সর্বশেষ

আবারও ১৪ ডিসেম্বরের ছায়া: স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উল্লম্ফন ও বুদ্ধিজীবী নিধনের মেটিকিওলাস ডিজাইন

  • 5:06 pm - August 30, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১০২ বার
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৩০ আগষ্ট- “আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর; আমার হাতে সংবিধান; আমার গায়ে হাত তুলবেননা”— চিৎকার দিয়ে বলছিলেন প্রফেসর কার্জন, দু’হাত তুলে, সংবিধানের কপি দেখিয়ে মবের উদ্দেশ্য; লাভ হয়নি কিছু; সাংবাদিক পান্নাও ছিলেন সেখানে; তিনিও হাত তুলে জানান দিচ্ছিলেন অসুরের বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহ; প্রায়ই তিনি টক-শো’তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সংবিধান এসব নিয়ে কথা বলেন; এ কারনেই আজ এ পরিণতি; কার্জনের হাতের সংবিধানকে জ্বালিয়ে, পান্নার বিদ্রোহকে নির্মূল করে পাকিস্তানী রাজাকারীয় দর্শন প্রতিষ্ঠার জন্যই আজকের মবসন্ত্রাসী  জঙ্গিরা  তাঁদের দু’জনসহ  সম্প্রতি বাংলাদেশের পনেরো থেকে আঠারো জন মুক্তিযোদ্ধা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাংবাদিকের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে; এ ঘটনা দেশের মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তির ওপর আরেকটি দুঃখজনক আঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইলো। চরম বিস্ময়ের বিষয় হলো—যারা মবের হাতে আহত হয়েছেন, তাঁদেরই পরে “সন্ত্রাসবিরোধী আইনে” গ্রেপ্তার করা হয়েছে; অথচ হামলাকারীরা রয়ে গেছে অক্ষত। এ ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়, কীভাবে ধীরে ধীরে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তির ওপর প্রাধান্য বিস্তার করছে—যার ঐতিহাসিক প্রতিধ্বনি রয়েছে ১৯৭১-এর অভিজ্ঞতায়।

১। মব সহিংসতা: প্রতিপক্ষ দমনের অস্ত্র

বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে মব সহিংসতার ব্যবহার নতুন কিছু নয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনারা তাদের স্থানীয় দোসর—রাজাকার, আলবদর ও আলশামস—দিয়ে ভয়ঙ্করভাবে বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, অধ্যাপক ও সংস্কৃতিকর্মীদের টার্গেট করেছিল। মুক্তিকামী জাতির চেতনাকে ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল সেই অভিযানের চূড়ান্ত প্রকাশ।

আজকের মব—মৌলবাদী, স্বাধীনতাবিরোধী এবং সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত—সেই একই কৌশল পুনরাবৃত্তি করছে। মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীদের আক্রমণের মাধ্যমে তারা স্বাধীনতার চেতনাকে বহনকারী কণ্ঠগুলোকে স্তব্ধ করতে চায়। অথচ রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার পরিবর্তে এই কণ্ঠগুলোকেই এখন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। “সন্ত্রাসবিরোধী আইন” দিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো এক ভয়াবহ উল্টে যাওয়া—যেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও অধ্যাপককে বলা হচ্ছে “সন্ত্রাসী,” আর প্রকৃত হামলাকারীরা রয়ে যাচ্ছে নিরাপদে।

চার্লস টিলি একবার বলেছিলেন, সহিংসতা হলো রাজনীতির চূড়ান্ত রূপ আজকের প্রেক্ষাপটে সহিংসতা কেবল ভয় দেখানোর হাতিয়ার নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টানোর মাধ্যম—কে “রক্ষক” আর কে “শত্রু,” তার সংজ্ঞা নতুন করে লিখে দেওয়ার পদ্ধতি।

২। নীরবতার বিশ্বাসঘাতকতা: ১৯৭১ থেকে ২০২৫

বাংলাদেশের ইতিহাসে নীরবতা অনেক সময় রক্তাক্ত পরিণতির কারণ হয়েছে। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি সেনারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করছিল, তখনও কিছু বুদ্ধিজীবী প্রকাশ্যে বা নীরবে দখলদার বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ এমনকি বিবৃতি দিয়েছিলেন পাকিস্তানি হানাদারদের সমর্থনে। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো—চৌদ্দই ডিসেম্বরের রাতে আলবদর বাহিনী যেসব অধ্যাপক, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে ধরে নিয়ে যায়, তাঁদের মধ্যে কয়েকজনও ছিলেন যারা যুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানি সেনাদের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরাও হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাননি।

আজকের “ইউনিভার্সিটি নেটওয়ার্ক” এর “বিখ্যাত” শিক্ষকদের নীরবতা সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি। তাঁদের অনেকেই অতীতে আওয়াজ তুলেছিলেন—“আসমান কাঁপবে” বলে; অতীতে আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন। অথচ আজ মুক্তিযোদ্ধা, সহকর্মী অধ্যাপক ও সাংবাদিকদের ওপর মব হামলার প্রতিবাদে তাঁরা চুপ। যখন সংবিধান আক্রান্ত, স্বাধীনতার প্রতীক আক্রান্ত, তখন তাঁদের মানববন্ধন নেই, বিবৃতি নেই, প্রতিবাদ নেই।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই নীরব শিক্ষকদের কারো কারো ছবি আজকাল দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধীদের তৈরী তথাকথিত “জুতা-মারা লিস্টে”—অর্থাৎ যেসব তালিকায় জনগণের “ক্ষোভ” প্রতিফলিত হয় বলে বলা হচ্ছে। অথচ এঁদেরই কেউ কেউ কয়েকদিন আগেও মব-সমর্থক ড. ইউনুসকে শর্তহীন সমর্থন দিতে আহ্বান করেছিলেন। আজ যখন তাঁদের সহকর্মী আক্রান্ত, তখন তাঁরা সুবিধাবাদের চরম উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। অ্যান্টোনিও গ্রামশি  বলেছিলেন, সমাজে হেজেমনি প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা শাসকগোষ্ঠীর আধিপত্যকে বৈধতা দেয়। সেটিই এখন ঘটছে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে—নীরবতার শেষ পরিণতি ভয়াবহ। যেমন ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানপন্থী বিবৃতিদাতারাও বাঁচতে পারেননি, তেমনি আজকের নীরবদেরও একদিন মব আঘাত করবে।

 

৩। কিছু ঘটনা ও পর্যবেক্ষনঃ

  • ২৬ আগস্ট ২০২৫: ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকদের ওপর মব হামলা; ১৫–১৮ জন আহত; গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে চারজন মুক্তিযোদ্ধা, পাঁচজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ছয়জন সাংবাদিক।এঁদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার করা হয় যখন তাঁরা স্বাধীনতার পক্ষে একটি সেমিনারে অংশ নিচ্ছিলেন।
  • প্রত্যক্ষদর্শীর রিপোর্ট: হামলাকারীরা স্বাধীনতাবিরোধী স্লোগান দিয়েছিল, মুক্তযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীদের শারিরিকভাবে আঘাত করেছিলো, কিন্তু পুলিশের চার্জশিটে তাদের নাম নেই।
  • এর আগে মবের মাধ্যমে গ্রেফতার করা হয় অর্থনীতির প্রথিতযশা অধ্যাপক আবুল বারাকাত।
  • এর কিছুদিন পরই গ্রেফতার হন অধ্যাপক কলিমুল্লাহ যিনি পাঁচ আগষ্টের যে তথাকথিত অভ্যুত্থান সেটির সমর্থক ছিলেন, কিন্তু এ ঘটনার পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের উল্লম্ফন দেখে এদের সমালোচনা করা শুরু করেছিলেন বিবেকের তাড়নায়; এর ফলাফল হল তাঁর গ্রেফতার।
  • বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা এবং স্বাধীনতার পক্ষালম্বনকারী শিক্ষকদের ঠিকমত কাজ করতে বা তাঁদের অফিসে আসতে দেয়া হছেনা।
  • কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পদোন্নতি থামিয়ে দেয়া হচ্ছে মব করে।
  • শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কলেজ ও স্কুলের প্রগতিশীল শিক্ষকদের ওপর নেমে এসেছে দমন এবং নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা।
  • পাকিস্তান আমলে সরকারী গুপ্তচর সংস্থার ও সরকারী এজেন্সীর সহায়তায় প্রগতিশীল শিক্ষকদের তালিকা তৈরী করে তাঁদের ওপর দমন ও নিপীড়ন চালানো হতো; এর চরম ফলাফল একাত্তোরে সেই তালিকা ধরে এবং তালিকার বাইরেও বুদ্ধিজীবী হত্যা, কারন এঁরা বেঁচে থাকলে একটি জাতি বেঁচে থাকে তার ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে।
  • ঐতিহাসিক প্রতিধ্বনি: ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা বা মেটিকিওলাস ডিজাইন ফিরে আসছে নাতো?

৪। আন্তর্জাতিক মিল: প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি একা নয়; বিশ্ব ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে মুক্তি-সংগ্রামের পর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান।

  • ইন্দোনেশিয়া (১৯৬৫–৬৬): সিআইএ-সমর্থিত মব ও সেনারা হাজারো বামপন্থী বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল। “Jakarta Method” নামে পরিচিত এ গণহত্যা আজকের বাংলাদেশের মব + আইন জোটের সাথে ভীতিকর মিল রাখে।
  • পাকিস্তান (১৯৭৭): জিয়াউল হক গণতান্ত্রিক শক্তিকে উৎখাত করে ইসলামপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি কায়েম করেন; বুদ্ধিজীবীরা হয় চুপ হয়ে যায়, নয়তো প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
  • মিশর (২০১৩): আরব বসন্তের পর সেনা অভ্যুত্থানে মুসলিম ব্রাদারহুড দমন হয়; কিন্তু পরে সামরিক শাসন আবারো স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের স্বপ্নকে ধ্বংস করে; এখানেও বুদ্ধিজীবিদের ভুমিকা কাপুরোষোচিত।
  • তুরস্ক (১৯৮০ ও পরবর্তীতে): সামরিক অভ্যুত্থান ও এরদোয়ানের শাসন প্রমাণ করে কীভাবে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরেও রাষ্ট্রকে কব্জা করে ফেলে; সেখানেও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবিরা নীরবতার নীতি গ্রহন করেছিলেন; ফলাফল আমরা জানি।
  • ইরান (১৯৭৯–৯০): বুদ্ধিজীবীদের খোমেনি-সমর্থন ও পরে নীরবতা → বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, সাংস্কৃতিক বিপ্লব, “চেইন মার্ডার্স।” ভিন্নমত বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল করে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের পথে নিয়ে যাওয়া।

ইরানের ঘটনা নিয়ে আরেকটু বিবরণ দেয়া যেতে পারে।

৫। ইরান: বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন, পরবর্তী নীরবতাআর তার পরিণাম

  • ইরানে ১৯৭৮–৭৯ সালের বিপ্লবে দেশের অনেক লেখক, ছাত্রনেতা ও ধর্মীয়-বামপন্থী বুদ্ধিজীবী—এমনকি পশ্চিমের কিছু প্রভাবশালী চিন্তকও—খোমেনির নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকে মুক্তির প্রকল্প হিসেবে দেখেছিলেন। মিশেল ফুকো তৎকালীন প্রতিবাদের অনুকূলে ধারাবাহিক প্রতিবেদন লেখেন; গবেষক জ্যানেট আফারি ও কেভিন বি. অ্যান্ডারসনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সমর্থন “রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতা”র খোঁজে ফুকোর ভাবনারও মোড় ঘুরিয়েছিল। (University of Chicago Press, Janet Afary)
  • কিন্তু ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পর দ্রুতই আসে “Cultural Revolution”—১৯৮০–৮৩ জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, সিলেবাস ও বই “ইসলামাইজড,” হাজারো শিক্ষার্থী-শিক্ষককে ছাঁটাই/বহিষ্কার, এবং নিয়োগ-ভর্তিতে কড়া আদর্শিক স্ক্রিনিং। উচ্চশিক্ষায় ভিন্নমতকে কাঠামোগতভাবে নিষ্ক্রিয় করার এই নীতিকে একাডেমিক স্বাধীনতার বড় ধাক্কা হিসেবে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। (Association for Iranian Studies, AAUP, Wikipedia)
  • নব্বইয়ের দশকে এর ধারাবাহিকতা দেখা যায় চেইন মার্ডার্স–এ—দলিল-লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের টার্গেটেড হত্যায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা যন্ত্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে; ১৯৯৮ সালে বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে বড় কেলেঙ্কারিতে পরিণত হয়। (PBS, IranWire, RadioFreeEurope/RadioLiberty)
  • শিক্ষা: বিপ্লবের মুহূর্তে যাঁরা “নৈতিক কর্তৃত্ব” হিসেবে বিপ্লবকে সমর্থন করেছিলেন বা পরে নীরব হয়েছিলেন, তার অবকাশই ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়-জ্ঞানভিত্তি পুনর্গঠনে ও ভিন্নমত সাফাইয়ে—অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতিক আধিপত্য স্থাপনে। (Association for Iranian Studies, AAUP)

ইরানের ঘটনাটির প্রতিফলন দেখা যায় ইতিহাসের আরো কিছু পর্বে।

কেন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বুদ্ধিজীবীদের টার্গেট করেপ্রমাণিত ধারা

  • ) নাৎসি জার্মানি (১৯৩৩৪৫):
    ক্ষমতায় এসেই ছাত্র সংগঠন-সমর্থিত বইপোড়ানো অভিযানে “অ-জার্মান” (ইহুদি, মার্ক্সবাদী, শান্তিবাদী ইত্যাদি) লেখকদের রচনাকে জনসমক্ষে দাহ করা হয়—এটি ছিল জ্ঞানক্ষেত্র দখলের প্রতীকী সূচনা; পরবর্তীতে পদ্ধতিগত নিপীড়ন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অপসারণ, নির্বাসন। (Holocaust Encyclopedia, Nsdoku München, EBSCO)
  • ) মুসোলিনির ইতালি (১৯২২৪৩):
    কমিউনিস্ট নেতা-চিন্তক অ্যান্টোনিও গ্রামশিকে ১৯২৬ সালে গ্রেপ্তার করে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ২০ বছর কারাদণ্ড দেয়; সরকারি কৌঁসুলির কুখ্যাত উক্তি—“এই মস্তিষ্কটাকে বিশ বছর বন্ধ রাখতে হবে”—ফ্যাসিবাদী প্রকল্পে বুদ্ধিজীবী-নিবর্তনের লক্ষ্য স্পষ্ট করে। (Stanford Encyclopedia of Philosophy, Encyclopedia Britannica)
  • ) বাংলাদেশ (১৯৭১):
    পাকিস্তানি সেনা ও স্থানীয় দোসর আলবদর/রাজাকার/আলশামস পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ-হত্যা করে; ১৪ ডিসেম্বর—বিজয়ের দুদিন আগে—শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাহিত্যিকদের টার্গেটেড হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে জাতির মেধাভিত্তি ভাঙার চেষ্টা হয়। আজও ১৪ ডিসেম্বর “শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস” পালিত হয়।
  • ) ইরান (১৯৮০৯৮):
    বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ-পurge থেকে শুরু করে চেইন মার্ডার্স—ধাপে ধাপে ভিন্নমত বুদ্ধিজীবীদের অকার্যকর/নির্বাপিত করা হয়। (Association for Iranian Studies, PBS)

হিটলার-মুসোলিনি থেকে ১৯৭১-এর বাংলাদেশ ও খোমেনি-উত্তর ইরান—সর্বত্রই প্রতিক্রিয়াশীল শাসন প্রথমে জ্ঞানক্ষেত্র দখল করে, বই-পাঠ-বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ করে, ভিন্নমত বুদ্ধিজীবীদের জেলে/নির্বাসনে/খুনে ঠেলে দেয়। উদ্দেশ্য একটাই—সমাজের সমালোচনামূলক ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া

বাংলাদেশ আজ একই ধারা অনুসরণ করছে: মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তির ওপর আঘাত, প্রতিক্রিয়াশীলদের উত্থান, এবং রাজাকার মতাদর্শকে স্বাভাবিক করা।

৭। গৃহযুদ্ধসদৃশ পরিস্থিতি

আজকের বাংলাদেশ মূলত এক ধরনের গৃহযুদ্ধসদৃশ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামরিক অর্থে নয়, বরং সমাজতাত্ত্বিক অর্থে—“বিভক্ত সার্বভৌমত্বের” পরিস্থিতি। মুক্তিযুদ্ধপন্থী শক্তি (মুক্তিযোদ্ধা, প্রগতিশীল অধ্যাপক, সাংবাদিক) এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি (মৌলবাদী, রাজাকার-উত্তরসূরি নেটওয়ার্ক, সুযোগসন্ধানী এলিট) মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দেশের আদর্শিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।

হান্না আরেন্ট The Origins of Totalitarianism–এ লিখেছিলেন—সহিংসতাপ্রবণ শাসনব্যবস্থা বৈধতা ও অবৈধতার সীমানা মুছে দেয়; ভুক্তভোগীদের অপরাধী বানায়, আর অপরাধীদের ছাড় দেয়। আমরা আজ ঠিক সেটিই দেখছি: রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো ব্যবহৃত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাহকদের বিরুদ্ধে, আর হামলাকারীরা পাচ্ছে অব্যাহতি।

ব্যারি পোজেন তাঁর “Fragmented Sovereignty” ধারণায় দেখিয়েছেন, যখন রাষ্ট্র দ্বিখণ্ডিত ক্ষমতার মধ্যে পড়ে, তখন সেটি গৃহযুদ্ধসদৃশ হয়। বাংলাদেশ আজ সেই অবস্থার কাছাকাছি।

 

উপসংহার: প্রতিরোধের ডাক

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি এক বৃহত্তর কৌশলের অংশ। মব সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় নীরবতা, এবং বুদ্ধিজীবী দমনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ধীরে ধীরে রাজাকার মতাদর্শকে স্বাভাবিক করছে। ১৯৭১-এর শিক্ষা স্পষ্ট; অন্যায়ের মুখে নীরবতা কেবল নির্যাতনকারীকে শক্তিশালী করে। স্বাধীনতার চেতনা রক্ষার জন্য জাতিকে এই ভুক্তভোগী–অপরাধী উল্টোপাল্টাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, মব ও তাদের রক্ষকদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, এবং একবিংশ শতকে রাজাকার শাসনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

 

পূর্ণ রেফারেন্স তালিকা

. Canfora, L. (1990). The vanished library: A wonder of the ancient world. University of California Press.

. Gibbon, E. (1776–1789). The history of the decline and fall of the Roman Empire (Vols. 5–6).

. Lewis, B. (2002). The Arabs in history. Oxford University Press.

. Gutas, D. (1998). Greek thought, Arabic culture: The Graeco-Arabic translation movement in Baghdad and early ‘Abbasid society. Routledge.

. Thapar, R. (2004). Early India: From the origins to AD 1300. University of California Press.

. Digby, S. (1971). War-horse and elephant in the Delhi Sultanate: A study of military supplies. Oxford University Press.

. Chattopadhyaya, D. (1977). Science and society in ancient India. People’s Publishing House.

. Marshall, J. (1940). The monuments of Sanchi. Government of India.

. Morgan, D. (1986). The Mongols. Blackwell Publishing.

১০. Lyons, J. (2009). The house of wisdom: How the Arabs transformed Western civilization. Bloomsbury Press.

১১. Menocal, M. R. (2002). The ornament of the world: How Muslims, Jews, and Christians created a culture of tolerance in medieval Spain. Little, Brown.

১২. Watt, W. M. (1965). A history of Islamic Spain. Edinburgh University Press.

১৩. Coe, M. D. (2005). The Maya. Thames & Hudson.

১৪. Restall, M. (2003). Seven myths of the Spanish conquest. Oxford University Press.

১৫. Afary, J., & Anderson, K. B. (2005). Foucault and the Iranian revolution: Gender and the seductions of Islamism. University of Chicago Press.

১৬. Abrahamian, E. (2008). A history of modern Iran. Cambridge University Press.

১৭. Axworthy, M. (2013). Revolutionary Iran: A history of the Islamic Republic. Oxford University Press.

১৮. Shirer, W. L. (1960). The rise and fall of the Third Reich. Simon & Schuster.

১৯. Paxton, R. O. (2005). The anatomy of fascism. Vintage.

২০. Forgacs, D. (Ed.). (2000). The Antonio Gramsci reader: Selected writings, 1916–1935. NYU Press.

২১. Rummel, R. J. (1998). Statistics of democide: Genocide and mass murder since 1900. Routledge.

২২. Bose, S. (2011). Dead reckoning: Memories of the 1971 Bangladesh war. Hurst.

২৩. Jahan, R. (1972). Pakistan: Failure in national integration. Columbia University Press.

২৪. Mookherjee, N. (2015). The spectral wound: Sexual violence, public memories, and the Bangladesh war of 1971. Duke University Press.

২৫. Tilly, C. (2003). The politics of collective violence. Cambridge University Press.

২৬. Gramsci, A. (1971). Selections from the prison notebooks. International Publishers.

২৭. Arendt, H. (1951). The origins of totalitarianism. Harcourt.

২৮. Bevins, V. (2020). The Jakarta method: Washington’s anticommunist crusade and the mass murder program that shaped our world. PublicAffairs.

২৯. Posen, B. R. (1993). The security dilemma and ethnic conflict. Survival, 35(1), 27–47. https://doi.org/10.1080/00396339308442672

৩০. Association for Iranian Studies. (n.d.). About the organization. Retrieved from https://en.wikipedia.org/wiki/Association_for_Iranian_Studies

৩১. American Association of University Professors (AAUP). (n.d.). About AAUP. Retrieved from https://en.wikipedia.org/wiki/American_Association_of_University_Professors

৩২. PBS Frontline. (2009, December 14). The chain murders: Killing dissidents and intellectuals, 1988–1998. Retrieved from https://www.pbs.org/wgbh/pages/frontline/tehranbureau/2009/12/the-chain-murders-1988-1998.html

৩৩. IranWire. (2018, November 30). The chain murders of dissidents. Retrieved from https://iranwire.com/en/features/65674

৩৪. Radio Free Europe/Radio Liberty (RFE/RL). (2020, December 12). Two decades later, still no justice for Iran’s ‘chain murders’ of intellectuals. Retrieved from https://www.rferl.org/a/two-decades-later-still-no-justice-for-iran-chain-murders-of-intellectuals/30997536.html

৩৫. United States Holocaust Memorial Museum. (n.d.). Nazi book burnings. In Holocaust Encyclopedia. Retrieved from https://encyclopedia.ushmm.org/content/en/article/book-burning

৩৬. NSDoku München. (n.d.). The book burnings in Germany and in Munich. Retrieved from https://www.nsdoku.de/en/historic-site/koenigsplatz/book-burnings-1933

৩৭. EBSCO. (n.d.). Nazi book burnings. Research Starters: History. Retrieved from https://www.ebsco.com/research-starters/history/nazi-book-burnings

৩৮. Stanford Encyclopedia of Philosophy. (2023). Antonio Gramsci. Retrieved from https://plato.stanford.edu/entries/gramsci/

৩৯. Encyclopedia Britannica. (n.d.). Gramsci, Antonio. Retrieved from https://www.britannica.com/biography/Antonio-Gramsci

 

এই শাখার আরও খবর

জম্মু-কাশ্মীরের অনন্তনাগে সন্ত্রাসী হামলায় পুলিশ সদস্য নিহত

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- জম্মু ও কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলের অনন্তনাগ জেলায় সন্ত্রাসী হামলায় এক পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। বুধবার (২২ জুলাই ২০২৬) দুপুরে এই হামলার ঘটনা ঘটে।…

জেনেরিক ওষুধে ২০০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা ট্রাম্পের, সবচেয়ে বড় ধাক্কার শঙ্কায় ভারত

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া সব ধরনের জেনেরিক ওষুধের ওপর ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও…

বার্ষিক সাধারণ সভা শেষে বিএসপিসির নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই: অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি ফর পূজা অ্যান্ড কালচার ইনকরপোরেটেড (BSPC)-এর বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) ২০২৬ অনুষ্ঠিত…

অমিত শাহ-ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে ভারতের পার্লামেন্ট উত্তাল

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষার্থী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে কংগ্রেসের বিক্ষোভের…

দ্বিতীয় দিনেও উত্তাল দিল্লি, বাধা ডিঙিয়ে জড়ো হচ্ছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলন এখন দেশীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার, স্বচ্ছতা নিশ্চিত…

জর্দানে নিখোঁজ মার্কিন সেনাকে মৃত ঘোষণা, নিহত বেড়ে ১৮

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর জর্দানে নিখোঁজ থাকা আরও এক মার্কিন সেনাসদস্যকে মৃত বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন)। এর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au