বাংলাদেশ

মতামত: প্রফেসর ডঃ শ্যামল দাস

৭ নভেম্বর: সংহতির আড়ালে বিভাজন

যে অভ্যুত্থান মুক্তিযোদ্ধা তাহেরের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি, যে সংহতি শত শত সৈনিকের প্রাণ রক্ষা করতে পারেনি, সেই ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কাদের বিজয় নিশ্চিত করেছিল?

  • 10:33 am - November 07, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৬ বার

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেনি। সেই সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার আদর্শিক ভিত্তি প্রতিফলিত হয় ১৯৭২ সালের সংবিধানে। অথচ স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনৈতিক আদর্শ এমন এক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়, যার প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরে দেশের রাজনীতিতে অনুভূত হয়েছে। সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। দিনটিকে কেউ বলেন ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’, কেউ ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান’, আবার কারও কাছে এটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি থেকে সরে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা।

পাঠক খেয়াল করলে দেখবেন, জাসদ দিনটিকে বলে “সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস”; আর বিএনপি এটিকে বলে, “জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস”; অন্যদিকে দেশের কমপক্ষে অর্ধেক মানুষের সমর্থন যে দলটির সাথে সেই আওয়ামী লীগ এই দিনকে ডাকে “মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস”। এই যদি অবস্থা হয় দিনটির পরিচিতি নির্ধারনে তবে সেই দিনটি কীভাবে হতে পারে “সংহতির” ধারক? দিনটি কি আসলে সংহতি নাকি বিভাজনের স্মারক?

আসুন একটু অস্ত্রপচার করা যাক এই বিতর্কিত ইতিহাসের।

৭ নভেম্বরকে বিপ্লব বললেই কি সেটি বিপ্লব হয়ে যায়? বিপ্লব শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন নয়; সমাজের ক্ষমতাসম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক কাঠামোর মৌলিক রূপান্তরই একটি বিপ্লবকে সাধারণ অভ্যুত্থান থেকে আলাদা করে। সেই বিচারে ৭ নভেম্বরকে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করার ঐতিহাসিক ভিত্তি দুর্বল। বরং ঘটনাটি ছিল সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সৈনিক অসন্তোষ, বিপ্লবী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিযোগিতার এক জটিল সমাবেশ। যে ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল আবু তাহের ও তাঁর অনুসারীরা একটি নতুন সাম্যভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার পরিণতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন ডানপন্থী  জিয়াউর রহমান। তাহেরের রাজনৈতিক প্রকল্প ব্যর্থ হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পুনর্বাসনের পথ খুলে যায়। এটি কি বিপ্লবের বিজয়, নাকি বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার বিপরীত প্রতিবিপ্লবী পরিণতি? জানা যায়, সেদিন “আল্লাহু আকবর” ও “বিপ্লব চিরজীবী হোক”, এই দুই শ্লোগান উচ্চারিত হয়েছিলো পাশাপাশি। তাহলে দিনটি আসলে কাদের ছিলো?

১৯৭৫: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড থেকে ৭ নভেম্বরের রক্তাক্ত ক্ষমতা সংঘাত

৭ নভেম্বরের ইতিহাস শুরু হয়নি ৭ নভেম্বর। এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ১৯৭১ এ। এরপর স্বাধীনতাবিরোধী চরম ডানপন্থীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয়টি আসে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে। এ ঘটনাটি যদিও অল্পকিছু জুনিয়র সামরিক কর্মকর্তার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে, পরবর্তীতে কর্নেল ফারুক ও রশিদের কাছ থেকে জানা যায় যে, এতে জিয়ার মৌন সম্মতি ছিলো; এই বিষয়টি মনে রাখলে সাত’ই নভেম্বর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পক্ষে জিয়ার উত্থানকে বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে। মনে রাখা দরকার যে, কর্নেল ফারুক তাঁর যে সাক্ষাৎকারে জিয়ার সম্পৃক্ততার কথা বলেছিলেন সেটি তিনি দিয়েছিলেন গ্রেনাডা টিভি’র সাথে ১৯৭৯ সালে যখন জিয়াউর রহমান বহাল তবিয়তে বাংলাদেশ শাসন করছিলেন, অথচ ফারুকের এই বক্তব্যের কোন প্রতিবাদ করেননি? কেন? কেনইবা জিয়া ফারুক-রশিদদের তাঁর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান চেষ্টার পরও কোন একশান না নিয়ে পুর্বাবাসন করেছিলেন তাঁদের?এগুলো ইতিহাসের বড় খটকা সাত’ই নভেম্বর ও জিয়ার মূল্যায়নে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, আনুগত্যের সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটায় এবং জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। একই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। ৭ নভেম্বর আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কর্নেল আবু তাহেরের অনুসারী বিপ্লবী সৈনিকেরা, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের রাজনৈতিক কর্মীরা এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশের সদস্যরা। জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এ টি এম হায়দার এবং নাজমুল হুদা নিহত হন।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। সাত’ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সবাই একই রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী ছিলেন না এবং তাঁদের সবাইকে স্বাধীনতাবিরোধী বলা ঐতিহাসিকভাবে ভুল। বরং কর্নেল তাহেরসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সংগঠক নিজেরাই ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু অভ্যুত্থানে কারা অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত কারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছিলেন, এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন। কোনো রাজনৈতিক ঘটনার প্রকৃত চরিত্র নির্ধারণ করতে হলে শুধু তার ঘোষিত উদ্দেশ্য কিংবা অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় দেখলে চলে না; দেখতে হয়, ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত কার হাতে গেল এবং সেই ক্ষমতা কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলো। সাত নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য মূলত এই দ্বিতীয় প্রশ্নটির মধ্যেই নিহিত। আমরা দেখতে পাই তাহের যে উদ্দেশ্যে এই তথাকথিত “বিপ্লব” করতে চেয়েছিলেন সেটির ফলাফল চলে যায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতে যাদের সামরিক ফ্রন্টে নেতা ছিলেন জেনারেল জিয়া।

মার্কসীয় বিশ্লেষণে সাত নভেম্বর: বিপ্লবী রোমান্টিকতা থেকে প্রতিবিপ্লবী পরিণতি

কার্ল মার্কস ১৮৪৮ সালের ফরাসি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিপ্লবী আন্দোলনের উদ্দেশ্য এবং তার বাস্তব রাজনৈতিক পরিণতির মধ্যকার বৈপরীত্য নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাঁর The Class Struggles in France, 1848–1850 গ্রন্থে তিনি দেখান, কীভাবে রাজতন্ত্রবিরোধী বিপ্লবের পর বিভিন্ন শ্রেনীর মধ্যে ক্ষমতার সংঘাত শুরু হয় এবং শ্রমিকশ্রেনীর প্রত্যাশিত পরিবর্তনের পরিবর্তে বুর্জোয়া ক্ষমতা সুসংহত হয়। মার্কসের বিশ্লেষণে বিপ্লবের পরাজয় শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার সমাপ্তি নয়; এর মধ্য দিয়ে বিপ্লবী শক্তির সীমাবদ্ধতা, প্রতিপক্ষের সংগঠিত ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের প্রকৃত শ্রেনীগত চরিত্র উন্মোচিত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ১৮৯৫ সালে এই গ্রন্থের ভূমিকায় ব্যাখ্যা করেন, ইতিহাসের বহু বিপ্লবে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ সত্ত্বেও রাষ্ট্রক্ষমতা শেষ পর্যন্ত একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে। এমনকি প্রাথমিক সাফল্যের পর বিজয়ী শক্তিগুলোর মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে; এক অংশ আরও মৌলিক পরিবর্তন চেয়েছে, অন্য অংশ বিদ্যমান অর্জনের মধ্যেই ক্ষমতা সংহত করতে চেয়েছে। বাংলাদেশের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে এই তাত্ত্বিক আলোকে বিচার করা যেতে পারে, যদিও ফ্রান্সের ১৮৪৮ সালের সামাজিক বিপ্লব এবং বাংলাদেশের ১৯৭৫ সালের সামরিক-রাজনৈতিক অভ্যুত্থানকে অভিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যাবে না।

কর্নেল আবু তাহের ও তাঁর অনুসারীদের রাজনৈতিক প্রকল্পের মধ্যে একটি বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা ছিল। তাঁরা প্রচলিত সামরিক ক্ষমতাকাঠামো ভেঙে সৈনিকদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি, সামরিক বাহিনীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, বিস্তৃত সামাজিক সমর্থন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা কতটা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাহেরের প্রকল্পকে এক ধরনের বিপ্লবী রোমান্টিকতা বা Revolutionary Romanticism হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তাঁর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি মৌলিক, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব ক্ষমতার সম্পর্ক এক নয়। একটি সফল সামাজিক বিপ্লবের জন্য শুধু বিপ্লবী চেতনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সংগঠিত সামাজিক শক্তি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা। তাহেরের রাজনৈতিক প্রকল্পে এই উপাদানগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা ছিল বলে যুক্তি দেওয়া যায়।

এখানে ‘ইউটোপিয়ান’ শব্দটি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা প্রয়োজন। তাহের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিহীন স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন না; তাঁর সাংগঠনিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তাঁর প্রত্যাশিত রূপান্তর এবং বাস্তব ক্ষমতাসম্পর্কের মধ্যে যে ব্যবধান ছিল, সেটিকে ইউটোপিয়ান প্রবণতা হিসেবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। সাত নভেম্বরের অভ্যুত্থান সফল হলেও তাহেরের রাজনৈতিক প্রকল্প সফল হয়নি। বরং সেই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৈরি রাজনৈতিক সুযোগ শেষ পর্যন্ত এমন এক নেতৃত্বের হাতে চলে যায়, যার পরবর্তী রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি তাহেরের প্রত্যাশিত বিপ্লবী পরিবর্তনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। এখানেই প্রতিবিপ্লব বা Counterrevolution ধারণাটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। প্রতিবিপ্লব সব সময় একটি বিপ্লবের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক আক্রমণ হিসেবে ঘটে না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৈরি ক্ষমতার সুযোগ ব্যবহার করে এমন রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, যারা আন্দোলনের মূল রূপান্তরমুখী লক্ষ্যগুলো পরিত্যাগ করে কিংবা বিপরীতমুখী রাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে।

তবে ৭ নভেম্বরকে মার্কসীয় অর্থে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবিপ্লব বলা হবে কি না, সেটিও বিতর্কযোগ্য। কারণ এখানে পূর্ববর্তী কোনো সফল সামাজিক বিপ্লবের সব অর্জন সরাসরি উল্টে দেওয়া হয়নি; বরং একটি অসম্পূর্ণ বিপ্লবী প্রচেষ্টার রাজনৈতিক ফলাফল ভিন্ন ক্ষমতাগোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। সেই কারণে ঘটনাটিকে বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার ব্যর্থতা এবং প্রতিবিপ্লবী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা অধিক নির্ভুল। এখানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ১৯৭১ সালে জনগণের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং ব্যাপক সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ কোনো নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেনি, কিংবা সমাজের মৌলিক শ্রেনীসম্পর্ক পরিবর্তন করেনি। বরং এর পরবর্তী ক্ষমতাকাঠামোতে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠাকালীন রাষ্ট্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পরিবর্তিত হয় এবং স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হয়।

কর্নেল তাহের: বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন, ক্ষমতার রাজনীতিতে পরাজিত হলেন

কর্নেল আবু তাহের ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মুক্তিযুদ্ধে একটি পা হারিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল প্রচলিত সামরিক ক্ষমতাকাঠামোর পরিবর্তন এবং সৈনিকদের রাজনৈতিক ভূমিকার পুনর্নির্ধারণ। তাহের ও তাঁর অনুসারীদের প্রত্যাশা ছিল, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ তাঁদের প্রত্যাশিত পথে এগোয়নি। জিয়াউর রহমান মুক্ত হলেন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এলেন, অথচ তাহেরের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলো না। বরং অল্প সময়ের মধ্যেই তাহের নিজেই নতুন ক্ষমতাকাঠামোর প্রতিপক্ষ হয়ে উঠলেন। ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই সামরিক আদালতের বিচারের পর তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট তাহেরের বিচারকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন এবং পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত তাঁর মৃত্যুদণ্ডের পেছনে জিয়াউর রহমানের পরিকল্পিত ভূমিকা ছিল বলে পর্যবেক্ষণ দেন।

এখানে ইতিহাসের একটি গভীর বৈপরীত্য রয়েছে। যে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান মুক্ত হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে এলেন, সেই অভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠককে তাঁর শাসনামলেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। তাহেরের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে দ্বিমত থাকতে পারে এবং তাঁর বিপ্লবী কর্মকৌশল নিয়েও সমালোচনা করা যায়। কিন্তু তাঁর বিচার সম্পর্কে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ উপেক্ষা করে ৭ নভেম্বরকে নিঃশর্তভাবে জাতীয় সংহতির বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। বরং ঘটনাটি দেখায়, একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাময়িকভাবে বিভিন্ন শক্তি একত্রিত হলেও তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এক ছিল না। অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর সেই বিরোধ ক্ষমতার সংঘাতে রূপ নেয়। মার্কসীয় বিশ্লেষণের আলোকে এখানে প্রশ্ন ওঠে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য যে শক্তি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, সেই শক্তি যদি রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে তার বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার ভবিষ্যৎ কী হয়? তাহেরের পরিণতি সেই প্রশ্নের একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ।

১৯৭৭ সালের সামরিক মৃত্যুদণ্ড: সংহতির নামে রক্তাক্ত বাস্তবতা

৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিচার করতে গেলে ১৯৭৭ সালের সামরিক বিদ্রোহ এবং তার পরবর্তী মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর বিমানবাহিনীর বিদ্রোহের পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ব্যাপক গ্রেপ্তার, সামরিক বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ মে ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (UPI) বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাসবিষয়ক প্রকাশনার বরাত দিয়ে জানায়, ওই বিদ্রোহের পর ৫৬১ জন বিমানসেনাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডের মোট সংখ্যা নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন সূত্রে পার্থক্য রয়েছে। কিছু সাংবাদিক অনুসন্ধান ও ঐতিহাসিক বিবরণে এক হাজারের বেশি সামরিক সদস্যের মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যায়, আবার কিছু বিবরণে সংখ্যাটি দেড় হাজারের কাছাকাছি বলে দাবি করা হয়েছে। এসব মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া দরকার সঠিক ইতিহাস জানার জন্য।

তবু প্রতিষ্ঠিত তথ্যটুকুই যথেষ্ট উদ্বেগজনক। শত শত সামরিক সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং সামরিক আদালতের বিচারিক স্বচ্ছতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সামরিক বিদ্রোহ দমন করার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু বিদ্রোহ দমন এবং ন্যায়বিচারবিহীন দমননীতি এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কখনো বিচারিক ন্যায্যতার বিকল্প হতে পারে না। এখানেই জাতীয় সংহতির দাবিটি সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। একটি সরকার সামরিক বিদ্রোহ দমন করতে পারে, কিন্তু যে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক বলা হচ্ছে, তার অধীনে বারবার বিদ্রোহ এবং বিপুলসংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কেন ঘটেছিল, সেটি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। সংহতি মানে শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে একজন নেতার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়; সংহতি মানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আস্থা, রাজনৈতিক বৈধতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জিয়াউর রহমানের শাসনামলের সামরিক সংঘাতগুলো দেখায়, এই লক্ষ্যগুলো অন্তত সামরিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে পূর্ণভাবে অর্জিত হয়নি।

যে অভ্যুত্থানে ক্ষমতায় উত্থান, আরেক অভ্যুত্থানে সেই নেতার মৃত্যু

ইতিহাসের আরেকটি বেদনাদায়ক পরিণতি ঘটে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হন। সামরিক অভ্যুত্থানের সেই চেষ্টা সফল হয়নি, কিন্তু রাষ্ট্রপতির জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল, অথচ ছয় বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আরেকটি সামরিক বিদ্রোহ তাঁর জীবন কেড়ে নেয়। এর অর্থ এই নয় যে দুটি অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য, সংগঠক কিংবা রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক ছিল; কিন্তু ঘটনাগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামরিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে। যে নেতৃত্ব জাতীয় সংহতির দাবিদার, তার নিজের শাসনব্যবস্থায় বারবার সামরিক বিদ্রোহ এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর হত্যাকাণ্ড ঘটার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যদি ৭ নভেম্বর সত্যিই জাতীয় সংহতির স্থায়ী ভিত্তি নির্মাণ করে থাকে, তাহলে সেই সংহতি কেন সামরিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংঘাত দূর করতে পারল না? জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বাংলাদেশ সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়নি; ১৯৮২ সালের মার্চে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন এবং আবারও সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

মুক্তিযোদ্ধা জিয়া এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রত্যাবর্তন: ইতিহাসের বৈপরীত্য

জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং বীর উত্তম খেতাব পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে তাঁর এই ভূমিকা ইতিহাসের অংশ, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পরিচয় কোনো ব্যক্তির পরবর্তী সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না। একজন ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে পারেন, অথচ পরবর্তী সময়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর শাসনামলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় এবং ১৯৭৬ সালের পরিবর্তনের ফলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের পথ খুলে যায়। ১৯৭৭ সালে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পরিবর্তন করা হয় এবং ১৯৭৯ সালের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক শাসনামলের সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলোকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের সুযোগ পায়।

এখানে জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে সংগঠনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সেই রাজনৈতিক বাধা অপসারিত হয় এবং জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত নেতারা প্রথমে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগের মতো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হন। পরে দলটি নিজস্ব পরিচয়ে প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসে এবং গোলাম আযমও এই সময়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে প্রশ্ন ধর্মীয় স্বাধীনতার নয়; ধর্ম পালন করা, ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ করা এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতায় ধর্মের ব্যবহার এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী একটি রাজনৈতিক সংগঠনের পুনর্বাসনকে কেবল বহুদলীয় গণতন্ত্রের সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি উপেক্ষিত হয়।

জিয়াউর রহমানের সমর্থকেরা বলেন, তিনি বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন। এই দাবির একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে, কারণ ১৯৭৫ সালের একদলীয় ব্যবস্থার পর তাঁর শাসনামলে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের সুযোগ সম্প্রসারিত হয় এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন এবং স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বাসনকে একই নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতের বৈচিত্র্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী সংগঠনগুলোর অতীত ভূমিকার বিচার, তাদের রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের প্রতি তাদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। একাত্তরে যারা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল, তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে কি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? নাকি ক্ষমতার নতুন ভিত্তি নির্মাণের জন্য একাত্তরের পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে নতুন সমঝোতা গড়ে তোলা হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রকৃত চরিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করে।

সংবিধানের পরিবর্তন: মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রদর্শন থেকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়

১৯৭২ সালের সংবিধান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল তার চার মূলনীতি। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এই আদর্শিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের নীতি যুক্ত করা হয়, সংবিধানের প্রস্তাবনায় ধর্মীয় ভাষ্য সংযোজিত হয় এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে নতুন রাষ্ট্রনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে আনা হয়। এখানে প্রশ্ন ধর্মবিশ্বাসের নয়; বাংলাদেশের মানুষ ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন এবং আছেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা ছিল, শুধু ধর্মীয় পরিচয় একটি জাতির রাজনৈতিক অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাই তার ঐতিহাসিক প্রমাণ।

ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালি জনগণ স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছিল। সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয় এবং সমান মর্যাদার প্রশ্নকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই রাষ্ট্রের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অপসারণ কেবল একটি শব্দ পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয় পুনর্নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই পরিবর্তনের সুবিধাভোগীদের মধ্যে ছিল এমন রাজনৈতিক শক্তি, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল। ফলে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপরিচালনার নীতিকে শুধু প্রশাসনিক সংস্কার কিংবা বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাসের একটি মৌলিক অংশ আড়ালে থেকে যায়।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দায়মুক্তি: ন্যায়বিচার ছাড়া কিসের সংহতি?

জাতীয় ঐক্যের একটি অপরিহার্য শর্ত হলো ন্যায়বিচার। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমদের শাসনামলে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি করা হয়। অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমান প্রথম জারি করেননি, কিন্তু তাঁর শাসনামলে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক শাসনামলের বিভিন্ন ঘোষণা ও আদেশের সঙ্গে এই দায়মুক্তির ব্যবস্থাকেও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হয়। একটি রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পুনর্মিলন ঘটতে পারে এবং অতীতের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ রেখে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতার হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক ভিত্তি পরিবর্তন করে যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাকে জাতীয় ঐক্যের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন। কারণ ঐক্য শুধু ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নয়; ঐক্যের একটি নৈতিক ভিত্তিও থাকতে হয়। ন্যায়বিচার ছাড়া সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

জাতীয় ঐক্য, নাকি ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সমঝোতা?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জাতীয় সংহতি বা National Integration বলতে কেবল বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে একই ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা বোঝায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নাগরিকদের অভিন্ন রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি, প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা, মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা। অন্যদিকে Elite Accommodation বা ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমঝোতা এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠী ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে সহযোগিতায় আসে। এই ধরনের সমঝোতা কখনো স্থিতিশীলতা আনতে পারে, কিন্তু তা সব সময় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে না। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক পুনর্গঠনকে এই দ্বিতীয় ধারণার আলোকে বিশ্লেষণ করা যথেষ্ট যুক্তিসংগত। তাঁর নেতৃত্বে সামরিক প্রশাসন, আমলাতন্ত্র, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশকে নিয়ে নতুন ক্ষমতাকাঠামো গড়ে ওঠে। কিন্তু এই পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক প্রশ্নগুলোর কোনো সর্বজনগ্রাহ্য নিষ্পত্তি হয়নি; বরং রাষ্ট্রের পরিচয়, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং একাত্তরের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন বিরোধের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

অর্থাৎ রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশকে একত্রিত করা হলেও জাতীয় ইতিহাসের মৌলিক প্রশ্নগুলোতে বিভাজন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এই প্রক্রিয়াকে Political Realignment বা রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস বলা যায়, তবে পুনর্বিন্যাস আর জাতীয় ঐক্য এক জিনিস নয়। ৭ নভেম্বরের পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাগুলো এই পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট করে। একদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নতুন রাজনৈতিক জোট গড়ে উঠছিল, অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে বিদ্রোহ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দমন, মুক্তিযোদ্ধা তাহেরের মৃত্যুদণ্ড এবং স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠনগুলোর পুনর্বাসন ঘটছিল। এই ঘটনাগুলোকে পাশাপাশি রাখলে জাতীয় সংহতির দাবিটি আর সরল থাকে না। বরং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং জাতীয় সংহতির মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, সেটিই সামনে আসে।

স্বাধীনতার ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা: তিন অধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনটি বিষয়ের সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস, দ্বিতীয়টি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উত্তরাধিকার এবং তৃতীয়টি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই উত্তরাধিকার রক্ষার রাজনৈতিক সংগ্রাম ও তাকে ঘিরে সংঘাত। এই তিনটির ঐতিহাসিক মর্যাদা এক নয়। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সমগ্র জনগণের জাতীয় অর্জন এবং বঙ্গবন্ধু সেই সংগ্রামের প্রধান রাজনৈতিক নেতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রনায়ক। শেখ হাসিনা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং ১৯৭২ সালের সাংবিধানিক আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ উন্মুক্ত করে এবং পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে সেই বিচার কার্যকর হয়। ২০১০ ও ২০১১ সালের সাংবিধানিক ও বিচারিক পরিবর্তনের ধারায় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিও সংবিধানে পুনঃস্থাপিত হয়, যদিও রাষ্ট্রধর্মের বিধান বহাল থাকে।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, মানবাধিকার, নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর সমালোচনা রয়েছে এবং সেগুলোর মূল্যায়নও ইতিহাসের অংশ। কিন্তু তাঁর সরকারের সমালোচনা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। একইভাবে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর নেতৃত্বের ঐতিহাসিক গুরুত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা করা এক নয়। এই পার্থক্যটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নতুনভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। ২০০১ সালে ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে সংঘাত তীব্র হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচিহ্ন, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক এবং স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে নতুন বিতর্ক ও সংঘাত দেখা যায়। তবে এই তিন সময়ের সব ঘটনা একই প্রকৃতির নয়; প্রতিটি সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সহিংসতার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায় আলাদাভাবে বিচার করা প্রয়োজন।

৭ নভেম্বরের দীর্ঘ ছায়া: ১৯৭৫ থেকে বর্তমান বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন কখনো কখনো কেবল সরকারের পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার সঙ্গে রাষ্ট্রের ইতিহাস, জাতীয় স্মৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক অর্থ নিয়ে সংঘাতও যুক্ত হয়েছে। এখানেই বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ঘিরে বিতর্ক বৃহত্তর ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়, কিন্তু স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃত করা কিংবা একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার রাজনৈতিক জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে আলাদা করা যায় না। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা, ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামীর প্রকাশ্য রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন, ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক অবস্থানের পরিবর্তন এবং সামরিক শাসনের রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণের প্রচেষ্টা একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার ভিত্তি তৈরি করে। এই ধারার সব সমর্থককে স্বাধীনতাবিরোধী বলা যেমন ভুল, তেমনি এর মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বাসনের ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করাও ভুল।

এখানে ব্যক্তি ও সংগঠনের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। একজন সাধারণ বিএনপি সমর্থকের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অবস্থান এবং ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক ভূমিকা এক বিষয় নয়। কিন্তু জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক পুনর্গঠনে স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠনগুলোর পুনঃপ্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও রাষ্ট্রের পরিচয়কে ঘিরে স্থায়ী মতাদর্শিক প্রতিযোগিতা। অবশ্য বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক বিভাজনের জন্য ৭ নভেম্বরকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখাও ইতিহাসসম্মত হবে না। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক সংঘাত, একদলীয় শাসনব্যবস্থা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিরোধ, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সামরিক অভ্যুত্থানগুলোও এই সংকটের অংশ। তবু ৭ নভেম্বর একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণ, কারণ এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যে নেতৃত্ব রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসে, তার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে।

আজকের বাংলাদেশেও সেই প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের ইতিহাস, জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন, বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে যে বিতর্ক ও সংঘাত দেখা যায়, তা শুধু বর্তমান ক্ষমতার প্রতিযোগিতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর ঐতিহাসিক শিকড়ও অনুসন্ধান করতে হয়। তবে ২০২৪ সালের পরের প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনা ১৯৭৫ সালের সরাসরি ফল, এমন দাবি করা যাবে না। বরং বলা যায়, ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে যে আদর্শিক মেরুকরণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, তার বিভিন্ন উপাদান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজও সক্রিয়। এটি একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যাও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে ওঠে।

সাখাওয়াত হোসেনের প্রতি ইতিহাসের প্রশ্ন: কাদের ঐক্য, কিসের সংহতি?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের জাতীয় ঐক্যসংক্রান্ত বক্তব্যকে এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা প্রয়োজন। জিয়াউর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে একত্রিত করেছিলেন, এমন দাবি করা সম্ভব এবং তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগও ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু জাতীয় ঐক্যের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠন দেখালেই চলবে না; দেখতে হবে, সেই পুনর্গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কোন আদর্শ শক্তিশালী হয়েছে, কারা রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে এবং কী ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যদি জিয়াউর রহমান জাতীয় ঐক্যের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর শাসনামলে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক পুনর্বাসনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? কেন ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পরিবর্তন করা হলো এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দায়মুক্তির ব্যবস্থা কেন সাংবিধানিক সুরক্ষা পেল? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে হাইকোর্টের পরবর্তী রায়কে এই ঐক্যের ইতিহাসে কোথায় স্থান দেওয়া হবে? ১৯৭৭ সালের বিমানবাহিনীর বিদ্রোহের পর শত শত সামরিক সদস্যের মৃত্যুদণ্ডকে কীভাবে বিচার করা হবে এবং কেন শেষ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান নিজেই বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের হাতে নিহত হলেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া জাতীয় ঐক্যের দাবি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি জাতির ঐক্য বিচার করতে হলে শুধু দেখতে হয় না কারা ক্ষমতায় এলেন; দেখতে হয়, কারা ক্ষমতার বাইরে চলে গেলেন, কোন আদর্শ রাষ্ট্রের কেন্দ্রে স্থান পেল এবং কোন ঐতিহাসিক মূল্যবোধ প্রান্তিক হয়ে পড়ল। জিয়াউর রহমান রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন কিছু শক্তিকে একত্রিত করেছিলেন, এমন দাবি করা সম্ভব। কিন্তু সেই সমঝোতাকে বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর ঐক্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরও অনেক কঠিন ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। ৭ নভেম্বরের ইতিহাসকে বিচার করার সময় অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শক্তির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এবং পরবর্তী ক্ষমতাকাঠামোর রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিণতি আলাদাভাবে দেখতে হবে। কর্নেল তাহের ও তাঁর অনুসারীরা একটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু সেই রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে যে ক্ষমতাকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়, তার মধ্যে সামরিক কর্তৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক জোট এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পায়।

বিপ্লবের স্লোগান, প্রতিবিপ্লবের পরিণতি: সাত নভেম্বরের প্রকৃত উত্তরাধিকার আসলে কার?

মার্কসীয় তত্ত্বের আলোকে এই ঘটনাপ্রবাহকে একটি অসম্পূর্ণ বিপ্লবী প্রচেষ্টার রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়। তাহেরের বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা সফল হয়নি; বরং সেই অভ্যুত্থানের পর যে ক্ষমতাবিন্যাস প্রতিষ্ঠিত হয়, তা তাঁর প্রত্যাশিত পরিবর্তনের বিপরীত পথে অগ্রসর হয়। এখানে ‘প্রতিবিপ্লব’ ধারণাটি প্রাসঙ্গিক হলেও তা ব্যবহার করতে হবে ঐতিহাসিক নির্ভুলতার সঙ্গে। কারণ ৭ নভেম্বর নিজেই কোনো সফল সামাজিক বিপ্লব ছিল না, ফলে এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে একটি সম্পূর্ণ বিপ্লবের সরাসরি উল্টো যাত্রা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথাযথ নয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি এবং তাহেরের বিপ্লবী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, উভয়ের সঙ্গে পরবর্তী ক্ষমতাকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত ছিল। সেই অর্থে ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে প্রতিবিপ্লবী পুনর্বিন্যাসের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এটি ছিল এমন একটি রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ, যেখানে বিপ্লবী পরিবর্তনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি, অথচ সেই স্বপ্নকে ঘিরে সংঘটিত অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক সুযোগ অন্য শক্তির ক্ষমতা সুসংহত করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। কাজেই প্রশ্ন আসে, সাত’ই নভেম্বরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আসলে কাদের? শেষ পর্যন্ত বিজয়ীপক্ষ কোন ক্যাম্পটির প্রতিনিধিত্ত্ব করেছে? আমাদের ব্যাখ্যায় এবং ঐতিহাসিক প্রমান থেকে আমরা দেখতে পাই, একটি প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থী শক্তির “বিজয়” হয়েছিলো শেষাবধি; বাংলাদেশের ইতিহাসে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রমান করে বাংলাদেশ কীভাবে বিভাজিত হয়েছিলো, এবং এখনো বিভাজনের রক্তাক্ত অধ্যায় চলছে এই দুঃখিনী দেশে।

শেষ কথা: যে সংহতি জাতিকে এক করতে পারেনি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয় এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও কোনো দলের একচেটিয়া উত্তরাধিকার নয়। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সত্য, যার পক্ষে ও বিপক্ষে ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান ছিল। এই পার্থক্য মুছে দিয়ে জাতীয় ঐক্যের ইতিহাস লেখা যায় না। সাত’ই নভেম্বরের ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন, বিপ্লবী সৈনিকেরা ছিলেন, সামরিক ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো ছি্লো; সেইসাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী চরম ডানপন্থী আদর্শের মানুষেরাও ছিলো । এরই ফলাফল আমরা দেখি পরবর্তীতে; এই তথাকথিত “বিপ্লবের” ফলে স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠনগুলোর পুনরুত্থানের পথও তৈরি হয়েছিল। যে রাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠনের সময় একাত্তরের পরাজিত শক্তিগুলো নতুন সুযোগ পেল। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের অনেক রাজনৈতিক আদর্শ ও তার প্রতিনিধিদের অবস্থান নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল। এটি কি সংহতি, নাকি বিভাজনকে ইঙ্গিত করে?

সাত নভেম্বরকে তাই জাতীয় সংহতির চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে নয়, বরং একটি বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা কীভাবে ক্ষমতার সংঘাত, সামরিক দমন এবং আদর্শিক পুনর্বিন্যাসের মধ্যে ব্যর্থ হতে পারে, তার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিচার করা অধিক যুক্তিসংগত। জাতীয় সংহতি কখনো শুধু একজন নেতাকে মুক্ত করা, একটি সামরিক অভ্যুত্থানে বিজয়ী হওয়া কিংবা কয়েকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে একই জোটে নিয়ে আসার নাম নয়। জাতীয় সংহতির জন্য প্রয়োজন ন্যায়বিচার, নাগরিকের সমান মর্যাদা, ইতিহাসের সত্যের স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রের মৌলিক নীতির প্রতি সম্মান। সাত নভেম্বর যদি সত্যিই সংহতির দিন হয়ে থাকে, তাহলে সেই সংহতি কেন নিজের সৈনিকদের জীবন রক্ষা করতে পারল না, কেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি সহনশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে পারল না, আর কেন তার প্রধান ক্ষমতাধর নেতাও শেষ পর্যন্ত সামরিক বিদ্রোহের হাত থেকে রক্ষা পেলেন না? বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং পরবর্তী সময়ে সেই উত্তরাধিকারকে ঘিরে রাজনৈতিক সংগ্রামকে আলাদা করে দেখা যায় না। কিন্তু এই সম্পর্কের মূল্যায়ন করতে হবে ঐতিহাসিক সত্য, সাংবিধানিক নীতি এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ভিত্তিতে।

কার্ল মার্কসের ফরাসি বিপ্লবসংক্রান্ত বিশ্লেষণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র শুধু তার ঘোষিত লক্ষ্য দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করতে হয় তার শ্রেনীগত ভিত্তি, ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এবং ঐতিহাসিক পরিণতি দিয়ে। সাত নভেম্বরের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। ক্ষমতা দখল করা যায়, রাজনৈতিক জোট গঠন করা যায়, কিন্তু ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করে জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সাত নভেম্বরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই জিয়াউর রহমান কীভাবে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেটি নয়; প্রশ্ন হলো, তাঁর ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা কোন দিকে মোড় নিয়েছিল, সেই পরিবর্তনের রাজনৈতিক সুবিধা কারা পেয়েছিল এবং জাতীয় ঐক্যের নামে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ কতটা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সাত নভেম্বরের ইতিহাসে বিপ্লবের স্লোগান ছিল, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব ছিল না; সংহতির দাবি ছিল, কিন্তু তার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল সংঘাতপূর্ণ। আর ক্ষমতার পরিবর্তনের পর স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থানের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয়ের বিতর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে। সাত নভেম্বর তাই শুধু একটি অভ্যুত্থানের ইতিহাস নয়; এটি বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার ব্যর্থতা, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং জাতীয় সংহতির অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস।

না। সাত নভেম্বরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই জিয়াউর রহমান কীভাবে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেটি নয়; প্রশ্ন হলো, তাঁর ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা কোন দিকে মোড় নিয়েছিল, সেই পরিবর্তনের রাজনৈতিক সুবিধা কারা পেয়েছিল এবং জাতীয় ঐক্যের নামে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ কতটা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সাত নভেম্বরের ইতিহাসে বিপ্লবের স্লোগান ছিল, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব ছিল না; সংহতির দাবি ছিল, কিন্তু তার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল সংঘাতপূর্ণ। আর ক্ষমতার পরিবর্তনের পর স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থানের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয়ের বিতর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে। সাত নভেম্বর তাই শুধু একটি অভ্যুত্থানের ইতিহাস নয়; এটি বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার ব্যর্থতা, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং জাতীয় সংহতির অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস।

মতামত: ড. শ্যামল দাস, ভার্জিনিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

নির্বাচিত তথ্যসূত্র

১. Karl Marx (1850), The Class Struggles in France, 1848–1850 — https://www.marxists.org/archive/marx/works/1850/class-struggles-france/

২. Karl Marx (1852), The Eighteenth Brumaire of Louis Bonaparte — https://www.marxists.org/archive/marx/works/1852/18th-brumaire/

৩. Friedrich Engels (1895), Introduction to The Class Struggles in France — https://www.marxists.org/archive/marx/works/1895/03/06.htm

৪. United Press International (24 May 1988), প্রতিবেদন: ১৯৭৭ সালের বিদ্রোহের পর ৫৬১ বিমানসেনার মৃত্যুদণ্ড — https://www.upi.com/amp/Archives/1988/05/24/Bangladesh-says-561-military-men-hanged-after-1977-coup-attempt/5405580449600/

৫. The Daily Star (20 May 2013), কর্নেল তাহেরের বিচার সম্পর্কে হাইকোর্টের রায় — https://www.thedailystar.net/news/col-taher-execution-an-absolute-killing-hc

৬. Islamization by Secular Ruling Parties: The Case of Bangladesh, Cambridge University Press — https://www.cambridge.org/core/journals/politics-and-religion/article/islamization-by-secular-ruling-parties-the-case-of-bangladesh/4EA977E6AC7DAFFFB95876E465E43A7E

 

এই শাখার আরও খবর

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভাঙল এনসিপি নেতারা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  ভাষাসৈনিক ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কুমিল্লার ঐতিহাসিক বাসভবনের সামনে স্থাপিত সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা।…

আওয়ামী লীগের দখলে ঢাকার রাজপথ

ভাস্কর দত্ত : রাজধানীর রাজপথে প্রকাশ্যে মিছিল-সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কখনো ঝটিকা মিছিল, কখনো মশাল মিছিল,…

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা ঘিরে উত্তাল ঢাকা, আওয়ামী লীগ কি তাহলে ফিরছে?

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা…

আদাবর থানার পাশে দুই হাতবোমা বিস্ফোরণ

রাজধানীর ঢাকার আদাবর থানার পাশে দুটি হাতবোমা বা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাত ৯টা ৫ মিনিটের দিকে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি…

নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সদস্যের হাত-পা ভেঙে কেটে দেওয়া হলো রগ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় আবুল কালাম নামে এক পুলিশ সদস্যের ওপর নৃশংস হামলার অভিযোগ উঠেছে। তাঁকে নির্জন বিলে ডেকে…

ঢাকার বারিধারায় বৈশাখী পরিবহনের বাসে আগুন

রাজধানীর বারিধারায় প্রগতি সরণিতে বৈশাখী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে বারিধারার ‘জে’ ব্লক এলাকায় এ ঘটনা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au