চিন্ময় কৃষ্ণ দাস। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৪ জুলাই-
চট্টগ্রামের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলাসহ পাঁচটি মামলায় সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) বেলা সোয়া ১১টায় চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক হাসানুল ইসলাম এই আদেশ দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী। অপরদিকে, আসামিপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ঢাকাফেরত আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন একটি টিম। শুনানিকে ঘিরে চট্টগ্রাম আদালত এলাকায় নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
চিন্ময়ের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার মোহরা ওয়ার্ড বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ খান কোতোয়ালি থানায় মামলাটি করেন, যেখানে চিন্ময়সহ ১৯ জনকে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে আসামি করা হয়। পরে ফিরোজকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতারের পর ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালতে জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ নিহত হন। এ ঘটনায় তাঁর বাবা জামাল উদ্দিন ৩১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। একইদিন পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলাসহ আরও পাঁচটি মামলা হয়। মোট ছয় মামলায় ৫১ জন গ্রেফতার হন, যাদের মধ্যে ২১ জন আলিফ হত্যা মামলার আসামি।
এইসব মামলায় চিন্ময়ের জামিন নিয়ে আইনি লড়াই চলতে থাকে। সর্বশেষ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ তাঁর জামিন মঞ্জুর করে। তবে একইদিন সরকার পক্ষ সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে জামিন স্থগিত চেয়ে আবেদন করে, যা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। সরকারের পক্ষে আদালতে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ, অনীক আর হক, আবদুল জব্বার ভুঞা ও ফরিদ উদ্দিন খান।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, চিন্ময়ের জামিনকে ঘিরেই চট্টগ্রামে সংঘর্ষ ও একজন আইনজীবীর মৃত্যু ঘটে। তাঁকে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রকারী বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে আদালত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, মামলার এজাহারে যেসব বিষয় নেই, তা শুনানির বিষয় হতে পারে না। এই পর্যবেক্ষণ বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও প্রমাণনির্ভর বিচারিক প্রক্রিয়ার পক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
চিন্ময়ের বিরুদ্ধে চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ৩ ডিসেম্বর তাঁর জামিন শুনানি সরকার পক্ষের আবেদনে পেছানো হয় ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারিতে। আরও বিস্ময়ের বিষয়, তখন তাঁর পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত হননি। কারণ, চট্টগ্রাম বার অ্যাসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত নেয়—চিন্ময়ের পক্ষে কেউ মামলা লড়বে না। এটিকে অনেকে পেশাগত নীতিমালার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন কেবল একটি মামলার বিষয় নয়, বরং তা এখন হয়ে উঠেছে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক অধিকার ও রাজনৈতিক চাপের প্রভাব নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। যদি চিন্ময় দাস দোষী হন, তবে সেটি আইন অনুযায়ী প্রমাণের মাধ্যমেই প্রমাণিত হওয়া উচিত—রাজনৈতিক চাপ বা আবেগ নয়। এই প্রক্রিয়ায় যেকোনো পক্ষপাতমূলক অবস্থান গ্রহণ দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।