আদাবর থানার পাশে দুই হাতবোমা বিস্ফোরণ
রাজধানীর ঢাকার আদাবর থানার পাশে দুটি হাতবোমা বা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাত ৯টা ৫ মিনিটের দিকে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি…
ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই রাজধানী ঢাকায় একই দিনে দুটি বাসে অগ্নিসংযোগ এবং আদাবর থানার পাশে দুটি হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। মোটরসাইকেলে এসে দুর্বৃত্তদের বোমা নিক্ষেপ ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় নগরজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত এসব ঘটনার সঙ্গে দলটির সংশ্লিষ্টতার কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং দলটির নেতাকর্মীদের সম্ভাব্য রাজনৈতিক তৎপরতা ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা আওয়ামী লীগ কি আবারও রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে?
শেখ হাসিনা গত কয়েক মাস ধরেই ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার কথা বলে আসছেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত এক বক্তব্যেও তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়েছেন। বার্তা সংস্থা এপি–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরতে চান। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেছেন। তবে এসব ঝুঁকি তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না বলে জানিয়েছেন।
এর আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা দেশে ফেরার বিষয়ে একই অবস্থান জানান। তিনি বলেছেন, দেশে ফিরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে চান। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি অংশও তাঁর সঙ্গে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন বলে এর আগে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। তবে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, পথ কিংবা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

শেখ হাসিনা ।ছবি : সংগৃহীত
শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে আলোচনা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় নেতাকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, বিবৃতি এবং দেশে ফেরার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে পোস্ট দিতে দেখা যাচ্ছে। তবে এসব তৎপরতা কতটা সাংগঠনিক এবং দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কতটা সমন্বিত, তা স্পষ্ট নয়।
বাড্ডায় বাসে পেট্রল ঢেলে আগুন
শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাড্ডার নতুন বাজার এলাকায় বৈশাখী পরিবহনের একটি বাসে পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বিকেল ৫টা ৪৭ মিনিটের দিকে প্রগতি সরণির কোকাকোলা গেটের বিপরীত পাশে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসটি যাত্রী নামিয়ে ইউটার্ন নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ সময় হেলপার বাস ঘোরাতে চালককে সহায়তা করছিলেন। তখন মোটরসাইকেলে করে আসা এক যুবক বাসটিতে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

ঢাকার বারিধারায় বৈশাখী পরিবহনের বাসে আগুন। ছবিঃ সংগৃহীত
ডিএমপির বাড্ডা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার আল আমিন হোসাইন জানান, বাসে তখন কোনো যাত্রী ছিলেন না। ফলে এ ঘটনায় কেউ হতাহত বা দগ্ধ হননি। ঘটনার পর বাসচালক ও হেলপারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এ অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কারা সরাসরি এ ঘটনায় জড়িত, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটে বাসে আগুন লাগার খবর পায় তারা। পরে বারিধারা ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনের কারণে সড়কের এক পাশে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
সেগুনবাগিচায় পরিত্যক্ত বাসে আগুন, নাশকতা নয় বলছে পুলিশ
একই দিন দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের একটি পরিত্যক্ত বাসেও আগুন লাগে। তবে এ ঘটনাকে নাশকতা হিসেবে দেখছে না পুলিশ।
রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিন মিয়া জানান, বিড়ি বা সিগারেটের আগুন থেকে পরিত্যক্ত বাসটিতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করেও কাউকে আগুন লাগাতে দেখা যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীরাও কাউকে আগুন দিতে দেখেননি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ নয়, বরং দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ড। ফলে একই দিনে রাজধানীতে তিনটি অগ্নি ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও সেগুলোকে একই সূত্রে গাঁথার মতো কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
আদাবর থানার পাশে দুই হাতবোমা বিস্ফোরণ
বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাতের দিকে রাজধানীর আদাবর থানার পাশে দুটি হাতবোমা বা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
শুক্রবার রাত ৯টা ৫ মিনিটের দিকে আদাবর থানার পাশে সেইলর শোরুমের সামনে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি পরপর দুটি হাতবোমা নিক্ষেপ করেন। বিস্ফোরণের পর তাঁরা দ্রুত মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যান।

ককটেল। ফাইল ছবি
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার ফজলুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বিস্ফোরণের ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।
ঘটনার পরপরই আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে কারা এই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে কিংবা এর পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার
এদিকে, রাজধানীতে এসব ঘটনার সময়েই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা। গত ৫ আগস্ট ২০২৪ ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ রয়েছে।
সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘যদি মৃত্যু আমার ভাগ্যে থাকে, তাহলে আমি আমার নিজের দেশের মাটিতে, নিজের মানুষের মধ্যে মরতে চাই। তাই আমি বাংলাদেশে ফিরব। সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়নি।‘
দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন তিনি। তবে এসব সম্ভাবনা তাঁকে দেশে ফেরা থেকে বিরত রাখতে পারবে না বলে জানান।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, দূর থেকে নিজের দেশের মানুষকে কষ্ট পেতে দেখেই তিনি জীবনের বাকি সময় কাটাতে চান না। নিজের জনগণের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন।
এর আগে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি একা নন, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি অংশও ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার কথাও বলেছিলেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সামনে কী সম্ভাবনা?
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে, দলটির বহু নেতা–কর্মী গ্রেপ্তার, মামলা ও আত্মগোপনের মধ্যে রয়েছেন। অনেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
এপি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। শেখ হাসিনা তাঁর সাক্ষাৎকারে দলটির ওপর দমন–পীড়নের অভিযোগ তুলেছেন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছেন। তবে তাঁর এসব অভিযোগের বিপরীতে বর্তমান সরকার বলছে, গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, ৬ নভেম্বর রাজধানীতে বাসে অগ্নিসংযোগ ও থানার পাশে বোমা বিস্ফোরণের মতো ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলে এসে হামলা চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পরিকল্পিত নাশকতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে বাড্ডার বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা থাকলেও আদাবরের বিস্ফোরণের সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সেগুনবাগিচার অগ্নিকাণ্ডকেও পুলিশ দুর্ঘটনা বলে জানিয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au