বাংলাদেশ

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রভাব পোশাকশিল্পে, শ্রমিক আন্দোলন দমনে ব্যবহৃত হচ্ছে দলীয় পরিচয়!

মতামত- সঙ্গীতা গাজী

  • 1:27 pm - November 07, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৭ বার
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রভাব পোশাকশিল্পে। ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত এখন পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের আন্দোলনকেও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এতে দেশের গণতন্ত্র, শ্রমিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে কার্যকর নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বাইরে রাখা হয়েছিল। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল, দেশের কোনো রাজনৈতিক দল বা জনগোষ্ঠীকে আর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে না। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের বেশি সময় পর সেই প্রত্যাশা থেকে দেশ ক্রমেই সরে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দ্যা ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধটির লেখক।

তাঁদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত এখন গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং বিরোধী মত দমনের বিস্তৃত সুযোগ তৈরি করেছে। এমনকি ন্যূনতম জীবনধারণের উপযোগী মজুরির দাবিতে আন্দোলন করা পোশাকশ্রমিকদের বিরুদ্ধেও একই রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি শুধু গণতন্ত্রের জন্য নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক। কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে তৈরি পোশাকশিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও কমতে পারে।

আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। নিবন্ধটির মূল বক্তব্য, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এখন রাজনৈতিক পরিসর ছাড়িয়ে শ্রমিক আন্দোলনেও বিস্তৃত হচ্ছে। তবে নিবন্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ ও ব্যাখ্যা লেখকদের বিশ্লেষণ, এগুলোকে সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

যেভাবে নিষিদ্ধ হলো আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এর কয়েক মাস পর, ২০২৪ সালের অক্টোবরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়।

এরপর ২০২৫ সালের ১২ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধিত বিধান ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমও সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার।

এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় দলটির সভা-সমাবেশ, সাংগঠনিক কার্যক্রম, প্রকাশনা এবং দলটির পক্ষে অনলাইনে প্রচার-প্রচারণাও নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে।

আইন অনুযায়ী, ক্ষমতায় থাকাকালে দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের অভিযোগের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকতে পারে। কিন্তু এসব বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। ফলে স্বাধীনতার আগের সময় থেকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকা একটি বড় দল কার্যত দীর্ঘ সময়ের জন্য নির্বাচনী ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যেতে পারে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। ওই নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আরও সংহত করা হয়।

নিবন্ধটির লেখকদের মতে, একটি বড় রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত নির্বাচন রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

নিষেধাজ্ঞার পর ব্যাপক গ্রেপ্তার ও মানবাধিকার উদ্বেগ

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইন কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য উদ্ধৃত করে নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানে অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৮ হাজার ৪০০ জনের বেশি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা দায়েরের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। এসব মামলায় আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত কয়েক শ মানুষকে হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে আটক রাখা হয়েছে। তাঁদের অনেকেই নিয়মিত জামিন পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মতে, এ সিদ্ধান্ত সরকারের সংগঠন করার স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

জাতিসংঘের কয়েকজন বিশেষজ্ঞও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছিলেন, ১৯৭৮ সালের রাজনৈতিক দলবিষয়ক অধ্যাদেশে রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করার জন্য যে স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, নির্বাহী আদেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর পর্যাপ্ত বিচারিক তদারকি না থাকা এবং পরবর্তী সময়ে আইন সংশোধনের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞাকে কার্যকর রাখার বিষয়টি সিদ্ধান্তটির আইনগত ও সাংবিধানিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।

শ্রমিক আন্দোলনেও আওয়ামী লীগের তকমা ব্যবহারের অভিযোগ

নিবন্ধটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নেওয়া রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার যুক্তি এখন পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত ৩১ অক্টোবর থেকে রাজধানীর মিরপুর, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে লাখ লাখ পোশাকশ্রমিক কর্মবিরতি ও বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁদের প্রধান দাবি ছিল মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের এই দাবির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কম মজুরি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি।

আন্দোলন শুরুর এক দিনের মধ্যেই পুলিশ দাবি করে, এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অনুপ্রবেশ করেছেন এবং বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ প্রকৃত পোশাকশ্রমিক নন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে চিহ্নিত ২১ জনকে আটক করা হয়। পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আরও কয়েক হাজার অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমর্থকদের দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সীমান্তের ওপার থেকেও আন্দোলনে উসকানি দেওয়া হচ্ছে।

তবে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

অন্যদিকে, শ্রমিকেরা তাঁদের আন্দোলনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, খাবার, বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় মেটাতে না পেরেই তাঁরা রাস্তায় নেমেছেন।

গ্রেপ্তারের ভয়ে আত্মগোপনে শ্রমিক নেতারা

আন্দোলন ঘিরে পুলিশের কঠোর অবস্থান এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে শ্রমিকদের আটক করার ঘটনায় অনেক শ্রমিক নেতা আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও ছবিতে শ্রমিকদের মারধরের দৃশ্য দেখা গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। কিছু ভিডিওতে বস্তি এলাকায় পুলিশের অভিযান চালিয়ে বিক্ষোভকারীদের আটক করার দৃশ্যও রয়েছে।

নিবন্ধটির লেখকদের অভিযোগ, এসব অভিযানে অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকেই গ্রেপ্তারের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া সামগ্রিকভাবে বলপ্রয়োগের মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

অর্থনৈতিক সংকটে শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলন

শ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের দাম, মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া এবং জ্বালানির ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি বলে অভিযোগ করছেন শ্রমিকেরা।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ শ্রমিকদের একটি বড় অংশের দাবি, বর্তমান বাজারদরে এই অর্থ দিয়ে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করা কঠিন।

আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একজন অভিজ্ঞ নারী পোশাকশ্রমিক জানিয়েছেন, তিনি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। তারপরও কখনো কখনো তাঁকে না খেয়ে থাকতে হয়।

শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি এই বাস্তবতা থেকেই এসেছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে পোশাক কারখানার মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এক ধাপে মজুরি এতটা বাড়ালে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা কম্বোডিয়ায় নিয়ে যেতে পারেন।

একজন পোশাকশিল্প মালিকের নেতার বক্তব্য উদ্ধৃত করে নিবন্ধে বলা হয়েছে, ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির পক্ষে কোনো যৌক্তিক বা গাণিতিক ভিত্তি নেই বলে তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে, শ্রমিকদের বক্তব্য, বর্তমান মজুরিতে তাঁদের মৌলিক চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে মজুরি পুনর্নির্ধারণ ছাড়া শিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন।

পোশাকশিল্পে একের পর এক কারখানা বন্ধ, চাকরি হারিয়েছেন ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে নিবন্ধে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছর উভয় বছরেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পর এটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি।

এ ছাড়া দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় সরকারের রাজস্ব আদায়ের হার মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। একই সঙ্গে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ে। এর প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাকশিল্পেও।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে ৪৫৭টি তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শ্রমিক। চাকরি হারানো শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী।

এই শ্রমিকদের অনেকের জন্য আনুষ্ঠানিক খাতে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। এমনকি নতুন শ্রমিক নিয়োগের সময় কিছু প্রতিষ্ঠান প্রার্থীদের ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে নিট বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই কমে ১৪৭ কোটি ডলারে নেমেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ হার প্রায় ১৩ শতাংশ কম।

২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি বলেও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব আন্তর্জাতিক পোশাকবাজারেও পড়ছে বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ করেন এমন মার্কিন ক্রেতাদের হার এক বছরের ব্যবধানে ৮৮ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৭৮ শতাংশে নেমেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন ব্যয় বিবেচনা করেন না। তাঁরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থার ধারাবাহিকতা এবং আইনের শাসনকেও গুরুত্ব দেন।

রাজনৈতিক বঞ্চনা ও শ্রমিক আন্দোলন দমনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নিবন্ধটির লেখকদের যুক্তি, রাজনৈতিক ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ঝুঁকি। ফলে একটি বড় রাজনৈতিক দলকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ব্যবসা ও বিনিয়োগেও ছড়িয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তির কারণে বলে মনে করছেন নিবন্ধটির লেখকেরা।

২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার দিয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ৭ হাজার ১৩২টি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে। আগে এ ধরনের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া পণ্যের সংখ্যা ছিল ৪৪১টি। চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সব পণ্য শুল্কমুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

নিবন্ধটির লেখকদের মতে, বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের পরিমাণ যেখানে জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, সেখানে বিপুলসংখ্যক পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং ডলারে নির্ধারিত বড় অঙ্কের কেনাকাটার প্রতিশ্রুতি অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের করা এই চুক্তির অর্থনৈতিক দায়ভার এখন নির্বাচিত সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।

৩৯ বিলিয়ন ডলারের শিল্প, অথচ অবহেলিত শ্রমিকেরা

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠনে তৈরি পোশাকশিল্প অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। গত অর্থবছরে এই খাত থেকে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে।

কিন্তু যে শ্রমিকদের শ্রমে এই বিপুল রপ্তানি আয় আসে, তাঁরাই দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৪ জন মানুষ নিহত হন। এর আগের বছর ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১১২ জন শ্রমিক প্রাণ হারান।

এই দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং মালিকপক্ষের দায়বদ্ধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল।

কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পরও শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে সংকট কাটেনি বলে মনে করছেন নিবন্ধটির লেখকেরা।

তাঁদের মতে, প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের শিল্পে কাজ করেও একজন শ্রমিককে মাসে ১২ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে জীবন চালাতে হচ্ছে। এমনকি অভিজ্ঞ শ্রমিকদেরও কখনো কখনো খাবারের অভাবে দিন কাটাতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক পরিচয় কি শ্রমিক আন্দোলন দমনের হাতিয়ার?

নিবন্ধটির শেষাংশে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে।

লেখকদের মতে, কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পর সেই দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। কর্তৃপক্ষের কাছে অস্বস্তিকর এমন যেকোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এই পরিচয় ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়।

আজ ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন করা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হচ্ছে। আগামীকাল একই ধরনের অভিযোগ শিক্ষার্থী, সাংবাদিক কিংবা বিএনপির সমালোচকদের বিরুদ্ধেও ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

তাঁদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিরোধিতা, শ্রমিক আন্দোলন এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বড় একটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিষিদ্ধ করে দিলে প্রকৃত বিরোধিতা ও নাশকতার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের সুযোগও সংকুচিত হয়।

এটি অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর বলে মনে করছেন নিবন্ধটির লেখকেরা। তাঁদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা উৎপাদন ব্যয়ের সামান্য পার্থক্যের চেয়ে নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থাকে বেশি গুরুত্ব দেন। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে যদি বারবার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কম খরচে পণ্য তৈরির সুবিধাও শেষ পর্যন্ত অর্থবহ থাকে না।

শ্রমিকদের আন্দোলন দমন করে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও তাতে অসন্তোষের মূল কারণ দূর হয় না। বরং ভবিষ্যতে আরও তীব্র আন্দোলনের আশঙ্কা তৈরি হয়।

জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি কি হারিয়ে যাচ্ছে?

নিবন্ধটির উপসংহারে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়া বহু মানুষের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কেউ বৈধ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না।

কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা এবং মজুরির দাবিতে আন্দোলন করা শ্রমিকদের সেই দলের এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা জুলাই অভ্যুত্থানের মূল প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

লেখকদের মতে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে হলে মানুষের কথা বলার, সংগঠিত হওয়ার এবং ন্যায্য দাবি জানানোর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করে কিংবা শ্রমিকদের দাবি দমন করে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

সূত্রঃ দ্য ডিপ্লোম্যাট

লেখক- সঙ্গীতা গাজী ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ার হোয়ার্টন স্কুলের একজন প্রভাষক এবং স্ট্যানফোর্ড ল স্কুলের ট্রান্সআটলান্টিক টেকনোলজি ল ফেলো।

এই শাখার আরও খবর

ঢাকায় রাতভর ককটেল বিস্ফোরণ, আতঙ্কে নগরবাসী

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট :   রাজধানী ঢাকায় এক রাতেই অন্তত পাঁচটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খিলগাঁও, আদাবর,…

বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন, নৈতিকভাবে পোশাক কেনার আহ্বান অস্ট্রেলিয়ায়

বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বৈশ্বিক পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থায় শ্রমিকদের শোষণের ঝুঁকি…

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভাঙল এনসিপি নেতারা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  ভাষাসৈনিক ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কুমিল্লার ঐতিহাসিক বাসভবনের সামনে স্থাপিত সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা।…

৭ নভেম্বর: সংহতির আড়ালে বিভাজন

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেনি। সেই সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা, অর্থনৈতিক মুক্তি…

আওয়ামী লীগের দখলে ঢাকার রাজপথ

ভাস্কর দত্ত : রাজধানীর রাজপথে প্রকাশ্যে মিছিল-সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কখনো ঝটিকা মিছিল, কখনো মশাল মিছিল,…

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা ঘিরে উত্তাল ঢাকা, আওয়ামী লীগ কি তাহলে ফিরছে?

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au