লিড নিউজ

জীবনের শেষ লেখায় বহু আক্ষেপ ও প্রশ্ন রেখে গেলেন সাংবাদিক বিভুরঞ্জন

  • 6:43 am - August 23, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১১৮ বার
প্রয়াত সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার। ছবিঃ আজকের পত্রিকা

মেলবোর্ন, ২৩ আগষ্ট- “আমার জীবনে কোনো সাফল্যের গল্প নেই। সাংবাদিক হিসেবেও এ-ডাল ও-ডাল করে কোনো শক্ত ডাল ধরতে পারিনি। আমার কোথাও না কোথাও বড় ঘাটতি আছে। এই ঘাটতি আর কাটিয়ে ওঠা হলো না। দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক।”

এ কথাগুলো সিনিয়র সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের শেষ লেখার অংশ। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নিখোঁজ থাকার পর শুক্রবার মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে তার মরদেহ ভেসে ওঠে। মৃত্যুর আগে তিনি স্থানীয় একটি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন ‘খোলা চিঠি’ নামের দীর্ঘ লেখা, যেখানে নিজের ব্যক্তিজীবনের কষ্ট, কর্মজীবনের হতাশা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা নিয়ে অকপটে লিখেছেন। ফুটনোটে তিনি স্পষ্ট করে লিখেছিলেন—”জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন।”

নিখোঁজ থেকে মৃত্যু

পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে অফিসে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বিভুরঞ্জন। কিন্তু রাতে আর ফেরেননি। ছেলে ঋত সরকার রমনা থানায় জিডি করলে তার খোঁজ শুরু হয়।

শুক্রবার বিকেলে গজারিয়ার বলাকির চর এলাকায় মেঘনা নদীতে ভাসমান এক লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। পরে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে এবং পরিবার শনাক্ত করার পর নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি বিভুরঞ্জনের মরদেহ। শনিবার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার ভাই চিররঞ্জন সরকার বলেন, “ভাইকে নিতে মুন্সিগঞ্জে যাচ্ছি। পোস্টমর্টেম শেষে মরদেহ বুঝে পাব।”

খোলা চিঠিতে নিজের কথা

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে পাঠানো ওই লেখায় বিভুরঞ্জন নিজের জীবনের না-পাওয়া, দুঃখ আর অভিযোগগুলো তুলে ধরেন। সেখানে তিনি ছেলের অসুস্থতা, চাকরি না পাওয়া, মেয়ের পড়াশোনার সমস্যা, সংসারের আর্থিক টানাপোড়েনের কথা বলেন। একইসঙ্গে সাংবাদিকতা জীবনের সীমাবদ্ধতা আর হতাশার কথাও তুলে ধরেন।

তিনি লিখেছেন, “শেখ হাসিনার শাসনামলে অনেক সাংবাদিক সুবিধা নিয়েছেন। প্লটও পেয়েছেন অনেকে। আমিও আবেদন করেছিলাম দুবার, কিন্তু পাইনি। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে বই লিখেও কোনো রয়্যালিটি পাইনি।”

অন্য জায়গায় লিখেছেন, “শুধু মুক্তিযুদ্ধ আর অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষে থাকায় আমাকে আজও ‘আওয়ামী ট্যাগ’ দেওয়া হয়। অথচ আওয়ামী আমলেও কোনো বাস্তব পুরস্কার পাইনি। আজকের পত্রিকায় ৪ বছর ধরে কাজ করছি, বেতন বাড়েনি, পদোন্নতি হয়নি। অথচ বাজারের দাম প্রতিদিন বাড়ছে।”

নিজের লেখায় তিনি শুধু ব্যক্তিগত দুঃখই নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতাও তুলে ধরেছেন। লিখেছেন, “সরকার পরিবর্তনের পর গণমাধ্যমের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা সমালোচনার সুযোগ দিয়েছেন বললেও বাস্তবে তার প্রেস বিভাগ অনেক কিছু আটকায়। সম্পাদকরা আতঙ্কে থাকেন সব সময়। ফোন এলে খবর নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়।”

তিনি অভিযোগ করেন, তার লেখা এবং সহকর্মীদের লেখা নিয়ে সরকারের চাপের মুখে পড়েছে ‘আজকের পত্রিকা’। এক পর্যায়ে তার সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকও কথা বলা বন্ধ করে দেন। এমনকি একটি লেখা প্রত্যাহার করতে হয়েছে চাপের মুখে।

তার ভাষায়, “সব মিলিয়ে পত্রিকায় আমার অবস্থা খুবই নাজুক। মন খুলে লেখার সুযোগ নেই, অথচ সত্য বলা আমাদের দায়িত্ব।”

নিজের আর্থিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, “নামে-বেনামে হাজার হাজার লেখা লিখেছি, কিন্তু সম্মানী পাইনি প্রায় কোথাও। কোনো কোনো পত্রিকা তো কয়েক বছর লেখার পরও টাকা দেয়নি।”

সিঙ্গাপুর সফরের একটি ঘটনা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, “শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে গিয়েছিলাম একবার। কিছু হাতখরচ পেয়েছিলাম। কিন্তু ওই টাকা কোট-টাই-জুতো কিনতেই শেষ হয়ে যায়। সারাজীবন তো স্যান্ডেল পরেই কাটল, ওই সফরে কেবল কোট-প্যান্ট হলো।”

১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া বিভুরঞ্জন সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করেছেন। দৈনিক আজাদ, মাতৃভূমি, সাপ্তাহিক চলতিপত্র, একতা, মৃদুভাষণ—সবখানেই ছিলেন সক্রিয়। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সাপ্তাহিক যায় যায় দিনে ‘তারিখ ইব্রাহিম’ ছদ্মনামে তার রাজনৈতিক লেখা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

শেষ জীবনেও তিনি নিয়মিত লিখতেন সম্পাদকীয়, কলাম আর মতামতের লেখা। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মনে করেছিলেন, তার সংগ্রামের কোনো ফল হয়নি। তার ভাষায়, “আমার জীবনে কোনো সাফল্যের গল্প নেই। সাংবাদিক হিসেবেও কোনো শক্ত ডাল ধরতে পারিনি।”

নিজের লেখা শেষ করেছিলেন এই বাক্যে: “দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক।”

বহু আক্ষেপ, হতাশা, তবু মানুষের সুখ কামনার মধ্যেই শেষ হয় বিভুরঞ্জন সরকারের লেখা। জীবনের শেষ সময়ে তার এ চিঠি এখন সাংবাদিক সমাজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

সুত্রঃ বিবিসি বাংলা

এই শাখার আরও খবর

সিঁদুর খেলতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তন্নি দে

বিয়ের মাত্র চার মাস, নতুন সংসারের স্বপ্ন ও বাবার বাড়িতে প্রথম দুর্গোৎসবের আনন্দ এক নিমেষেই বিষাদে পরিণত হয়েছে। বিজয়া দশমীতে দেবীর কপালে সিঁদুর দিতে গিয়ে…

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, কূটনৈতিক ব্যর্থতার দায় কে নেবে?

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা গণমাধ্যমের খবর থেকে এ ঘটনা জানতে পেরেছেন। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বিষয়টি জানতে…

চোরবাগান মণ্ডপে থ্রিডি স্ক্যান ফরেনসিক দলের, নকশা ও প্রবেশপথ খতিয়ে দেখছে সিট

কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ঘটনাস্থল থ্রিডি স্ক্যান করেছে ফরেনসিক দল। মণ্ডপের নকশা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথের প্রস্থ এবং দর্শনার্থীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা…

রাহুল আনন্দের গানে মুখর হবে সিডনির বিজয়া সম্মিলন ২০২৬

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: বিজয়ার শুভেচ্ছা, বাংলা গান ও সম্প্রীতির আবহে সিডনিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘বিজয়া সম্মিলন ২০২৬’। শনিবার, ১৪ নভেম্বর ক্যাম্পসির ওরিয়ন ফাংশন সেন্টারে আয়োজিত…

সৌদিতে ৬ মাসে ৫৯ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, আছেন বাংলাদেশিও

চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫৯ জনই বিদেশি নাগরিক। এই তালিকায় বাংলাদেশের নাগরিকও…

হরমুজে অনুমোদনহীন পথে জাহাজ চললে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার হুমকি ইরানের

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অনুমোদনহীন পথে জাহাজ চলাচলের চেষ্টা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au