সিঁদুর খেলতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তন্নি দে
বিয়ের মাত্র চার মাস, নতুন সংসারের স্বপ্ন ও বাবার বাড়িতে প্রথম দুর্গোৎসবের আনন্দ এক নিমেষেই বিষাদে পরিণত হয়েছে। বিজয়া দশমীতে দেবীর কপালে সিঁদুর দিতে গিয়ে…
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা গণমাধ্যমের খবর থেকে এ ঘটনা জানতে পেরেছেন। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বিষয়টি জানতে পারেনি বলে জানিয়েছে। অথচ সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো বন্দিদের তালিকায় তাঁদের নাম ছিল। তাহলে তাঁদের মামলা সম্পর্কে খোঁজ নিল না কেন বাংলাদেশের মিশন? মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা হলো না কেন? প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ বিদেশের মাটিতে তাঁদের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে আজ সবাই হতবাক।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। এরপর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এবং ঘটনার বিস্তারিত জানতে চায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ ৩০ সেপ্টেম্বর জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেটে বন্দিদের একটি তালিকা পাঠিয়েছিল। সেখানে দুই বাংলাদেশির নাম ও তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের উল্লেখ ছিল। কিন্তু তাঁদের সাজার বিষয়ে তথ্য ছিল না বলে জানানো হয়েছে।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বন্দিদের তালিকায় নাম থাকার পরও সংশ্লিষ্ট মিশন তাঁদের মামলার অগ্রগতি জানতে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিল কি না। গুরুতর অভিযোগে আটক দুই নাগরিকের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা কি মিশনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির তথ্য আদান-প্রদান ও কূটনৈতিক যোগাযোগে ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ব্যাখ্যা চাওয়াই কি যথেষ্ট? আগেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছি।
বিদেশে আটক কোনো বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অভিযোগের প্রকৃতি যা-ই হোক, ন্যায্য বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে প্রতিটি আইনি সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়েছে কি না, তা জানা প্রয়োজন।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত নজরুল ও সিথি আখতারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, উপস্থাপিত প্রমাণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁদের আইনজীবী ও দোভাষীর সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তাই তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে এসব তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সরকারের সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত ছিল।
রিপ্রিভ ও ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদি আরবে ১৬ জন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে আরও একজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। অর্থাৎ, বিদেশে বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি নতুন নয়। অথচ প্রতিটি ঘটনায় কার্যকর কূটনৈতিক ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু প্রবাসীরা কেবল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস নন। তাঁরা রাষ্ট্রের নাগরিকও। তাঁদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, আইনি অধিকার রক্ষা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দি হস্তান্তর চুক্তি নেই। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময়, বন্দিদের মামলা অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর জনবল, আইনি দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে।
আমার বক্তব্য স্পষ্ট, কোনো নাগরিক অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেই তাঁকে রাষ্ট্রের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যায় না। অভিযোগের বিচার করবে আদালত। কিন্তু নাগরিকের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সরকারের উচিত দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে মিশনকে অবহিত করা হয়েছিল কি না তা অনুসন্ধান করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পর্যালোচনা করা। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি প্রমাণিত হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রহণে রাষ্ট্র যতটা আগ্রহী, তাঁদের জীবন ও অধিকার রক্ষায়ও ততটাই দায়িত্বশীল হতে হবে। সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে প্রবাসীদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির সাফল্যের আড়ালে নাগরিক সুরক্ষার ব্যর্থতা থেকেই যাবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au