অন্তত ১৯টি হিন্দু বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
মেলবোর্ন ২৮ জুলাই- বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি শান্তিপূর্ণ গ্রাম—রংপুরের গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ি ইউনিয়নের আলদাদপুর—মাত্র কয়েকদিন আগেও ছিল এক নিস্তরঙ্গ জনপদ। আজ সেই গ্রাম জ্বলছে। জ্বলছে ঘরবাড়ি, জ্বলছে মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা, সহাবস্থান আর সভ্যতার সেতুবন্ধন। ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের ভিত্তিতে ২৬ ও ২৭ জুলাই দুই দিনে অন্তত ১৯টি হিন্দু বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। আর এই ঘটনার নেপথ্যে সেই পরিচিত শব্দগুচ্ছ—“তৌহিদী জনতা”।
প্রতিবারের মতোই এবারও অভিযোগ ওঠে, সামাজিক মাধ্যমে এক হিন্দু শিক্ষার্থী ধর্ম অবমাননাকর কিছু পোস্ট করেছে। তাকে স্থানীয়রা মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। অথচ পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায়ও একটি উগ্র ধর্মীয় স্লোগানে উত্তেজিত জনতা হিন্দু বসতিতে চড়াও হয়। প্রশ্ন হলো—আইন যখন নিজ গতিতে চলছিল, তখন কেন উন্মত্ততা? কেন সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি পোড়ানো? কারা এই তৌহিদী জনতা?

“তৌহিদী জনতা” একটি পরিচয় নয়, এটি এখন একটি ঢাল।
“তৌহিদী জনতা” একটি পরিচয় নয়, এটি এখন একটি ঢাল। একটি মুখোশ। কখনও তারা পূজামণ্ডপে হামলা চালায়, কখনও নারী ফুটবল ম্যাচে বাধা দেয়, কখনও নারী তারকাদের অনুষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেয়, আবার কখনও পীরের দরবারে হামলা চালায়। প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকে একটিই পরিচিত ছায়া—তৌহিদী জনতা। কিন্তু এই ছায়ার পেছনে যে মানুষের ঘর পুড়ে, সন্তানের মুখে কান্না জড়ায়, একা হয়ে পড়ে বয়স্ক মা-বাবা, তা কে দেখে?
বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র—এটি কেবল সংবিধানের লিপিবদ্ধ বাক্য নয়, এটি এক ইতিহাস, এক আত্মপরিচয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো দেখলে প্রশ্ন জাগে—এই রাষ্ট্র কি তার সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারছে? না কি আমরা কেবল নিঃশব্দ দর্শক হয়ে গেছি?
তৌহিদী জনতা আজ কোনও একক সংগঠন নয়, এটি এক দানবীয় মানসিকতা, যা যেকোনও মুহূর্তে যে কোনও জায়গায় ধর্মের নামে ভয় দেখিয়ে, আক্রমণ করে, এবং ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়। তারা চায়, সমাজে আতঙ্ক থাকুক, ভিন্নধর্মী মানুষেরা নতমুখে চলুক, সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়ুক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি এই সহিংস মৌলবাদের কাছে মাথা নত করব?
শুধুমাত্র নিন্দা জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার, দোষীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। ধর্মের নামে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে—তা সে যেই করুক না কেন।
২০১৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তৌহিদী জনতা নামধারী গোষ্ঠীগুলোর ব্যানারে বাংলাদেশজুড়ে নানা ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিষয়ে সহিংসতা, বাধা ও উগ্র আন্দোলনের চিত্র উঠে এসেছে। সময়ের ব্যবধানে এই পরিচয়টি একটি উগ্র, মৌলবাদী শক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বাংলাদেশের বহুত্ববাদ ও ধর্মীয় সহাবস্থানের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
এক নজরে তৌহিদী জনতার কার্যক্রম
২০১৩
২০১৬
-
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ফেসবুকে কাবা শরীফের বিকৃত ছবি শেয়ারকে কেন্দ্র করে তৌহিদী জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ হয় এবং পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
-
একই বছর ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে থেমিস দেবীর আদলে নির্মিত ভাস্কর্যকে ঘিরে তৌহিদী জনতা ভাস্কর্য অপসারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, যার ফলে ২০১৭ সালের মে মাসে ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
২০১৯
২০২০
২০২১
-
কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কুরআন পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাজীগঞ্জ, লামা, ও বান্দরবানে তৌহিদী জনতার ব্যানারে মিছিল, হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
২০২৪
-
৩ নভেম্বর চট্টগ্রামে অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরীর অনুষ্ঠানে বাধা প্রদান।
-
১৩ সেপ্টেম্বর সিলেটের সুফি কাইউম চিশতিয়ার মাজারে হামলা।
-
২২ নভেম্বর লালন মেলা ও সাধুসঙ্গ বন্ধে বিক্ষোভ, নারায়ণগঞ্জে সুফি মেলার বাধা।
-
সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সুফি দরবারে হামলা এবং সংবাদমাধ্যমে ভারত সমর্থনের অভিযোগে বিক্ষোভ।
২০২৫
-
২১ ফেব্রুয়ারি: বায়তুল মোকাররমে তৌহিদী ছাত্র-জনতার সমাবেশে ২০১৩ সালের ১৩ দফা দাবির পুনরাবৃত্তি।
-
জানুয়ারি: সিলেট ডিসি অফিসের বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙা।
-
২৮ জানুয়ারি: জয়পুরহাটে নারী ফুটবল ম্যাচে হামলা, তৌহিদী জনতা’র বাধায় নারী ফুটবল খেলা বন্ধ ও দিনাজপুরে সংঘর্ষে ১০ জন আহত।
-
১৪ ফেব্রুয়ারি: ভূঞাপুরে ভালোবাসা দিবস উদযাপন কেন্দ্র করে ফুলের দোকান ভাঙচুর, বসন্তবরণ ও ঘুড়ি উৎসব স্থগিত।
-
২০ ফেব্রুয়ারি: নোয়াখালীর সুফি মাজারে হামলা।
-
২৮ ফেব্রুয়ারি: দিনাজপুরে মাজারে ওরস ঠেকাতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ।
-
৫ মার্চ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তার ঘটনায় অভিযুক্তের পক্ষে তৌহিদী জনতার বিক্ষোভ এবং পরে অভিযোগ প্রত্যাহার।
আমাদের সমাজে “তৌহিদী জনতা” নামে এক নতুন সাম্প্রদায়িক দানব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এখনই যদি তার লাগাম টেনে ধরা না হয়, তবে শুধু সংখ্যালঘু নয়—পুরো জাতি অন্ধকারে ডুবে যাবে। ধর্মীয় অনুভূতি যদি রাষ্ট্রীয় আইন, মানবাধিকার, ও সংবিধানকে অতিক্রম করে যায়, তবে আমাদের সামনে এক ভয়ংকর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।
বাংলাদেশ কারো একক ধর্মের নয়। এটি সকলের। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—কেউ কি নেই, তৌহিদী জনতাকে থামাবার? না কি আমরা সবাই মুখ ফিরিয়ে নেব, যতক্ষণ না আগুন আমাদের নিজেদের বাড়িতেও এসে পড়ে?