হামলার পর হোলি আর্টিজান বেকারি নামে ঢাকার গুলশান দুই-এর ৭৯ নম্বর সড়কের সেই বাড়িটি।
মেলবোর্ন, ০১ জুলাই— আজ সেই বিভীষিকাময় রাতের ৯ বছর পূর্ণ হলো। ২০১৬ সালের ১ জুলাই শুক্রবার রাজধানীর গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের ‘হলি আর্টিজান বেকারি’তে ঘটে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস ও হৃদয়বিদারক জঙ্গি হামলা। দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা চলা ওই ঘটনায় প্রাণ হারান মোট ২৯ জন। এর মধ্যে ২০ জন জিম্মি (১৭ জন বিদেশি এবং ৩ জন স্থানীয়), দুই পুলিশ সদস্য, পাঁচ জঙ্গি এবং বেকারির দুই কর্মচারী রয়েছেন।
ঘটনার শুরু: এক ভয়াল সন্ধ্যা
১ জুলাই ছিল পবিত্র রমজানের এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যা। গুলশানের অভিজাত রেস্টুরেন্ট ‘হলি আর্টিজান বেকারি’তে তখন দেশি-বিদেশি অতিথিরা রাতের খাবারে ব্যস্ত। হঠাৎ রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে পাঁচজন সশস্ত্র জঙ্গি রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে শুরু করে গুলি বর্ষণ ও জিম্মি নাটক।
রাত ৯টা ৫ মিনিটে গুলশান থানার পুলিশ খবর পায় এবং সাথে সাথেই ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। রাত সোয়া ৯টার দিকে শুরু হয় তীব্র গুলিবিনিময়। বনানী থানার ওসি মো. সালাহউদ্দিন ও ডিবির সহকারী কমিশনার মো. রবিউল ইসলাম গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে হাসপাতালে নেওয়ার পর তারা দুজনই শহীদ হন।
রাতভর জিম্মি সংকট: বিশ্ববাসীর নজর ঢাকায়
এই জিম্মি সংকট রাতভর চলে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রধান শিরোনামে পরিণত হয়। ইসলামিক স্টেট (আইএস) সেই রাতেই হামলার দায় স্বীকার করে। তাদের দাবিমতে, তারা ২০ জনকে হত্যা করেছে এবং হামলাকারীরা ছিল আইএস-এর ‘সৈনিক’।
অপারেশন থান্ডার বোল্ট: ভয়াবহ রাতের অবসান
২ জুলাই সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো দল শুরু করে ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’। অভিযান চলে মাত্র ১২ মিনিট। সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে অভিযানের মাধ্যমে রেস্টুরেন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয় বাহিনী।
অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। তারা হলেন- রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামীহ মোবাশ্বীর, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল।

নিহত পাঁচ জঙ্গি।
রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জনকে, যাদের মধ্যে ছিলেন নারী ও শিশু। তবে এর আগেই হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২০ জন নিরীহ মানুষ, যাদের মধ্যে ৯ জন ছিলেন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয়, দুইজন বাংলাদেশি এবং একজন মার্কিন-বাংলাদেশি নাগরিক।
বিচার ও রায়: দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া
হামলার পর গুলশান থানায় মামলা দায়ের করে পুলিশ। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটকে। চার বছরের তদন্ত শেষে ২০১৮ সালে আটজনকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হয়।
২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। তবে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্ট রায় পরিবর্তন করে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।
এই সাত আসামি হলেন: রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশিদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ
হলি আর্টিজান এখন স্মৃতিচিহ্ন
হামলার দুই বছর পর ওই ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। পরে সেখানে নির্মাণ করা হয় একটি স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতিবছর ১ জুলাই সরকার, বিদেশি দূতাবাস এবং নিহতদের স্বজনেরা শ্রদ্ধা জানান সেখানে। এই দিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও, স্মরণ করেন শহীদ সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও ওসি সালাহউদ্দিনকে।
হামলার পর নিরাপত্তায় আমূল পরিবর্তন
এই হামলা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের চিত্র পাল্টে দেয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আরও কার্যকর হয়ে ওঠে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট শক্তিশালী হয়। সারাদেশে চালানো হয় শতাধিক জঙ্গিবিরোধী অভিযান, যেখানে ৮০ জনের বেশি নিহত হয় এবং ৩০০-এর বেশি সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার হয়।
হলি আর্টিজানের সেই ভয়াল রাত আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। সেই রাত শুধু নিহতদের পরিবারের নয়, পুরো জাতির হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে। তবে এই ঘটনার পর দেশ জঙ্গিবাদবিরোধী লড়াইয়ে যে অবস্থান নিয়েছে, তা দৃঢ় ও সহিষ্ণু বাংলাদেশের পরিচায়ক।