গত ২ এপ্রিল ট্রাম্প বিশ্বের একাধিক দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেন। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ৮ জুলাই-
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকি উসকে দিয়েছেন। সোমবার (৭ জুলাই) তিনি বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের পণ্যের ওপর ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে একসঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগস্টের মধ্যে চুক্তিতে পৌঁছানোর যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা একেবারে চূড়ান্ত নয়—দর-কষাকষির সুযোগ এখনও রয়েছে।
ট্রাম্পের ঘোষণায় বলা হয়েছে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক বসানো হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পণ্যে ৩৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার পণ্যে ৩২ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডের পণ্যে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। এই তালিকায় মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, লাওস, কম্বোডিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের নামও রয়েছে।
ট্রাম্প সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে নৈশভোজের সময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আমি বলব, সময়সীমা ঠিক আছে, তবে একেবারে শতভাগ নয়।’’ এর অর্থ, আগামী ১ আগস্ট পর্যন্ত চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিলেও, যদি কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে পারে, তাহলে নতুন প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
এর আগে, চলতি বছরের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’ ঘোষণা করে ট্রাম্প বিশ্ববাজারে উত্তেজনা ছড়ান। তখন বিভিন্ন দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়, যা পরবর্তীতে বাজারের অস্থিরতায় ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল। সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল আগামীকাল বুধবার, কিন্তু ট্রাম্প নতুন এক নির্বাহী আদেশে সেটি ১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়িয়েছেন।
ট্রাম্পের নিজের সামাজিকমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ পোস্ট করা চিঠি অনুযায়ী, এবার বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশের জন্য শুল্কের হার ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত রাখা হয়েছে। তবে লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো কিছু দেশের জন্য কিছুটা কম হারে শুল্ক ধার্য করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই শুল্ক আরোপের হুমকি মূলত চাপ সৃষ্টির কৌশল। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েন্ডি কাটলার বলেছেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার দেশগুলোর প্রতিও এ ধরনের বার্তা দেওয়া ‘অন্যদের জন্যও সতর্কবার্তা’ হিসেবে কাজ করবে।
এদিকে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা জানিয়েছেন, কোন কোন দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে, তা একান্তই প্রেসিডেন্টের এখতিয়ার। ট্রাম্প প্রশাসন ‘৯০ দিনে ৯০টি চুক্তি’ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত শুধু যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনামের সঙ্গে দুটি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে এবং চীনের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক কিছুটা কমানোর বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তবে ততক্ষণে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের শুল্ক নীতি আসলে তার দীর্ঘদিনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অর্থনৈতিক দর্শনেরই অংশ, যার মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করা এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন দেশের ওপর একতরফা শুল্ক আরোপের মাধ্যমে তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও অনুকূল চুক্তিতে আসতে চাপ দিতে শুরু করেন।
বিশেষ করে ২০১৮–২০১৯ সালে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের সময় এই নীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যখন উভয় দেশ একে অপরের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে বৈশ্বিক বাজারকে অস্থির করে তোলে। একইভাবে, ইউরোপ, মেক্সিকো, কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ওপরও ট্রাম্প শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে বা কার্যকর করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন।
এবারের প্রেক্ষাপটেও দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের ওপর ২৫–৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারিত হলেও দর–কষাকষির সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ তিনি একদিকে শুল্কের হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে দরজা খোলা রাখছেন যাতে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও সুবিধাজনক প্রস্তাব নিয়ে আসে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মূলত রাজনৈতিক কৌশল; ট্রাম্প শুল্ক বাড়ানোর ভয় দেখিয়ে মার্কিন জনগণের কাছে নিজের অবস্থান দৃঢ় করছেন এবং একসঙ্গে বিদেশি সরকারগুলোর সঙ্গে আলোচনায় শক্ত অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা বিশেষ করে উন্নয়নশীল রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।
সুত্রঃ এএফপি