ঢাকাসহ পাঁচ জেলায় জাতীয় পার্টির (জাপা) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ছবিঃ সংগ্রর
মেলবোর্ন, ৩১ আগষ্ট- বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত পাঁচ জেলায় জাতীয় পার্টির (জাপা) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার রাজধানীতে সংঘর্ষে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানসহ দলটির কয়েকজন আহত হওয়ার প্রতিবাদে গতকাল সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে গণঅধিকার পরিষদ। এর মধ্যেই ঢাকাসহ অন্তত পাঁচটি জেলায় জাপার কার্যালয়ে এই হামলার ঘটনা ঘটে।
জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী অভিযোগ করেছেন, গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরাই এই হামলার জন্য দায়ী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবারের ঘটনার জেরে দলটির কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানান।
অন্যদিকে গুরুতর আহত নুরুল হক নুরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর মাথায় আঘাত লেগেছে এবং নাকের হাড় ভেঙে গেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলেও তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তাঁর চেতনা ফিরেছে, তবে চিকিৎসকরা বলছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার আগে তাঁকে আশঙ্কামুক্ত বলা যাবে না। এ জন্য একটি মেডিকেল বোর্ডও গঠন করা হয়েছে।
শুক্রবারের সংঘর্ষের পর গণঅধিকার পরিষদ রাতে রাজধানীতে মশাল মিছিল করে। এরপর ব্রিফিং করতে গেলে পুলিশের লাঠিপেটায় নুর গুরুতর আহত হন বলে দাবি দলের নেতাদের। এ ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও মিছিল হয়েছে। ঢাকার কাকরাইল, ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীতে জাপার কার্যালয়ে ভাঙচুরের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগ করা হয়। খুলনার কার্যালয়ে হামলার চেষ্টা হলে পুলিশ লাঠিপেটা করে তা ছত্রভঙ্গ করে।
এদিকে ঢাকার উত্তরায় জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স গ্রুপ। তারা নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে জি এম কাদেরকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। ঘটনার পর তাঁর বাসার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
রাজধানীর বিজয়নগরে বিকেলে গণঅধিকার পরিষদের বিক্ষোভে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আল-রাজী কমপ্লেক্সের সামনে সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালানো হয়। নেতা-কর্মীরা স্লোগান দেন জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে। দলের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান সমাবেশে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন—অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা। তিনি অভিযোগ করেন, নুরকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছে এবং এর বিচার না হলে জনগণই বিচার করবে।
সমাবেশ শেষে মিছিল পল্টন, প্রেসক্লাব, মৎস্য ভবন হয়ে কাকরাইলের দিকে গেলে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশ জাপার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিলে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে তারা একটি স্টোররুমে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
এর আগে ‘জুলাই মঞ্চে’র কর্মীরা হুলিয়া মিছিল বের করে। ব্যানারে লেখা ছিল—“জাতীয় পার্টিসহ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের শত্রুদের বিরুদ্ধে হুলিয়া মিছিল।” তারা স্লোগান দেন নুরের ওপর হামলার বিচার চেয়ে।
রমনা থানার ওসি (অপারেশন) আতিকুল ইসলাম খন্দকার জানান, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে আছে। জাতীয় পার্টির শতাধিক নেতা-কর্মী কার্যালয়ে অবস্থান করলেও পুলিশ তাদের বাইরে বসতে দেয়নি। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, যা পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখবে।
নুরের ওপর হামলার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দ্রুত আরোগ্য কামনা করে আইনি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মোহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধি নুরকে দেখতে হাসপাতালে যান। তাঁরা মনে করেন, এই ঘটনায় দুরভিসন্ধি থাকতে পারে, যা সরকারকে উদ্ঘাটন করতে হবে।
ঢাকার বাইরে রাজশাহীতে জাপার জেলা ও মহানগর কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে অংশ নেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। চট্টগ্রাম নগরীতে সড়ক অবরোধ ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, খুলনা, মুন্সিগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জেও বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সড়কে আগুন জ্বালানো, মহাসড়ক অবরোধ এবং সংঘর্ষের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।