স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার ছয় দিন পর পদত্যাগ করলেন পরিবহনমন্ত্রী
স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৯ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হওয়ার ছয় দিন পর পদত্যাগ করেছেন দেশটির পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর)…
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকেরা তাঁদের আন্দোলনে রাজনৈতিক উসকানি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তাঁদের দাবি, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্ররোচনায় নয়, বরং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে তাঁরা রাস্তায় নেমেছেন।
মঙ্গলবার (মঙ্গলবার) ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দফায় দফায় সংঘর্ষে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এ ঘটনায় আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, শ্রমিকদের আন্দোলনে বহিরাগতরা ঢুকে পড়েছে।
পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা ও শ্রমিকনেতার অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কয়েকটি গোষ্ঠী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির জন্য শ্রমিকদের আন্দোলনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তবে এ ধরনের সংশ্লিষ্টতার পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
অন্যদিকে শ্রমিকেরা বলছেন, তাঁদের আন্দোলনের মূল কারণ অর্থনৈতিক সংকট। আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করলে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো আড়ালে পড়ে যাবে।
মিরপুরের এক শ্রমিক বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আমাদের পেটে টান পড়েছে। বেঁচে থাকার তাগিদেই আমরা আন্দোলন করছি।’
শ্রমিকদের মতে, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করলেও তাতে সংকটের সমাধান হবে না। মজুরি বাড়ানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
মিরপুরে আন্দোলনে অংশ নেওয়া পোশাকশ্রমিক শোয়েব ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভাঙচুর বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতার সঙ্গে শ্রমিকদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
তিনি বলেন, ‘আমরা শ্রমিকেরা কোনো ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত নই। কেউ এ ধরনের কাজ করলে সেটি দেখার দায়িত্ব পুলিশের।’
শোয়েবের অভিযোগ, পুলিশ অন্যায়ভাবে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। সহকর্মীদের বিনা কারণে গ্রেপ্তার করা হলে শ্রমিকেরা তা প্রতিহত করবেন বলেও সতর্ক করেন তিনি।
আরেক শ্রমিক শেফালী বেগম বলেন, বাইরের কোনো গোষ্ঠীর প্ররোচনায় তাঁরা আন্দোলন করছেন না। নিজেদের ন্যায্য দাবিতেই রাস্তায় নেমেছেন।
তিনি বলেন, ‘কেউ আমাদের উসকানি দেয়নি। আমরা আমাদের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করছি।’
শেফালীর মতে, আন্দোলনে ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো বহিরাগত ঢুকে থাকলে পুলিশ তাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু এ জন্য সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে দায়ী করা অন্যায়।
তিনি বলেন, ‘অন্য কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ আন্দোলনে ঢুকে থাকলে সেটা দেখার দায়িত্ব পুলিশের। সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে এ জন্য দায়ী করা ঠিক নয়।’
শেফালী আরও বলেন, মজুরি নিয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা ছাড়া শ্রমিকেরা আর আশ্বাসে ভরসা রাখতে চান না। তাঁর ভাষায়, ‘সরকারের উচিত আলোচনায় বসে আমাদের দাবি বাস্তবায়ন করা। মজুরি বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলেই আমরা কাজে ফিরব।’
শামীম নামের আরেক শ্রমিক বলেন, সরকার ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির ঘোষণা দিলেই আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, ‘সরকার যদি ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির ঘোষণা দেয়, তাহলে সব শ্রমিক কারখানায় ফিরে যাবেন। রাস্তায় আর কেউ থাকবেন না।’
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির বাইরে ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু ব্যক্তি আন্দোলনে ঢুকে পড়েছে বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কেউই পোশাকশ্রমিক নন।
মঙ্গলবার আশুলিয়ার শিল্পকারখানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কিছু দুষ্কৃতকারী সেখানে অনুপ্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’
সহিংসতায় উসকানিদাতাদের শনাক্ত করতে পুলিশ তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনও অভিযোগ করেন, বোরকা ও হেলমেট পরা কিছু ব্যক্তি শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। এসব কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের বিষয়ে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এ দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রমাণ তুলে ধরেননি।
এদিকে মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার মজুরি বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন অব্যাহত রাখার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, ‘এখন যারা আন্দোলন করছে, তারা শ্রমিক নয়। সরকার শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর জন্য ইতিমধ্যে বোর্ড গঠন করেছে। মজুরি বাড়বেই।’
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পুলিশের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততা নিয়ে কয়েকজন শ্রমিকনেতাও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে তাঁরা ন্যায্য বলে স্বীকার করেছেন।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন ইতিবাচক পদক্ষেপ। তাই শ্রমিকদের কারখানায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তবে কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে আন্দোলনকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন নাজমা।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘শ্রমিকদের দাবি ন্যায্য। কিন্তু আগুন দেওয়া, লুটপাট ও ভাঙচুর কি কখনো সমাধান হতে পারে?’
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটির সভাপতি তাসলিমা আক্তারও আন্দোলনে বহিরাগতদের উসকানির অভিযোগ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে এই আন্দোলনকে ব্যবহার করছে। এখানে স্পষ্ট উসকানি রয়েছে।’
দুই শ্রমিকনেতাই শ্রমিকদের শান্ত থাকার এবং মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্দোলন ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই মঙ্গলবার ঢাকার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
মিরপুরে সকালে বিভিন্ন কারখানা থেকে বেরিয়ে আসেন পোশাকশ্রমিকেরা। একপর্যায়ে তাঁরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এ সময় কিছু আন্দোলনকারীও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
দফায় দফায় সংঘর্ষে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যরা আহত হন। কালশী মোড়ে সায়মন নামের এক পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার খবরও পাওয়া গেছে।
গাজীপুরে শ্রমিকেরা কয়েক দফায় ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ অবরোধ করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়। এতে সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে আন্দোলন দমাতে লাঠিসোঁটা হাতে বিএনপির কয়েকজন কর্মীর উপস্থিতির অভিযোগ উঠেছে। তবে তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে সড়ক অবরোধের কারণে যাত্রীবাহী বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ও আন্দোলনে বহিরাগতদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের মধ্যেও শ্রমিকেরা তাঁদের মূল দাবি থেকে সরে আসেননি। তাঁদের দাবি, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে সরকারকে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে হবে।
শ্রমিকদের বক্তব্য, তাঁদের আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা ষড়যন্ত্রের অংশ নয়। এটি জীবনধারণের লড়াই। মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তাঁরা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au