মতামত

গোপালগঞ্জের রক্তাক্ত বুধবার: এই দেশ কি মানুষের?

  • 12:36 pm - July 17, 2025
  • পঠিত হয়েছে:২০৮ বার
সাঁজোয়া যান নিয়ে গোপালগঞ্জ এলাকায় টহল দেয় সেনা সদস্যরা। ছবি: এএফপি

গতকাল বুধবার গোপালগঞ্জ শহরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশে যে সংঘর্ষ উড়িয়ে পড়লে, তা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। গোপালগঞ্জের মানুষের রাত্রি কেটেছে আশঙ্কায় ক্ষোভ- দুঃখে। এখন পর্যন্ত চারজন নিহত হয়েছেন, অনেকে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এই মৃত্যুগুলোর ভেতরেও উঠে এসেছে স্বজনহারানোর হৃদয়বিদারক আর্তনাদ। 

নিহত রমজানের পিতা কামরুল কাজী সংবাদমাধ্যমের কাছে অসহায় কণ্ঠে বললেন, “আমার ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি ন্যায়বিচার চাই। একজন পিতা হিসেবে তরুণ ছেলের মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না।”

নিহত দীপ্তর পরিবার জানিয়েছেন, দুপুরে খাবার শেষে দোকানে যাচ্ছিল ছেলেটি, চৌরঙ্গি এলাকায় তাকে গুলি করা হয়। দোকানপাটের ব্যবসায়ী, রাজনীতির কোনো সম্পৃক্ততা নেই—কেবল রোজগারের তাগিদে বের হয়েছিল।

একজন মুদি দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “সরাসরি দেখেছি, যখন ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে গুলি চালানো হয়, তখন দুজন রাস্তার উপর পড়ে যান। ওরা কোনো রাজনীতির লোক না। ওরা এই এলাকারই ব্যবসায়ী।”

এই মৃত্যু, এই হতাহত নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়। এই পরিবারগুলোর চোখে এখন একটিই প্রত্যাশা—ন্যায়বিচার।

গতকাল গোপালগঞ্জ পৌর মাঠে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সারা দেশব্যাপী পদযাত্রার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল পথসভা। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে ‘পদযাত্রা’ বলা হলেও, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা একে “মার্চ টু গোপালগঞ্জ” হিসেবে প্রচার চালান। এনসিপি নেতাদের ফেসবুক পোস্ট সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে কয়েক দিন যাবতই নানান গুজব ছড়িয়ে পড়ে, বলা হতে থাকে এনসিপি বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ ভেঙে ফেলতে আসছে। এই খবরে স্থানীয় জনতার মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগপন্থী বিভিন্ন সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

এনসিপির নেতারা গোপালগঞ্জে পৌঁছানোর আগেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়, বিক্ষুব্ধ জনতা সমাবেশস্থলের চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী প্রহরায় এনসিপি নেতাদের প্রবেশ করানো হয়। বক্তব্য পর্বেও উত্তেজনা থামেনি। নেতাদের উসকানিমূলক কথাবার্তার মধ্যে এক পর্যায়ে হাসনাত আবদুল্লাহ “মুজিববাদ মুর্দাবাদ” স্লোগান দিলে জনতার ক্ষোভ আগুনের শিখার মতো ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দেন নাহিদ ইসলাম, দ্রুত গ্রেফতার দাবি করছেন তিনি। 

এই ঘটনার পরপরই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একে “সম্পূর্ণ অমার্জনীয়” বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং দোষীদের শাস্তির অঙ্গীকার করেছে। অপরদিকে, এনসিপি নেতারা সোজাসাপ্টা আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোকে দায়ী করেছেন।

এতদিনে এই দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন ইতিহাসের বিভাজন, গুজব আর অর্ধসত্যের পিঠে ভর করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। 

অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কেন সেনাবাহিনী, যা দেশের স্বাধীনতার একটি প্রতীক, তাদের আচরণে পেশাদারিত্ব দেখাতে ব্যর্থ হলো? বিভিন্ন ভিডিওতে যেভাবে গুলি ও অশোভন আচরণ ধরা পড়েছে, তাতে মানুষের মনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে—এ সেনাবাহিনী কি সত্যিই আমাদের? অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই কি সেই বাহিনী, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিল?

একজন Facebook পোস্টে লিখেছেন,

গোপালগঞ্জে ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাতের মতো নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। ৫৪ বছর পর আরেকটি কালরাত্রি। 

আরেকজন লিখেছেন,

সেনাবাহিনী তুমি  এনসিপি নেতাদের বাঁচাতে গিয়ে নিষ্পাপ মানুষের উপর গুলি চালালে, অনেক মায়ের বুক খালি করলে! তোমাদের দায়িত্ব কি সেটা এখনো বোধগম্য নয়?

কেউ আবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিড়াল বাহিনী বলে গালিগালাজ করছেন!

আর একজন বলেছেন,

এই সেনাবাহিনী  শেখ হাসিনা সরকারকে  রক্ষা করতে এর ছিটেফোঁটা ও করেনি। 

৫৪ বছর পর আরেকটি কালরাত্রি”—এই মন্তব্যটি সরাসরি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের “অপারেশন সার্চলাইট”-এর স্মৃতি উসকে দেয়, যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিল। এই ধরনের তুলনা শুধু আবেগ নয়, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রতি ভয়, ক্ষোভ এবং আস্থাহীনতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এটি বোঝায়, জনগণ এখন তাদের নিজের দেশের সেনাবাহিনীকেও ১৯৭১-এর দখলদার বাহিনীর মতো আচরণ করতে দেখছে—যা ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া ও দীর্ঘস্থায়ী বিশ্বাসের সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

সেনাবাহিনী তুমি এনসিপি নেতাদের বাঁচাতে গিয়ে নিষ্পাপ মানুষের উপর গুলি চালালে”—এই মন্তব্য পরিষ্কারভাবে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এখানে বলা হচ্ছে,  সেনাবাহিনী একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে রক্ষা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের উপর গুলি চালিয়েছে। এই মন্তব্য রাষ্ট্রের সংবিধানিক কাঠামো এবং  সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠিত নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ধারণাকে সরাসরি আঘাত করে।

 আমাদের সংবিধান ও রাষ্ট্রের মূল চেতনাই হলো জনগণের নিরাপত্তা। রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গন, সেনা, পুলিশ, প্রশাসন—সবাইকে সেই চেতনায় শপথবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু গতকালের ঘটনায় মানুষের আস্থা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী বহু বছর ধরে জাতিসংঘ মিশনে কাজ করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। দেশের ভেতরে সেনাবাহিনীর যদি এমন আচরণ হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর প্রভাব পড়তে পারে—বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

যাহোক এই মৃত্যুর হিসাব কোনো দলের পাল্লায় তোলার বিষয় নয়। এগুলো কোনো স্লোগানেরও নয়। এগুলো মানুষের জীবন—যা আর ফিরবে না। এখন প্রয়োজন, নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন, এই দেশে রাজনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণে স্বচ্ছতা। এই ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিরা যে-ই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।

জাতির কাছে আজ উত্তর চাওয়ার সময়। এই দেশ কি মানুষের? নাকি ক্ষমতার? সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে, উত্তর দিতে হবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে, উত্তর দিতে হবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সকল সদস্যদের। 

সম্পাদক, প্রদীপ রায়

এই শাখার আরও খবর

বিজয়া দশমীতে সিঁদুরের রঙে আনন্দ, দেবী বিদায়ে বিষাদ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  ছয় দিনের পূজা-অর্চনা শেষে বিদায়ের পালা দেবী দুর্গার। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন, দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জনের মধ্য…

‘পাপের লাশ দেশে আসুক চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন বিএনপির এমপি

সৌদি আরবে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিরোধিতা করে ‘পাপের লাশ দেশে আসুক চাই না’ মন্তব্য করেছিলেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের…

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কি ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে?

সামরিক কৌশল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে একসঙ্গে চাপে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত, আঞ্চলিক মিত্রদের…

মাগুরায় যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ

মাগুরা পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সাকের হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর ৬টার দিকে মাগুরা বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টার…

ভক্তি, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মহিমায় সিডনিতে দর্পণের শারদীয় দুর্গোৎসব

শতদল তালুকদার, সিডনি- শরতের স্নিগ্ধ আবহ, দেবীবন্দনার পবিত্র অনুরণন আর বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের আবাহনে সিডনিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। দর্পণ কালচারাল অ্যান্ড রিলিজিয়াস…

কুমিল্লাজুড়ে মাদকের ভয়াবহ থাবা, ২০০ হটস্পটে চলে বেচাকেনা

কুমিল্লার সীমান্ত দিয়ে দেদারছে ঢুকছে মাদক। পরে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। জেলার ১৮টি থানায় অন্তত ২০০টি হটস্পটে চলছে মাদক কেনাবেচা। সীমান্তের অর্ধশতাধিক পথ ব্যবহৃত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au