘটনা হিসেবে তুলে ধরার মতো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না পান। এ ধরনের আচরণ ঘটলে দলকে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ সব জাতিগত ও সামাজিক পটভূমির মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক অস্ট্রেলীয় পরিচয়ের ধারণা তুলে ধরতে ওয়ান নেশনকে আহ্বান জানান লাইবলার। তাঁর ভাষায়, হ্যানসনের বক্তব্য একটি স্বাগতযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির পক্ষে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্তের আহ্বান
আগামী ২৮ নভেম্বর ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই নির্বাচনে ওয়ান নেশন পার্টি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে জানান হ্যানসন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ভোট দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। হ্যানসন বলেন, ‘১৯৪৭ সালে অস্ট্রেলিয়া ছিল বিশ্বের প্রথম দেশ, যারা ইসরায়েলের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে দাঁড়িয়ে হ্যাঁ বলেছিল। আমি চাই, অস্ট্রেলিয়া আবারও সেই অবস্থানে ফিরে যাক।’
এ সময় গাজায় জিম্মিরা আটক থাকা অবস্থায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন তিনি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মেলবোর্নের রিপনলিয়ায় আদাস ইসরায়েল সিনাগগে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও উল্লেখ করেন হ্যানসন। তাঁর দাবি, অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এএসআইও ওই হামলার সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছিল।
তবে প্রার্থনাকেন্দ্র বন্ধ, বিদেশি ধর্মীয় প্রচারক বহিষ্কার এবং ঘৃণাবিরোধী আইন প্রয়োগের বিষয়ে হ্যানসনের প্রস্তাবগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। তাঁর বক্তব্যে উগ্রবাদ ও ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলার পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে।