রণধীর জয়সওয়াল। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে চলমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে ভারত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, ভবিষ্যৎমুখী ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রত্যাশা জানিয়েছে দেশটি। মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, ভারত বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সেখানে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। সেখানে বিভিন্ন ঘটনা ঘটছে এবং আমরা সেগুলোর ওপর নজর রাখছি। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা ইতিবাচক, ভবিষ্যৎমুখী ও গঠনমূলক সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।’
দুই দেশের অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন এবং বিশেষ করে গঙ্গার পানি চুক্তি নিয়ে আলোচনার বিষয়েও ভারতের অবস্থান তুলে ধরেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। তিনি বলেন, অভিন্ন নদীগুলোর পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হবে।
জয়সওয়াল বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি যৌথ নদী কমিশন রয়েছে। গঙ্গাসহ দুই দেশের অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য এটিই নির্ধারিত কাঠামো।’
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আসন্ন উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়েও কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে জয়সওয়াল বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য থাকলে আপনাদের জানানো হবে।’
ভারতের এই বক্তব্য এমন সময়ে এল, যখন বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন টানা চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। মঙ্গলবার সকালে ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানায় আংশিকভাবে উৎপাদন শুরু হলে শ্রমিকেরা কাজে ফিরতে শুরু করেন। কিন্তু কিছু সময় পর আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকেরা কারখানা থেকে বের হয়ে সড়কে অবস্থান নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
মিরপুরের যেসব কারখানায় আংশিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়েছিল, সেসব এলাকায়ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি বজায় ছিল। কারখানার কার্যক্রম কিছুটা স্বাভাবিক হলেও নতুন করে শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হওয়ায় পোশাকশিল্প এলাকায় অস্থিরতা অব্যাহত থাকে।
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি শ্রমিকদের
পোশাকশ্রমিকদের প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো। বর্তমানে তাঁদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকেরা এই মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছেন।
আন্দোলন ঘিরে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১২ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করেছে। মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বাহিনীটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মোতায়েন করা বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছেন। শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে তাঁরা কাজ করছেন।
মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিও জোরদার করেছে বিজিবি। এ জন্য ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
পাশাপাশি মাঠে দায়িত্ব পালনকারী বিজিবি সদস্যদের কার্যক্রম বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির ব্যবহার দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেও সহায়তা করছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিপেটা
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের চতুর্থ দিনে মঙ্গলবার ঢাকার মিরপুর এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে।
সকালে মিরপুরের কয়েকটি পোশাক কারখানায় আংশিকভাবে উৎপাদন শুরু হলে শ্রমিকেরা কাজে ফিরতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরে কারখানা থেকে বের হয়ে তাঁরা সড়কে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে।
এর আগে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। কিছু কারখানা বন্ধ রাখা হয়, আবার কয়েকটি কারখানায় আংশিক উৎপাদন চালু করা হয়। তবে শ্রমিকদের দাবি পূরণ না হওয়ায় আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
আন্দোলনে সাবেক আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট শিল্পমালিকদের ইন্ধনের অভিযোগ
এদিকে পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার পেছনে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ও কারখানার মালিকদের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার তিনি বলেন, এসব শিল্পোদ্যোক্তার কয়েকজন বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে শ্রমিক অসন্তোষে জড়িত থাকার তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
দ্য ডেইলি স্টার-এর বরাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তাঁদের কয়েকজন বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে, এই শিল্পোদ্যোক্তারাই অস্থিরতার পেছনে রয়েছেন এবং বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো শ্রমিকদের ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে সক্রিয় কিছু ব্যক্তিও এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্য অস্থিরতা নিয়ে গোয়েন্দা সতর্কতা পাওয়ার পরও সরকার প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করেছে। তবে এখন সহিংসতায় উসকানি দেওয়া কিংবা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, মজুরি বৃদ্ধির দাবি এবং শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যখন উত্তেজনা চলছে, তখন ভারতের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেওয়া হলো। তবে শ্রমিকদের দাবি, কারখানার কার্যক্রম এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট মহল।
সূত্রঃ দ্য ট্রিবিউন