৭ নভেম্বর: সংহতির আড়ালে বিভাজন
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেনি। সেই সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা, অর্থনৈতিক মুক্তি…
ওটিএন বাংলা ডেস্ক :
ভাষাসৈনিক ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কুমিল্লার ঐতিহাসিক বাসভবনের সামনে স্থাপিত সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। বাড়িটি সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবিতে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাতে এ ঘটনা ঘটে। তবে বাড়িটির উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করা আরমা দত্ত এ ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার নেতারা নগরীর ধর্মসাগর পাড়ে অবস্থিত বাড়িটির সামনে জড়ো হন। সেখানে বাড়িটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য দেন তাঁরা। পরে বাড়ির সামনে ঝোলানো সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন। এ ঘটনার একাধিক ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি সংস্কার, সংরক্ষণ ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। সম্প্রতি বাড়িটির মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড স্থাপন করেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি আরমা দত্ত। তিনি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একমাত্র ছেলে সঞ্জিব দত্তের মেয়ে। সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।’
এনসিপির নেতারা অভিযোগ করেন, বাড়িটি বিক্রির প্রচেষ্টা হিসেবে সেখানে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে এবং পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক বাড়িটি বিক্রি ঠেকাতেই সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব মাসুমুল বারী কাওসার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সাধারণ কোনো স্থাপনা নয়। এটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাই বাড়িটি ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় না করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হবে।
রাত ১০টার দিকে মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, ‘আমরা একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাব। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণ নিয়ে প্রতিহত করা হবে।’
তবে এনসিপির এ কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আরমা দত্ত। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানে। তাই এ বাড়িটির জায়গা আমি কী করব, রাখব না বিক্রি করব, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করব।’
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড কে ভেঙেছে, এ বিষয়ে এখনো কেউ তাঁদের অবহিত করেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে ও তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর নাতনি আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ছিলেন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au