পুরো গোপালগঞ্জ জেলায় এক ভয়াবহ আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ জুলাই-
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঘোষিত ‘লং মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের জেরে পুরো গোপালগঞ্জ জেলায় এক ভয়াবহ আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১৬ জুলাই বুধবার অনুষ্ঠিত সমাবেশে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন প্রথমে ১৪৪ ধারা এবং পরে পুরো জেলায় কারফিউ জারি করে। এরপর থেকে প্রতিদিন পরিস্থিতির ভিত্তিতে কখনো কারফিউ শিথিল করা হচ্ছে, আবার কখনো তা কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।
শনিবার (১৯ জুলাই) রাত ৮টা থেকে পরদিন রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আবারও নতুন করে কারফিউ ঘোষণা করা হয়। তিন দিন ধরে চলা কারফিউয়ের কারণে জনজীবন পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। শহরের দোকানপাট বন্ধ, ব্যাংকিং সেবা স্থগিত, যানবাহনের চলাচল সীমিত এবং আতঙ্কে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ কাজকর্ম বন্ধ রেখে পরিবার নিয়ে শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে যাচ্ছেন।
কারফিউ শিথিল হলে স্বল্প সময়ের জন্য মানুষ বাজারে বের হলেও আতঙ্ক পুরোপুরি কাটছে না। যারা বের হচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই পুলিশ বা যৌথ বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ছেন। রাস্তায় সেনা, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং কোস্টগার্ডসহ যৌথ বাহিনীর টহল দিনরাত অব্যাহত রয়েছে। জেলার বিভিন্ন প্রবেশদ্বার, হাটবাজার এবং আবাসিক এলাকায় বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। তল্লাশি ও নজরদারি চলছে সর্বোচ্চ সতর্কতায়।
জেলার বিভিন্ন বাজারে সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পরিবহন বন্ধ থাকায় পাইকারি পণ্যের জোগান আসছে না, ফলে দাম বাড়ছে। অধিকাংশ ব্যাংক, এটিএম বুথও বন্ধ থাকায় অর্থ লেনদেন থমকে গেছে। এতে সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছেন। বহু পরিবার টাকা পাঠাতে পারছেন না, অনেকে আবার চিকিৎসা বা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেও অর্থ জোগাড় করতে পারছেন না।
এর মধ্যেই প্রতিদিন বাড়ছে গ্রেফতারের সংখ্যা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সহিংসতার ঘটনায় অন্তত চারটি মামলা করা হয়েছে এবং এতে প্রায় তিন হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৩০৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বাড়ি থেকে, রাস্তায়, এমনকি বাজার থেকেও লোকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক পরিবার জানিয়েছে, নিরপরাধ সদস্যদেরও তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং ছাড়িয়ে আনতে ঘুষ দিতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, রাতে কারও দরজায় কড়া নাড়লেই মনে হচ্ছে পুলিশ এসেছে। সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ, চাকরিজীবীরা কাজে যেতে পারছেন না। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেক পরিবারে উপার্জনক্ষম সদস্য গ্রেফতার হওয়ায় খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে ১৬ জুলাই এনসিপির ঘোষিত ‘লং মার্চ’ ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে। গোপালগঞ্জে ঢোকার আগেই এনসিপি নেতা ও কর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় বাধা এবং হামলার শিকার হন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ সমাবেশ প্রতিহতের ঘোষণা দেয়। শহরে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে সমাবেশের দিন এনসিপির নেতারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বক্তব্য দেন, যেটিকে ‘অপমানজনক’ বলে মনে করে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। গোপালগঞ্জ সদর এবং আশপাশের এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মোট ৫ জন নিহত হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি করে, পরে কারফিউ আরোপ করে সেনা ও অন্যান্য বাহিনী মোতায়েন করে। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা। গোপালগঞ্জ এখন কার্যত একটি ‘অবরুদ্ধ শহর’—যেখানে স্বাভাবিক জীবনের চিহ্ন প্রায় অনুপস্থিত।
সরকারিভাবে এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুধু জানানো হয়েছে, জনগণের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে যতদিন প্রয়োজন, ততদিন এই কারফিউ বহাল থাকবে।