মতামত

স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে ক্ষোভ মানেই সম্পর্কের ইতি নয়

  • 11:04 am - July 15, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৮৬ বার
প্রোভেন্সে স্বপ্নময় পালানোর অনুপ্রেরণা...ফ্রান্সে বিয়ের গন্তব্য স্বপ্ন দেখানো যুগল। ছবি – Parekh Cards | CC BY-SA 2.0

মেলবোর্ন ১৫ জুলাই – ইভন* প্রথমবার তাঁর বর্তমান স্বামীর সঙ্গে পরিচিত হন সিডনির এক গ্রীষ্মের রাতে, একটি নাইটক্লাবের ভেজা নাচের মেঝেতে। তখন দু’জনেরই বয়স ২৩। প্রথম দেখাতেই ইভন অনুভব করেছিলেন, যেন বহুদিন ধরে চেনা মানুষ।

তারা প্রেমে পড়লেন, বিয়ে করলেন। প্রথম কন্যাসন্তান জন্মের পর ইভন পূর্ণকালীন হিসাবরক্ষকের চাকরি ছেড়ে মেয়ের যত্ন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেখান থেকেই স্বামীর প্রতি তাঁর ক্ষোভের বীজ বোনা শুরু।

Regiane এবং Anderson, ছবি তুলেছেন Luciano Meirelles- লাইসেন্স: CC BY-SA 2.0

ইভন বলেন, “আমি এক বছর ছুটি নিয়েছিলাম আমার পরিবারে সময় দেওয়ার জন্য। আর ও নিজের জীবন আগের মতোই চালিয়ে যাচ্ছিল। গলফ, স্কোয়াশ, শুক্রবার রাতে বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপান – সবই চলছিল। আর আমি একা একা বাড়িতে দিন কাটাচ্ছি।”

দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম আরও চাপ বাড়িয়ে দিল। তৃতীয় সন্তানের পর ইভন বারবার চেষ্টা করতেন স্বামীর সঙ্গে মানসিক বোঝাপড়া ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টি তুলতে। কিন্তু সবসময় তর্কে গড়াতো।

তিনি বলছিলেন, “ও ভাবত, শুধু ডায়াপার বদলানো আর রাতে বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানো মানেই অনেক সাহায্য করছে। কিন্তু এর বাইরেও তো অনেক কিছু আছে – রাতের খাবার কী হবে, ব্যাগ গোছানো, সপ্তাহান্তে কী করব – সবকিছুর দায় আমার।”

“মানসিক বোঝাপড়া মানে একসঙ্গে তিনটি ছোট মানুষের, নিজের এবং কখনো স্বামীর দায়িত্বও মাথায় রাখা।”

ইভন এবং তার স্বামী বছরের পর বছর ধরে, টক থেরাপির সাহায্য নিয়েছেন। পাশাপাশি মানসিক চাপ ভাগাভাগি করার কৌশল এবং পদ্ধতিগুলি চেষ্টা করেছেন সম্পর্ক পুনর্গঠনের। তবুও ইভন লক্ষ্য করতেন, স্বামী সাময়িকভাবে উদ্যমী হয়ে সব সামলাতেন, আবার কিছুদিন পর আগের অবস্থায় ফিরে যেতেন।

চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো 

গত বছর একটি ঘটনা সবকিছুর মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

ইভন বলেন, “আমার স্বামী মেয়েকে চড় মেরেছিল। অথচ আমরা দু’জন সবসময় ঠিক করেছিলাম শারীরিক শাস্তি দেব না। সেই ঘটনা আমাকে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়।”

তারা চেষ্টা করেছিলেন সম্পর্ক মেরামতের। কিন্তু ইভন স্পষ্ট করে জানালেন, “আমি বদলেছি। আর তুমিও অনেক বদলে গেছো। আমাদের আলাদা হওয়া প্রয়োজন।”

তারা ‘বার্ড নেস্টিং’ পদ্ধতি শুরু করলেন – যেখানে বাচ্চারা একই বাড়িতে থাকে আর বাবা-মা পালাক্রমে তাদের দেখাশোনা করেন। তবুও ক্ষোভ রয়ে গেল।

যেখানে অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায়, ইভন ও তাঁর স্বামীর ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি।

ক্ষোভ থেকে ফেরার উপায়

যৌনতা ও সম্পর্ক বিষয়ক থেরাপিস্ট টোয়া রিচ্চি বলেন, “ক্ষোভ খুবই জটিল। অনেক সময় একই আঘাত বারবার লাগতে লাগতে সম্পর্ক ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী হয়তো সামান্য ডিসওয়াসার খালি করা নিয়ে ঝগড়া করছে, কিন্তু আসলে লড়াইটা অন্য জায়গায়, গভীর এক অভাববোধ নিয়ে।”

রিচ্চি মনে করেন, সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য দু’জনের ইচ্ছা এবং বোঝাপড়া অপরিহার্য। “সবকিছু নির্ভর করে আমাদের নিরাপত্তার বোধের ওপর। দু’জনেরই জানা দরকার, কীভাবে তারা নিরাপদ বোধ করবে।”

তিনি বলেন, “আমি প্রথমেই জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনি কেন এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চান?’ প্রায়ই উত্তর হয়, ‘কারণ আমরা এখনো একে অপরকে ভালোবাসি, আমরা চেষ্টা করতে চাই।’”

দীর্ঘ সম্পর্কের একটি সমস্যা হলো, একে অপরের প্রতি কৌতূহল হারিয়ে ফেলা। “আপনাকে সবসময় সঙ্গীর প্রতি কৌতূহলী থাকতে হবে। ভাবা উচিত নয় যে তাঁকে পুরোপুরি জেনে ফেলেছেন,” বলেন রিচ্চি।

অনেকে মনে করেন, ক্ষোভ মানেই সম্পর্কের মৃত্যু। কিন্তু রিচ্চির মতে, এটি এতটা সরল নয়। “অনেকেই আগে ভাবতেন, এমন হলে আমি সহ্য করব না। কিন্তু তারাও আবার ফিরে এসেছেন।”

সম্পর্কের মৃত্যু ও পুনর্জন্ম

আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ইভন স্বামীর সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু স্বামী বিয়েবিচ্ছেদে রাজি হননি।

ইভন বলেন, “আমি খুব একা বোধ করছিলাম। বললাম, আমাদের কাউকে দরকার যে এই পর্যায় সামলাতে সাহায্য করবে।”

তারা এক কোচ খুঁজে পান, যিনি বলেছিলেন, “তোমাদের এই সম্পর্কটিকে ‘মৃত’ ঘোষণা করতে হবে। আগের সম্পর্ক আর নেই।”

তারা তখন আলাদা বাড়িতে থাকতেন, মাসের পর মাস তেমন কোনো কথাও বলতেন না। এই সময়ে ইভন নিজের ভেতরের শক্তি খুঁজে পান।

“আমি যেন খোসা হয়ে গিয়েছিলাম। নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করা খুব শক্তি জুগিয়েছিল,” বলেন ইভন।

তাঁর স্বামীও এই বিরতিতে ইতিবাচক বদল আনেন। ইভন লক্ষ্য করেন, বাড়ি এখন পরিচ্ছন্ন থাকে। তিনি আবার ডেটের জন্য ফোনের কাছে অপেক্ষা করেন।

দম্পতি | ছবি – Wyatt Fisher -www.drwyattfisher.com/products/couples-retreat-california
লাইসেন্স: CC BY-SA 2.0

ছয় মাস পর মুখোমুখি 

ইভন বলছিলেন, “আমি প্রস্তুত ছিলাম ডিভোর্সের জন্য। কিন্তু ও বলল, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি। থাকতে চাই। তবে যদি তুমি সুখী না হও, আমি সরে যাব।’ আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, না, না, না – এটাই আমি চাই না।”

তারা আবার একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। ইভন প্রথমে নিজেকে ‘প্রতারক’ ভাবছিলেন। কোচ বলেছিলেন, “এটাই সম্পর্কের মৃত্যু। আর এখান থেকেই নতুন যাত্রা।”

এখনও ক্ষোভ রয়ে গেছে। তবে ইভন বলছেন, “এখন ও আমাকে শোনে। আগে সমস্যা শুনে নিজে সমাধান দিত। এখন বলে, ‘ঠিক আছে, তুমি বিপর্যস্ত বোধ করছ।’ সেই স্বীকৃতি খুব বড়।”

তারা আবার সাত মাস ধরে একসাথে আছেন। সম্পর্ক বাঁচলেও, ‘নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা’ চালিয়ে যেতে হবে বলে জানালেন ইভন।

“আমরা সবসময় কাজ করে যাচ্ছি। তবে এটিই সুন্দর – আমাদের মেয়েদের শেখাচ্ছি, কীভাবে সম্পর্ক মেরামত করতে হয়। আশা করি, আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর ও মজবুত হবে।”

বাংলা অনুবাদ – প্রদীপ রায়, ওটিএন বাংলা

এই শাখার আরও খবর

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বাউবির দরজা সবসময় খোলা: উপাচার্য

মেলবোর্ন,০৬জুন-তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা…

৫ জুলাই তৃতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন আমির খান, পাত্রী কে?

মেলবোর্ন, ৫ জুন- বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা আমির খান আগামী ৫ জুলাই তৃতীয়বারের মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের সঙ্গী গৌরী স্প্র্যাটের সঙ্গে ঘরোয়া আয়োজনের মধ্য…

জলবায়ু যুদ্ধে বাংলাদেশ: সুন্দরবন থেকে নিঝুম দ্বীপ পর্যন্ত সংগ্রাম ও বিশ্ব প্রেক্ষাপট

মেলবোর্ন, ২ জুন- একুশ শতকের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এখন আর সীমান্তে হয় না। এই যুদ্ধ হয় প্রকৃতির সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে, বেঁচে থাকার জন্য। বিজ্ঞানীরা একে…

গণভবন থেকে গাজিয়াবাদ- শেষ হয়নি যাত্রা

মেলবোর্ন, ৪ জুন- বাংলাদেশ ২০০৯-২০২৪ সময়ে উন্নয়নের ধারায় ছিল। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শতভাগ বিদ্যুৎ- এগুলো জাতীয় অর্জন। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪ সংবিধানিক…

যেখানে বিভেদ টানে: আমরা কোন বাংলাদেশ চাই?

মেলবোর্ন, ৩ জুন- মৃত্যুকে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিরপেক্ষ শক্তি মানি। সে রাজা দেখে না, ফকির দেখে না। ক্ষমতার চেয়ার দেখে না, মাটির ঘর দেখে না।…

অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ বাড়ছে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের, পরিবর্তন এসেছে আবেদন ও ভর্তি প্রক্রিয়ায়

মেলবোর্ন, ২ জুন- অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক মানের ডিগ্রি, পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ এবং উন্নত জীবনযাত্রার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au