বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা: এশিয়ার শীর্ষে খেলাপি ঋণ । ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন ৫ সেপ্টেম্বর- বাংলাদেশ এখন এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের দেশ। ২০২৪ সালে দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন “ননপারফর্মিং লোনস ওয়াচ ইন এশিয়া ২০২৫”-এ এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি। মাত্র এক বছরে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ১১ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট, যা এশিয়ায় অস্বাভাবিক একটি প্রবৃদ্ধি।
২০২৩ সালে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অথচ ২০২০ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৭ শতাংশ; ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ শতাংশ। মাত্র চার বছরে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে এই অনুপাত।
প্রতিবেশী দেশগুলোতে উন্নতি
এডিবির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো খেলাপি ঋণ কমাতে সক্ষম হয়েছে।
- ভারত ২০২৩ সালে খেলাপি ঋণ ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে নামিয়ে এনেছে ২ দশমিক ৫ শতাংশে। তারা বড় ধরনের ব্যাংক সংস্কার করেছে।
- পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও খেলাপি ঋণের চাপ কিছুটা সামলাতে পেরেছে।
- নেপালে সামান্য বৃদ্ধি হলেও (০.৯ শতাংশ) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।
২০২৩ সালে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ দেশ মিলিয়ে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার, যা এশিয়ার মোট খেলাপি ঋণের ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে এ অঙ্ক আগের বছরের তুলনায় কমেছে। শুধু বাংলাদেশে উল্টো চিত্র—খেলাপি ঋণ দিন দিন বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শিথিল নিয়মকানুন, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং আগের সরকারের দায়বদ্ধতার অভাবেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন—
“আগের সরকার নিয়ম শিথিল করে রেখেছিল। বড় ব্যবসায়ীদের ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করা হতো, যেন প্রকৃত খেলাপি চিত্র প্রকাশ না পায়। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করছে। নিয়ম যত কড়া হবে, খেলাপি ঋণ তত বাড়বে।”
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, সানেম, বলেন—
“ভারতের মতো বাংলাদেশকেও কঠোর সংস্কার ও নিয়ম প্রয়োগ করতে হবে। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবর্তন নয়, আইন শক্তিশালী করা, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং সবচেয়ে বড় কথা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা দরকার।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বা দুর্নীতির মামলায় জড়িত। এ ঋণ যদি আদায় না হয়, তাহলে খেলাপি ঋণের অঙ্ক আরও বাড়বে।
এডিবির পরামর্শ
এডিবি বলছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা খেলাপি ঋণ আরও বাড়াতে পারে। বিশেষত যেসব দেশ ঋণনির্ভর বা বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে।
সমস্যা সমাধানে এডিবির প্রস্তাব:
- কঠোর আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন
- বাজারব্যবস্থার সংস্কার ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি
- বিচারব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো
- বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখনই যদি কাঠামোগত সংস্কার না করা হয়, তবে শুধু ব্যাংক খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিই গভীর সংকটে পড়তে পারে।