বাংলাদেশে সম্প্রতি বারবার সংঘটিত হচ্ছে ভয়াবহ ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির মতো আইনবহির্ভূত হামলার ঘটনা। প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের অভিযোগ উঠছে বারবার, অথচ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। মাত্র একদিনের ব্যবধানে দেশের দুই প্রান্তে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা এই প্রবণতার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে।
লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বুধবার রাতে প্রায় দুই শতাধিক লোক থানায় হামলা চালিয়ে সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেয়; এ ঘটনায় থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন।
অন্যদিকে কুমিল্লার মুরাদনগরে বৃহস্পতিবার সকালে মাদক ব্যবসার অভিযোগ তুলে এক নারী ও তার দুই সন্তানকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয় জনতা; আহত হন পরিবারের আরেক সদস্য।
এই দুটি ঘটনাই দেশের ক্রমবর্ধমান ‘মব কালচার’-এর প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এবং প্রশাসন এখনো এর কার্যকর প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি।
থানায় হামলা চালিয়ে আসামি ছিনতাই
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় বুধবার রাতে এমনই এক নজিরবিহীন ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ছিনিয়ে নিতে থানায় হামলা চালিয়েছে শতাধিক দুর্বৃত্ত। এ সময় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ অন্তত ২০ জন আহত হন, যাদের মধ্যে দুই পুলিশ সদস্যের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রায় ২০০–২৫০ জন একযোগে থানা চত্বরে ঢুকে চেয়ার-টেবিল, কম্পিউটার ও নথিপত্র তছনছ করে, ইট-পাটকেল ছুড়ে জানালার কাঁচ ও দরজা ভাঙচুর করে। পুলিশের বাধা দেওয়ায় সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশ টিয়ারশেল ছোড়ে, কিন্তু তাতেও উত্তেজনা বেড়ে যায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ, সেনা ও বিজিবি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, “দুর্বৃত্তরা হাজতখানার চাবি ছিনিয়ে নিয়ে বেলাল হোসেন ও সোহেল রানা চপল নামে দুই আসামিকে বের করে নিয়ে যায়।” পুলিশ জানিয়েছে, তারা স্থানীয় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা এবং তাদের ছাড়াতেই হামলা চালানো হয়েছে। তবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিউর রহমান সোহেল এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা জড়িত নই, প্রশাসন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিএনপিকে জড়াচ্ছে।”
এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মাদক ব্যবসার অভিযোগে নারী ও সন্তানদের গণপিটুনিতে হত্যা
এদিকে কুমিল্লার মুরাদনগরের কড়ইবাড়ি গ্রামে বৃহস্পতিবার সকালে মাদক ব্যবসার অভিযোগ তুলে এক নারী ও তাঁর দুই সন্তানকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করেছে স্থানীয় লোকজন। নিহতরা হলেন রোকসানা আক্তার (৫৩), ছেলে রাসেল মিয়া (৩৫) ও মেয়ে জোনাকি আক্তার (২৫)। গুরুতর আহত হয়েছেন রোকসানার আরেক মেয়ে রুমা আক্তার (৩০)।
পুলিশ জানায়, নিহত পরিবারটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার অভিযোগ ছিল। এ নিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে বিরোধ চলছিল। বৃহস্পতিবার সকালে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে।
বাঙ্গরা বাজার থানার ওসি মাহফুজুর রহমান বলেন, “খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে একসঙ্গে তিনটি মরদেহ পাই। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে।”
গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ হামলা বেড়ে যাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বৃহস্পতিবার(২৬ জুন) এক আলোচনায় বলেন, “আগের আমলে সাংবাদিকদের ব্যর্থতার কারণেই মব তৈরি হচ্ছে। আমি এটাকে মব বলব না, এটা এক ধরনের প্রেশার গ্রুপ।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “আগে দাস সাংবাদিকতা করে সাংবাদিকরা লাভবান হয়েছেন, কিন্তু এখন সরকারের সাফল্য উপেক্ষা করে লেজি জার্নালিজম হচ্ছে। তবে মিস ইনফরমেশন ও ডিস ইনফরমেশন আমরা সিরিয়াসলি দেখছি।”
আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসন ও রাজনৈতিক শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় এই ধরনের সংঘবদ্ধ হামলা ও বিচারবহির্ভূত ‘শাস্তির সংস্কৃতি’ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। আবার ভিন্নমত ও বিরোধীদের ওপরও হামলা চালানোর ঘটনা ঘটছে। তারা মনে করছেন, এ প্রবণতা রোধে কেবল কথাবার্তা নয়, দ্রুত ও কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তথ্যসুত্রঃ ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো।