মেলবোর্ন, ২২ আগষ্ট- বাংলাদেশের সমকালীন বুদ্ধিজীবী অঙ্গনে সলিমুল্লাহ খান একটি বিতর্কিত নাম। নিজেকে তিনি মূলতঃ ফ্রয়েড–লাকাঁ–মার্কসের এবং কখনো কখনো ফুকো-দেরিদার ভাষ্যকার হিসেবে পরিচয় দেন; এই “পাণ্ডিত্য” প্রকাশের সাথে সাথে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, এবং সংস্কৃতি বিষয়ে “জ্ঞানগর্ভ” মতামত দিয়ে চলেছেন। আমি তাঁর বেশ কিছু কিছু মতামত শুনেছি ও পড়েছি; কিন্তু আমার নিজেস্ব জ্ঞান কম থাকায় তাঁর কথাবার্তা ও লেখালেখির সামান্য গভীরে গিয়ে মনে হলো, খান মুলতঃ জার্গনের আড়ালে আছেন; তিনি আসলে মৌলবাদী দর্শনের ধারক, এবং একধরনের মানসিক বিকারের (সাইকোসিস) প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন; আলোচ্য প্রবন্ধে তাঁকে আমরা সাইকোসিস বা মনোরোগী হিসেবে দেখাবো। তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রত্যয়ের জার্গন ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতীক ও ব্যক্তিত্ত্বদের আক্রমণ করে নিজেকে আলোচনায় রাখেন।
পাঠকদের মনে রাখতে হবে, সমালোচক মানেই কোন প্যারানয়েড সাইকোসিসের রোগী নন; এটি কেবলমাত্র তাঁদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যাঁরা মূলতঃ “সমালোচনা”কে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই অসত্য বয়ানে সাজিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন; কুৎসিত বা গালাগালি ধরনের শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করেন; প্রায় ক্ষেত্রেই ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা দেন, বা অনৈতিহাসিক (Ahistorical) ধারনা প্রয়োগ করেন। কাজেই খানের কাজকে সমালোচনা সাহিত্যিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাথে মেলানো থেকে বিরত থাকাটা জরুরী।
১. সাইকোসিস ও হিংসা–অনুকরণ (Envy–Mimesis)
১ক. “Envy–Mimesis”— লাকাঁর ভাবনায়
লাকাঁ সরাসরি “Envy–Mimesis” নামে আলাদা তত্ত্ব দেননি। তবে তিনি মিরর স্টেজ (1936, 1949) প্রবন্ধে বলছেন—
-
- শিশু আয়নায় নিজেকে দেখে এক ধরনের imaginary wholeness কল্পনা করে।
- কিন্তু এই পরিচয় আসলে অন্যের প্রতিচ্ছবি অনুকরণের (mimesis) মাধ্যমে গড়ে ওঠে।
- এখানে “নিজে হওয়ার বাসনা” আর “অন্যকে অনুকরণ করার বাসনা”—এই দুইয়ের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
- এই টানাপোড়েন থেকেই ঈর্ষা (envy) জন্ম নেয়।
- পুরো বিষয়টি ধাপে ধাপে হয়; এটি এভাবে দেখা যেতে পারেঃ আমি অন্যকে দেখি → আমি তাকে অনুকরণ করতে চাই (mimesis) → কিন্তু আমি পারি না → ফলে ঈর্ষা ও হিংসা তৈরি হয়।
তাই লাকাঁর চিন্তাকে মুল ধরে নিয়ে বলা যায়, প্রতিটি subject সর্বদা অন্যের বা অন্য আদর্শের মুল ব্যক্তিত্ত্বের সাথে প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্কের মধ্যে নিজের বা তাঁর আদর্শের মূল ব্যক্তিত্ত্বেদের অবস্থানটি বুঝতে পারে, কিন্তু নিজেকে যখন সেই “অন্য” মানুষ বা ব্যক্তিত্ত্বদের সমকক্ষ ভাবতে পারেনা তখন সেই মানুষ বা ব্যক্তিত্ত্বদের প্রতি ইর্ষান্বিত হয়; ফলে ওই ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্ত্বদের বিরুদ্ধে অসত্য বয়ানকে সত্যের মত করে উপস্থাপন করে যদিও সে ওই ব্যাক্তি বা ব্যক্তিত্ত্বদের মনে মনে নিজের চেয়ে উচ্চ অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করে; এই প্রবণতাটিই ব্যক্তিকে প্যারানয়েড সাইকোসিস নামের রোগের রোগী হিসেবে দেখায়। এই প্রত্যয়টি আরেকটু ব্যাখ্যার দাবী করে।
১খ. প্যারানয়েড সাইকোসিস (Lacan, 1932, De la psychose paranoïaque dans ses rapports avec la personnalité)
- এখানে লাকাঁ দেখিয়েছেন, প্যারানয়েড রোগীরা প্রায়ই বিশ্বাস করে যে, অন্যরা তাদের ছোট করছে, তাদের প্রতিভা চুরি করছে, বা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
- যখন তাদের থেকে কিছু চুরি করার বিষয় দেখাতে পারেনা তখন তারা অন্যদের থেকে চুরি করেছে বলে প্রমান করতে চায়।
- সাইকোসিসের মূল চালক হলো:
- ঈর্ষা (আমি যা হতে চাই, তা অন্যজন হয়ে গেছে)
- অপরের অনুকরণে ব্যর্থতা (mimesis crisis)
- অতঃপর আক্রমণ ও হিংস্রতা (paranoid delusion)
- মনোবৈকল্য বা সাইকোসিস— খুন করতে চাওয়া; বাস্তবে এটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে অসত্য ও কুৎসিত বয়ান দিয়ে প্রতিপক্ষের বা ব্যক্তির ইমেজ “খুন” বা ক্ষতিগ্রস্ত করার মাধ্যমে।
এবার দেখা যাক সলিমুল্লাহ খানের ক্ষেত্রে প্যারানয়েড সাইকোসিস রোগটি কিভাবে কাজ করছে।
২. সলিমুল্লাহ খানের সাথে মিল
সংক্ষেপে আমাদের ব্যাখ্যাটি এমনঃ (১) খান বাংলা সাহিত্য, রাজনীতি, এবং সংস্কৃতির অনেক ব্যক্তিত্ত্বের পঠনপাঠন বা গবেষনা করতে গিয়ে নিজেকে তাঁদের চেয়ে প্রথমে উচ্চতর গুনের অধিকারী ভাবতে শুরু করেন; (২) যখন তিনি দেখতে পান যে, এঁরা তাঁর ধরাছোঁয়ার বাইরে তখন তাঁদের গুন নিজের “অচেতন” অংশে স্বীকার করে নেন, কিন্তু, (৩) সচেতনভাবে তিনি এটি প্রকাশ্যে স্বীকার করতে চাননা; (৪) উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তাঁর মধ্যে একধরনের প্রবণতা কাজ করে যে, তিনি বাংলা সাহিত্য বা রাজনীতিতে অনেকের মতই বা তাঁদের চেয়ে বেশী গুনের অধিকারী; এমন মানুষদের মধ্যে উদাহরণ হিসেবে যাঁদের আনা যায় তাঁদের মধ্যে বিশেষ দু’জন হলেন রবীন্দ্রনাথ এবং হুমায়ুন আজাদ; এর বাইরে তাঁর নিজের গুরু আহমদ ছফাকেও এই লিষ্টে রাখা যায়। (৫) এই একই প্রেমিসে তিনি যেসব জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ত্বদের সাথে একাত্মবোধ করেন তাঁদের তিনি “অন্য” কারো চেয়ে মহত্তর বা বেশী গুনের মানুষ মনে করেন, কিন্তু এই “অন্য মানুষেরা” তাঁর প্রিয় মানুষ বা নেতাদের চেয়ে বাস্তবে যখন অনেক এগিয়ে থাকেন তখন তিনি তাঁর বা তাঁদের বিরুদ্ধে অসত্য বয়ান দিয়ে এমনকি ইতিহাসকেও বিতর্কিত করার চেষ্টা করেন; উদাহরণ হিসেবে বঙ্গবন্ধু বিষয়ে তাঁর সাম্প্রতিক মতামতগুলোকে ব্যবহার করা যায়; এর সাথে আমরা সংবিধান বিষয়ে তাঁর মতামতও বিশ্লেষন করবো।
সংক্ষেপে, খান যখন তার “হতে চাওয়া” ব্যক্তিত্ত্ব বা জাতীয় ব্যক্তিত্ত্বদের উচ্চতায় নিজে বা তাঁর আদর্শিক ব্যক্তিদের স্থাপন করতে পারেননি বা নিজে পৌঁছাতে পারেননি তখন তাঁর মধ্যে Envy–Mimesis চক্র সক্রিয় হয়েছে:
- মিরর স্টেজের মত তিনি প্রতীকমাত্রে তাদের জায়গায় নিজেকে বসাতে চান। মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী সাইকোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় যাদের মতো হতে চায়, তাদের প্রতিভা নিজের ভেতরে অনুধাবন করলেও প্রকাশ্যে ঘৃণা ও আক্রোশ প্রকাশ করে।
- কারন, তাঁর নিজের অপূর্ণতা/হীনমন্যতা মেনে নিতে পারেন না বলে ঈর্ষা (envy) জন্মে।
- ফলতঃ প্রতিভাবানদের ছোট করে দিতে হয়।
- শেষমেশ প্রকাশ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে প্যারানয়েড আক্রমণ (psychotic attack) চালান—অবমাননা, গালাগালি, খাটো করা।
- লাকাঁর ভাষায়, এটি একধরনের misrecognition—নিজেকে “পূর্ণ” ভাবার ভ্রান্তি রক্ষার জন্য অপরকে গালাগালি করা।
৩. তত্ত্ব ও প্রয়োগের সারসংক্ষেপঃ
| Lacanian ধারণা |
মূল বৈশিষ্ট্য |
সলিমুল্লাহ খানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ |
| Mirror Stage |
অন্যকে দেখে নিজের পরিচয় গঠন |
রবীন্দ্রনাথ/ছফা/বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি নকল করার বাসনা |
| Mimesis |
অনুকরণের চেষ্টা |
তাঁদের লেখনী/চিন্তার ধরন অনুকরণ |
| Envy |
অনুকরণে ব্যর্থ হলে ঈর্ষা |
তিনি যেমন হতে চান, পারেন না → অন্তর্দাহ |
| Paranoid Psychosis |
বিশ্বাস, অন্যরা তাঁকে ছোট করছে/তার বিরুদ্ধে |
প্রকাশ্যে আক্রমণ: রবীন্দ্রনাথকে “অসঙ্গত”, আজাদকে “ভ্রান্ত”, বঙ্গবন্ধুকে “ব্যর্থ” প্রমাণের চেষ্টা |
সুতরাং বলা যায়, লাকাঁর Envy–Mimesis এবং Paranoid Psychosis-এর কাঠামো খানের ব্যক্তিত্বের সাথে মিলে যায়—যেখানে শ্রদ্ধা ও ঈর্ষা মিলেমিশে ঘৃণা ও আক্রমণে রূপান্তরিত হয়েছে।
৪. সলিমুল্লাহ খানের ক্ষেত্রে প্রয়োগঃ
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- ভেতরে ভেতরে শ্রদ্ধা: রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক প্রতিভা অনস্বীকার্য—তিনি নিজেও বারবার কবিতার বিশ্লেষণে রবীন্দ্রনাথকে টেনে এনেছেন।
- কিন্তু প্রকাশ্যে আক্রমণ: বানান নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন, বলেছেন রবীন্দ্রনাথ “ব্যঞ্জনার ব্যঞ্জনা ধরতে পারেননি”।
- মনস্তত্ত্বীয় বিশ্লেষণ: রবীন্দ্রনাথের মতো হতে পারেননি—তাই হীনমন্যতা ঢাকতে গালাগালি করেছেন।
(খ) হুমায়ুন আজাদ
- ভেতরে ভেতরে শ্রদ্ধা: মুক্তচিন্তার শক্তি ও সাহসের জায়গায় খান নিজেও আজাদের কাছ থেকে প্রভাব নিয়েছেন।
- কিন্তু প্রকাশ্যে আক্রমণ: তাঁকে “ট্র্যাশ” বলেছেন।
- মনস্তত্ত্বীয় বিশ্লেষণ: আজাদের মতো জনপ্রিয় মুক্তচিন্তার প্রতীক হতে না পারার হিংসা থেকে বিদ্বেষ।
(গ) আহমদ ছফা
- ভেতরে ভেতরে শ্রদ্ধা: ছফাকে “গুরু” বলেছেন, স্বীকার করেছেন ছফার সাহস ও চিন্তা থেকে শিখেছেন।
- কিন্তু প্রকাশ্যে আক্রমণ: (ক) ছফার লেখাকে “আবেগী কিন্তু দর্শনে দুর্বল” বলেছেন, নারীবাদ নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন। খান তাঁকে “বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম লেখক” বলেছেন, কিন্তু প্রকৃত মর্যাদা দেননি। ছফার অর্ধেক মানবী, অর্ধেক ঈশ্বরী ধারণা ছিল নারীর প্রতি ভক্তি-অভিভূত দৃষ্টিভঙ্গি; কিন্তু খানের অবস্থান এর পুরো উল্টো—তিনি নারীবাদ নিয়ে প্রায়শই বিদ্রূপাত্মক; (খ) ছফা যেখানে বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে খুবই শ্রদ্ধাশীল, এবং বলেছেন, “বাংলার তিন হাজার বছরের ইতিহাসে তাঁর তুলনা নেই”, কিন্তু খান অহরহ বঙ্গবন্ধুর নের্তৃত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
- মনস্তত্ত্বীয় বিশ্লেষণ: ছফার মৌলিকতা ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিজের মধ্যে না আনতে পারার ফলে ঈর্ষা এবং এর ফলে আক্রমণ।
এতে স্পষ্ট হয়—তিনি ছফাকে নামেমাত্র গুরু মানলেও ব্যবহার করেছেন, কিন্তু প্রকৃত সম্মানই দেননি।
(ঘ) অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক
- ভেতরে ভেতরে শ্রদ্ধা: বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার গুরু মেনে তাঁর কাজ পড়েছেন এবং তাঁর তত্ত্বের আলোকে লিখেছেন।
- কিন্তু প্রকাশ্যে আক্রমণ: রাজ্জাককে “অতীতে আটকে থাকা” বলে খাটো করেছেন, সেক্যুলারিজমকে দুর্বল করেছেন।
- মনস্তত্ত্বীয় বিশ্লেষণ: রাজ্জাকের মতো প্রজ্ঞাবান বিশ্লেষক হতে না পারার হীনমন্যতা।
(ঙ) ডঃ কামাল হোসেনঃ
- খান স্বীকার করেন যে ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের সংবিধানের প্রধান রূপকার।
- তবে তিনি কামাল হোসেনের সংবিধান প্রনয়নের ক্ষমতা নিয়ে বিদ্রুপ করেন; সাম্প্রতিক সময়ে সংস্কার কমিশনের সদস্যরা ডঃ কামাল হোসেনের সাথে দেখা করায় তিনি তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেন (“সংবিধান বলতে কামাল হোসেনরা কী বোঝেন?”)
- মনস্তত্ত্বীয় বিশ্লেষণ: আইনের ছাত্র হিসেবে তিনি কামালের উচ্চতায় যেতে না পারার কারনে প্যারানয়েড সাইকোসিসের রোগীর মত কামাল হোসেনকে যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
(চ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
- ভেতরে ভেতরে শ্রদ্ধা: বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাংলাদেশের জন্ম সম্ভব হতো না—এই সত্য তিনি অস্বীকার করতে পারেন না।
- কিন্তু প্রকাশ্যে আক্রমণ: বলেছেন—“বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশ তৈরি করেছিলেন, সেটি ভেঙে পড়তে সময় লেগেছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর।”
- মনস্তত্ত্বীয় বিশ্লেষণ: বঙ্গবন্ধুর চিন্তা খানের নিজস্ব চিন্তা এবং তাঁর প্রিয় ব্যক্তিত্ত্বদের ছাড়িয়ে যাওয়ায় হিংসা ও হীনমন্যতা থেকে বঙ্গবন্ধুকে অবমূল্যায়ন।
৫. সারসংক্ষেপ (সাইকোসিসের প্রমাণ)
| প্রতীক |
ভেতরে ভেতরে অবস্থান |
প্রকাশ্যে অবস্থান |
মনস্তত্ত্বীয় ব্যাখ্যা |
| রবীন্দ্রনাথ |
সাহিত্যিক প্রতিভার প্রতি অনিবার্য শ্রদ্ধা |
বানান ও ব্যঞ্জনা নিয়ে বিদ্রূপ |
হীনমন্যতা → কুৎসিত আক্রমণ |
| হুমায়ুন আজাদ |
মুক্তচিন্তার সাহস অনুকরণযোগ্য মনে করা |
তাঁকে “ট্র্যাশ” বলা |
ঈর্ষা → অবমাননা |
| আহমদ ছফা |
গুরু হিসেবে স্বীকৃতি |
লেখাকে “দর্শনে দুর্বল” বলা |
গুরু হলেও খাটো করা |
| আবদুর রাজ্জাক |
চিন্তার জগতে অবদান স্বীকার |
তাঁকে “অতীতে আটকে থাকা” বলা |
প্রতিভায় পৌঁছাতে না পেরে অবমূল্যায়ন |
| বঙ্গবন্ধু |
রাষ্ট্রগঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রতি অনিচ্ছুক স্বীকৃতি |
“সাড়ে তিন বছরে রাষ্ট্র ভেঙেছে” বলা |
ঈর্ষা → চরিত্রহনন |
৬। খান কি অতিরঞ্জিত আত্মগৌরবে ভুগছেন?: তাঁর কিছু মন্তব্য
| সলিমুল্লাহ খানের মন্তব্য/অবস্থান (কিছু উদাহরণ) |
লাকাঁর ধারণা |
বিশ্লেষণ |
| “আমিই বাংলায় প্রথম লাকাঁকে এনেছি, আমার আগে কেউ করেনি।” |
Mirror Stage → ভ্রান্ত পূর্ণতা |
নিজের ভূমিকা অতিরঞ্জিত; বাংলায় অন্য গবেষক (রাজ্জাক, আজাদ, ছফা) লাকাঁকে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তিনি সব ক্রেডিট নিতে চান; নিজেকে ‘বাংলাদেশের লাকাঁ’ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
|
| রবীন্দ্রনাথকে ক্ষেত্রে ‘ভ্রান্ত’ বলেছেন, আজাদকে ‘অতিরঞ্জিত’, বঙ্গবন্ধুকে ‘ব্যর্থ নেতা’; “আজাদ মুক্তিযুদ্ধে একটি ঢিলও মারেননি” |
Paranoid Psychosis → delusion of grandeur |
বড় প্রতীকী ব্যক্তিত্বদের খাটো করা; যেন প্রমাণ করতে চান, আসল চিন্তক কেবল তিনি। |
| “সংবিধান বলতে কামাল হোসেনরা কী বোঝেন?” |
Paranoid Self-importance
প্যারানয়েড সাইকোসিসঃ নিজেকে বড় ভাবা
|
এই ক্ষেত্রে সলিমুল্লাহ নিজের আইন সম্পর্কিত ভিত্তিটিকে কামাল হোসেন বা আমিরুল ইস লামের চেয়ে বড় দেখান যেন তিনিই কেবল সংবিধান বোঝেন। |
| অন্যদের গবেষণাকে ‘পুরোনো’ বা ‘অসম্পূর্ণ’ বলেন, যেমন নজরুল গবেষক খান সারোয়ার মুর্শিদ সম্পর্কে অযথা কুৎসিত কথা বলেন; অধ্যাপক রাজ্জাকের ক্ষেত্রেও এমন মন্তব্য পাওয়া যায়। |
Envy–Mimesis → ব্যর্থ অনুকরণের পর ঈর্ষা |
নিজে পুরো করতে না পারলেও, অন্যদের ছোট করে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চান। |
৭। কিছু জার্গনের অপপ্রয়োগ: লাকাঁর ভুল প্রয়োগের কিছু উদাহরণ
লাকাঁর ধারণা Mirror Stage, Big Other, Desire of the Other মূলত ব্যক্তিগত মানসিক গঠনের বিষয়। এগুলোকে খান সরাসরি সমাজ ও রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে দেন।
| ধারণা |
লাকাঁর আসল ব্যাখ্যা |
সলিমুল্লাহ খানের ব্যবহার |
মন্তব্য |
| Mirror Stage |
শিশুর আয়নায় ‘আমি’-এর ভ্রান্ত ঐক্য |
প্রত্যয়টি সরাসরি ব্যবহার না করলেও এর মূল ধারনাটি ব্যবহার করেন; যেমন, আত্মপরিচয় প্রশ্নে জাতিকে আয়নায় দাঁড়ানো শিশুর সঙ্গে তুলনা করা |
ব্যক্তির মনোবিশ্লেষণ থেকে সমাজে জাম্প |
| Big Other |
ভাষা, আইন, প্রতীকী কাঠামো |
খানের ব্যবহারে এটি প্রতিপক্ষ সরকার
বা নেতা |
বিমূর্ত ধারণাকে ব্যক্তিতে রূপান্তর |
| Desire of the Other |
আকাঙ্ক্ষা গড়ে ওঠে অন্যের দৃষ্টির মাধ্যমে |
ভারত/পশ্চিমা প্রভাব বোঝাতে প্রয়োগ |
জাতীয়তাবাদী রূপক |
এখানে দ্বিচারিতা স্পষ্ট। খান বলেন লাকাঁ অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক, আবার নিজেই তা রাজনৈতিক স্লোগানের মতো ব্যবহার করেন।
৮। মৌলবাদী দর্শনের গোপন শিকড়
খানকে প্রায়শঃ লাকাঁয়ান মনে হলেও তাঁর আক্রমণের ধারা মৌলবাদীদের মতো:
| মৌলবাদীদের আক্রমণ |
সলিমুল্লাহ খানের আক্রমণ |
মিল |
| রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু/ভারতীয় আখ্যা দিয়ে আক্রমণ |
বানান বিতর্কে রবীন্দ্রনাথকে খাটো করা |
সাংস্কৃতিক প্রতীক ভাঙা |
| হুমায়ুন আজাদকে নাস্তিকতার জন্য আক্রমণ |
আজাদকে “ট্র্যাশ” বলা |
মুক্তচিন্তা আক্রমণ |
| বঙ্গবন্ধুকে ভারতপন্থী/ধর্মবিরোধী আখ্যা |
বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র পরিচালনাকে ব্যর্থ বলা |
স্বাধীনতার প্রতীক আক্রমণ |
এছাড়াও তিনি মাদ্রাসা থেকে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সৃষ্টি হয়েছিলো বলে মতামত দেন। তিনি বলেন, ইউরোপের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকড় মধ্যযুগীয় মুসলিম মাদ্রাসায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বাগদাদের ‘নিযামিয়া মাদ্রাসা’ (১১শ শতক) এবং কর্ডোবার মাদ্রাসার কথা টেনেছেন। তাঁর মতে, ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের “ক্যাথেড্রাল স্কুল” আসলে মুসলিম মাদ্রাসার ধাঁচ “নকল” করেছে। কিন্তু এসব দাবীর পক্ষে তিনি কোন প্রমান দেননা। মনে রাখা দরকার সমসাময়িক কালে ইউরোপে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন বোলোগনা, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রির ইত্যাদির জন্ম হয়। কী কারনে খান এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূলে তাঁর বর্নিত মাদ্রাসাগুলোর ভূমিকা দেখতে পান তা কিন্তু তিনি বলেননা; প্যারানয়েড সাইকোসিসের রোগীদের এটিও একটি বৈশিষ্ঠ্য যে, তাঁরা বল মাঠে ছুঁড়ে দেন, কিন্তু এটিকে গন্তব্যে নেননা, কারন গন্তব্যে নেয়ার মত তথ্য ও যুক্তি তাঁদের হাতে থাকেনা। দুয়েকটি টেকস্ট তাঁরা হয়ত ব্যবহার করেন, কিন্তু এর বিপরীত দাবী নিয়ে কোন কথা বলেননা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান কাঠামোতে মিল আরেকটিকে অনুসরণ করেছে এমন নয়; যেমন ধরুন, অষ্টম- নবম শতকের বায়তুল হিকমাহতে গ্রিক দর্শন ও অন্যান্য জ্ঞান শাখার শিক্ষা ও চর্চার কথা জানা যায়; এর মানে এই নয় যে, বায়তুল হিকমাহ গ্রীক জ্ঞানকান্ডকে অনুকরণ করেছে, বা এটির আদলেই বায়তুল হিকমাহতে জ্ঞান বিতরন হতো। আমি অনেক ভারতীয় পন্ডিতের লেখায় দেখেছি (গোখলে, মুখার্জী, বাসাম, লোকেশ চন্দ্র, ইত্যাদি) ভারতীয় সভ্যতার জ্ঞান ব্যবহার করেই ইসলামী ও ইউরোপীয় জ্ঞানব্যবস্থা প্রসারিত হয়। সময়কালের হিসেবে, ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (তক্ষশিলা, নালন্দা, বিক্রমশীলা) ছিল বিশ্বের প্রাচীনতম ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাকেন্দ্র; ইসলামী বিশ্বের অনেক জ্ঞানসাধক এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ভারতীয় জ্ঞান পরোক্ষভাবে হলেও ইসলামী বিশ্ব হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছে, যা নিঃসন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঠ্যসূচিকে সমৃদ্ধ করেছে।
সমস্যাটি আসলে অন্য জায়গায়। খানসহ এই জাতীয় প্যারানয়েড সাইকোসিসের রোগীরা এক ধরনের হীনমন্যতা থেকেই নিজস্ব সবকিছু অন্যের চেয়ে মহত্তর, এটি প্রমান করতে চান বলেই জ্ঞানবিজ্ঞানসহ সব কিছুর ধর্মীয়করন করেন, এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও অন্যদের প্রতি দায়কে অস্বীকার করেন। খেয়াল করলে দেখবেন, বাগদাদ বা ইরাক আসলে ব্যবিলনিয়ান সভ্যতার অংশ; তেমনি অটোম্যান সাম্রাজ্য মুলতঃ তুরস্কের অন্তর্গত; ইরান পারসিয়ান সভ্যতার অংশ। আরো খেয়াল করুন, ভারত বা উত্তর আফ্রিকার যেসব অঞ্চলে ইসলামিক জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রভাব আমরা দেখতে পাই সেগুলো আগে থেকেই শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অগ্রগামী; ভারতে মোগলরা কোন অঞ্চল থেকে এসেছিলেন? অন্যান্য মুসলিম শাসক যাঁদের অবদান আছে ভারতে ইসলামিক ঐতিহ্য স্থাপনে তাঁরাইবা কোন অঞ্চলের ছিলেন? স্পেনে ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতি কাদের হাত ধরে এসেছিলো? সে সময় ইসলামি জ্ঞানবিজ্ঞান প্রসারনে স্পেন এবং রোমান ঐতিহ্যের যে অবদান ছিলো সেটি স্বীকার না করে কেবলই জ্ঞানের ধর্মান্তরকরনের কাজটি করে যাওয়া হয়েছে। এর ফলে, জ্ঞানের বিভিন্ন উৎসের যে সমন্বয় সেটির কথা খানের মত মানুষেরা বলেননা। ভেবে দেখুনতো, ইসলামের প্রতিষ্ঠা যে সোদী আরবে সেটিসহ আশেপাশের অন্তত ডজনখানেক দেশের কী ভূমিকা আছে ইসলামিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারনে? যদি ইসলামই মুল কারন হতো এ কাজে তবেতো ওই দেশগুলোতেই সেটি বেশী হওয়ার কথা ছিলো; এখানেইতো মহানবী ও তাঁর বিখ্যাত সাহাবীদের জন্ম। তাহলে এসব দেশের কী ভূমিকা আছে জ্ঞান বিজ্ঞান প্রসারনে? এই ক্ষুদ্র বিষয়টি খানদের কথায় আসেনা, কারন সেক্ষেত্রে নিজস্ব “অতিরঞ্জিত গৌরব” ছিটকে পড়বে জার্গনের পর্দার বাইরে।
৯। সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সংবিধান আক্রমণ
সলিমুল্লাহ খানের আসল উদ্দেশ্য হলো—
ক। সাংস্কৃতিক প্রতীক ভাঙা: রবীন্দ্রনাথ আক্রমণ মানে বাঙালিত্ব আক্রমণ।
খ। মুক্তচিন্তা ধ্বংস: হুমায়ুন আজাদকে আক্রমণ মানে বৌদ্ধিক স্বাধীনতা ধ্বংস।
গ। স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে ফেলা: বঙ্গবন্ধুকে আক্রমণ মানে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা আক্রমণ।
ঘ। সংবিধানকে আক্রমন করাঃ এই অংশটি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক মনে হয়েছে আমার কাছে। একটু বিস্তারিত আলাপ করতে চাই তাঁর একটি বক্তৃতার ওপর ভিত্তি করে (“৭২’র সংবিধানের যে ভুল ধরিয়ে দিলেন ড. সলিমুল্লাহ খান | Dr. Salimullah Khan | Jamuna TV, ২০২৪”)।
তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা সাম্য, ন্যায়বিচার, ও মানবিক মর্যাদা নাকি সংবিধানে রক্ষিত হয়নি। কিভাবে? গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, এবং জাতীয়তাবাদে সাম্য, ন্যায়বিচার, ও মানবিক মর্যাদা নেই? কিভাবে? তিনি আরো বলেন, বাহাত্তোরের সংবিধান সংসদকে সার্ব্বভৌমত্ত্ব দিয়েছে, জনগণকে নয়। আমি তাঁর এই বক্তব্যে আবারো প্যারানয়েড সাইকোসিস রোগের লক্ষন দেখতে পাই। সংসদ সার্ব্বভৌম বলার সাথে জনগণের সার্ব্বভৌমত্ত্বের পার্থক্য কী? সংসদ কারা নির্বাচিত করেন? এটি জনগনের দ্বারাই নির্বাচিত— কাজেই তার সার্বভৌমত্ব জনগনের হাতেই থাকে। মজার ব্যপার হলো, সংসদের সার্বভৌমত্ত্ব মানে জনগনের সার্ব্বভৌমত্ত্বের প্রায়োগিক রূপ; সংসদ শুধু ম্যানেজারি করেনা যেটি তিনি বলছেন। এক ধরনের ইকোলজিক্যাল ফ্যালাসি তৈরী করাই তাঁর উদ্দেশ্য মনে হয়। জনগণের সার্ব্বভৌত্ত্ব কিভাবে কার্যকর হবে তা তিনি বলেননা। মজার ব্যপার হলো, তাঁর বক্তব্যের কিছুক্ষন পরই তিনি এটি স্বীকার করেন যে, এই ম্যানেজারদের (সাংসদদের) পারফর্মেন্স বিষয়ে প্রতি পাঁচ বছর পরপর জনগণই (তিনি বলছেন “মালিক” বা নিয়োগকর্তা) সিদ্ধান্ত নেন; এখানে তবে সার্বভৌমত্ত্ব কার? তিনি নিজেই বললেন যে, এটাই জনগণের সার্ব্বভৌমত্ত্ব। এখানে সংসদের মাধ্যমে জনগণের সার্ব্বভৌমত্ত্ব কি প্রতিভাত হলোনা? সংবিধানে জনগণের সার্ব্বভৌমত্ত্বের প্রতীক হিসেবে সংসদকে বোঝানো হয়েছে—এই সহজ জিনিসটি তাঁর না বোঝার কথা নয়। আসলে প্রত্যয়ের জার্গন ব্যবহার করার যে অভ্যেস সেটি থেকেই তিনি সহজ বিষয়টিকে অযথা ফ্যালাসির মত যুক্তি দিয়ে কঠিন করে তোলেন, এবং পরে নিজেই সেটি খন্ডন করেন যখন সংসদ আসলে জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হয়, এই বিষয়টি, এবং সংসদ তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে, এইটি মেনে নেন।
সংসদের সার্বভৌমত্ত্ব নিয়ে শক্ত আপত্তি উত্থাপনের কিছুক্ষন পরই তিনি আমাদের জানান যে, নির্বাহী বিভাগকে আইন ও বিচার বিভাগের ওপর বসানো হয়েছে; কিন্তু তিনি বলেননা এই কথাটি সংবিধানে কোথায় বলা হয়েছে? এখানেও তিনি জার্গন ব্যবহার করেন, কিন্তু ব্যাখ্যা দেননা; আবার প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতিকে “আমলা” বলে ঘোষনা করেন। কিছুক্ষন আগেই তিনি বললেন, সার্ব্বভৌমত্ত্ব নাকি কেবল সংসদের, আবার এখন বলছেন, নির্বাহী বিভাগ আইন বিভাগের ওপরে! তাহলে ব্যপারটি কী দাঁড়ালো? প্রধানমন্ত্রী কিভাবে আমলা? রাষ্ট্রপতি? “আমলার” নিয়োগ আর প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ কি একই প্রক্রিয়াতে হয়? আমাদের সংবিধানে আইন, বিচার, ও নির্বাহী বিভাগ এই তিনটিকেই সমান মর্যাদার অধিকারী ঘোষনা করা হয়েছে। খান বলছেন, আমাদের উচিত ছিলো আইন বিভাগকে অন্য দুইটির ওপরে আনা। এটি কিভাবে হতো? সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান কী হতো? এটি হলেতো প্রধানমন্ত্রী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যাবেন; বিচার ও নির্বাহী দুটোই তাঁর অধীনে চলে আসবে। এটি কি খানের কাঙ্খিত?
তিনি কিছু অযাচিত কথা বলেছেন; যেমন তিনি বলছেন, আইন বিভাগকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে তাদের কর্তৃত্ত্বে দিতে হবে নির্বাহী ও বিচার বিভাগকে। পৃথিবীর কোন দেশে এটি আছে? একদিকে তিনি বলছেন সার্ব্বভৌমত্ত্ব বিভাজন করা যায়না, অন্যদিকে জনগণের সার্ব্বভৌমত্ত্ব যে তিনটি অঙ্গের মাধ্যমে কাজ করবে সেগুলোর মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন চাইছেন! পৃথিবীর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কোথাও এমনটি নেই। কয়েকটি দেশের উদাহরণ দেয়া যাকঃ
- ভারত: তিন অঙ্গ স্বাধীন; সংসদ সার্বভৌম হলেও বিচার বিভাগ ও নির্বাহী পৃথক।
- ব্রিটেন: সংসদ সার্বভৌম, কিন্তু ২০০৫ সালের পর বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন।
- ফ্রান্স: Fifth Republic এ তিন অঙ্গ স্পষ্টভাবে পৃথক।
- আমেরিকা: Checks and Balances; কোনো অঙ্গ অপর অঙ্গকে অধীনস্থ করতে পারে না।
কাজেই গণতন্ত্রের সুতিকাগার বলে বিখ্যাত দেশগুলোর কোথাও যেটি নেই, খান সেটি চাইছেন! আবারো বলি, অতিরিক্ত জার্গন ব্যবহারের ফলে তাঁর এই বিভ্রান্তি যেটি জনমানুষকে সস্তা বিনোদন দেয়; বাস্তবে এটি ঘটেনা; ঘটা সম্ভব নয়।
খানের রাজনৈতিক চিন্তা এবং ধ্যানধারনা মৌলবাদী ও স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির সঙ্গেই কার্যত মিলিত।
১০। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ঘোষনা, ও সংবিধান নিয়ে খানের আরেকটি সাইকোসিসজনিত প্রলাপঃ
খান বলেন, আমরা নাকি সংবিধানে সার্বভৌমত্ব এক ব্যক্তির হাতে, এক পরিবারের হাতে ন্যস্ত করেছিলাম। সেটি কিভাবে হয়েছিলো বা সংবিধানের কোন জায়গায় আমরা এটি করেছিলাম তার কোন ব্যাখ্যা তিনি দেননা। অনেকটাই এনসিপি’র অনৈতিহাসিক যুব-নের্তৃত্ত্বের মত তাঁর কথা। এরাও এটি বলে; তিনিও তাই বলছেন।
তিনি আরো বলেছেন, ২৫ ও ২৬ শে মার্চ নাকি স্বাধীনতার ঘোষনা তৎকালীন নের্তৃত্ত্ব সাথে সাথে দিতে পারেনি; এটি নাকি এসেছিলো পনের দিন পর সীমান্তের ওপারে গিয়ে। কতটা Ahistorical হলে এমনটি বলা সম্ভব? আমাদের স্বাধীনতার “ঘোষণাপত্র” এসেছে পরেরদিন পর; ঘোষনাটি আগেই হয়েছে। এইটি খান জানেননা তাতো হতে পারেনা। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পৃথিবীর ইতিহাসে কোন দেশেই সাথে সাথেই দেয়া যায়নি; এমনকি তাঁর প্রিয় ৫ আগষ্টের “সদ্য স্বাধীনতার” কান্ডারীরা সরাসরি ক্ষমতায় থেকেও তাঁদের “ঘোষনাপত্র” দিয়ে উঠতে এক বছর নিয়েছেন। এসব খান আমার চেয়ে অনেক ভালো জানেন। কিন্তু তাঁর আপত্তিটি মনে হয় ওই যে “সীমান্তের ওপারে” এটি দেয়া হয়েছে সেই জায়গায়। এ নিয়ে কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো।
তিনি বলেছেন, “ভারতীয় মিডিয়া যা করেছে এবং এখনো যা করছে তাতে মনে হয়, বিগত আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দু নির্যাতন”; নরেন্দ্র মোদীর নাকি উচিত হয়নি, মাইনরিটি প্রটেকশন নিয়ে কথা বলা; তাঁর উচিত ছিলো, সবার প্রটেকশন দেয়া। খান কি সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি জানেননা? মোদী কী বলেছেন সেটি ভিন্ন কথা; খান কী মনে করেন এ বিষয়ে? তিনি এত কিছু বোঝেন, কিন্তু এটি বোঝেননা যে, তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক সখারা আমাদের স্বাধীনতাকে “হিন্দু-ভারতের” অবদান হিসেবেই দেখে। তাদের জন্য জুলাই আন্দোলনের একটি উদ্দেশ্য অবশ্যই ছিলো হিন্দু নিপীড়ন ও বিতাড়ন।
সলিমুল্লাহ খান জার্গনের আড়ালে নিজেকে ‘চিন্তক’ সাজালেও প্রকৃতপক্ষে তিনি
ক। প্যারানয়েড সাইকোসিসে আক্রান্ত, যিনি সর্বত্র শত্রু খোঁজেন।
খ। মৌলবাদী দর্শনের ধারক, যিনি প্রগতিশীল প্রতীক ধ্বংস করতে চান।
গ। মুল টেক্সট গভীর অধ্যয়নের অভাবজনিত কারনে তিনি আমাদের সংবিধান ও ক্ষমতার বিভাজনের মতো মৌল নীতির ভুল ব্যাখ্যা দেন।
ঘ। তিনি মূলতঃ একজন দ্বিচারী বুদ্ধিজীবী, যিনি অন্যদের খাটো করেন, আর তাঁদের অবদানকে অযথা খাটো করেন।
অতএব, সলিমুল্লাহ খানের কাজ এবং তাঁর চিন্তার মাঝে আসলে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা পাওয়া যায় যেটির উৎস প্যারানয়েড সাইকোসিস; আমরা এটিও দেখিয়েছি যে, এ জাতীয় চিন্তার মানুষেরা প্রতিক্রিয়াশীলতার সাথী হয়ে যায়; খানের কাজ এখন মৌলবাদী এজেন্ডার সহযোগী, আর জার্গনের আড়ালে ইতিহাসের সত্যকে ঢাকতে ব্যস্ত।