বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন পর্যবেক্ষণ করছে ভারত
বাংলাদেশে চলমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে ভারত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, ভবিষ্যৎমুখী ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রত্যাশা জানিয়েছে…
বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবিতে চলমান আন্দোলনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার জন্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছে সরকার। আন্দোলনের চতুর্থ দিনে মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। সহিংসতার কারণে নতুন করে আরও ৩০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে বন্ধ বা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া কারখানার সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল ছাড়াও গাজীপুর, আশুলিয়া, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং ময়মনসিংহে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ এবং কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। বর্তমানে তাঁদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ বর্তমান মজুরির দ্বিগুণেরও বেশি বেতন চান তাঁরা। শ্রমিকদের বক্তব্য, খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান মঙ্গলবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দেওয়ার পেছনে রয়েছেন। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনা বেঁচে থাকা পর্যন্ত সরকারকে শান্তিতে কাজ করতে দেবেন না।
জাহেদুর রহমান বলেন, “শেখ হাসিনা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন তিনি সরকারকে শান্তিতে থাকতে দেবেন বলে আমি বিশ্বাস করি না। তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চলতে পারে।” চলমান আন্দোলনের নেপথ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে শেখ হাসিনা ও বিলুপ্ত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক বলে এর আগে দেওয়া জাহেদুর রহমানের বক্তব্যের সঙ্গে এবারের মন্তব্যে পরিবর্তন দেখা গেছে।
এর আগে সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু পোশাক কারখানার মালিক শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দিচ্ছেন। তাঁর দাবি, সহিংসতার পেছনে শেখ হাসিনার সমর্থকেরা জড়িত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনও বলেছেন, শ্রমিক আন্দোলনে ‘পলাতক অপশক্তির’ অনুপ্রবেশের প্রমাণ পেয়েছে সরকার। তাঁর বক্তব্যে এই অপশক্তি বলতে আওয়ামী লীগকে ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্দোলনের মধ্যে যারা অনুপ্রবেশ করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করছে, তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হবে এবং আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে গত জুলাইয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দলটি আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে না।

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিক অসন্তোষ। ছবিঃ সংগৃহীত
এদিকে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন এমন এক সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন মৌসুম পার করছে। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে।
চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এই খাতের মাধ্যমে এইচঅ্যান্ডএম, জারা ও গ্যাপের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক সরবরাহ করা হয়।
উৎপাদনকারীরা আশঙ্কা করছেন, বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের পোশাকের অর্ডার সরবরাহের ব্যস্ত সময়ে কারখানার কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে রপ্তানি চালান পাঠাতে দেরি হতে পারে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অর্ডার বাতিলের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্দোলন ও সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০ জন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এরপর তিনি ভারতে চলে যান। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন।
শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে চলমান সংকট নিরসনে রোববার সরকার ছয় সদস্যের একটি ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডটির দায়িত্ব পোশাকশ্রমিকদের বর্তমান বেতন কাঠামো পর্যালোচনা করে নতুন মজুরি সুপারিশ করা। তবে আন্দোলন অব্যাহত থাকায় মঙ্গলবার পর্যন্ত বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।
সংঘর্ষে কয়েক ডজন শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কিছু বিক্ষোভকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও পাথর ছুড়েছেন।
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জে নতুন করে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে শ্রমিকেরা বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে ঢাকার সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করেন এবং ফেলে দেওয়া টায়ারে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিপেটা করে।
ঢাকার উপকণ্ঠে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে ইট ও পাথর ছুড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। ঢাকার মিরপুর এলাকাতেও একই ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

রবিবার মিরপুরে শ্রমিকদের আন্দোলন। ছবি: সংগৃহীত
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এর আগে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছিল। মঙ্গলবার বাহিনীটি আরও সদস্য মোতায়েনের কথা জানিয়েছে। গাজীপুরে ১২ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জে দুই প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বিজিবি জানিয়েছে, ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ জন্য বাহিনীর সদর দপ্তরে একটি মনিটরিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি নজরদারিতে ড্রোন ও সদস্যদের শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে।
আন্দোলন শুরুর পর শ্রমিকেরা অভিযোগ করেন, সরকারি কর্মচারীদের সাম্প্রতিক বেতন বৃদ্ধি তাঁদের সঙ্গে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মজুরির বৈষম্য আরও স্পষ্ট করেছে। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে শ্রমিকনেতা বলেন, “জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যের একই দাম আমাদেরও দিতে হয়।”
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বর্তমানে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও তাঁদের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। দেশে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকায় সীমিত আয়ের শ্রমিকদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরির দাবি, অন্যদিকে কারখানা সচল রাখা ও রপ্তানি অর্ডার সময়মতো সরবরাহের চাপ, দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে সরকার ও পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের।
সূত্রঃ ইটিভি ভারত নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au