স্মৃতিতে অমর সালমান শাহ ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৬ সেপ্টেম্বর- বাংলা চলচ্চিত্রে সালমান শাহ যেন এক ধূমকেতু। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ার, অথচ আলো ছড়িয়েছেন এতটাই উজ্জ্বলভাবে যে মৃত্যুর তিন দশক পরও তিনি বাঙালির হৃদয়ে সমান জনপ্রিয়। স্বল্প সময়ে ১৯টি ছবি মুক্তি পায় তাঁর অভিনীত, মৃত্যুর পর আরো আটটি। সব মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭।
তবে মৃত্যুকালে তিনি রেখে যান বেশ কিছু অসমাপ্ত ছবি। কোনো ছবির শুটিং শেষ হয়েছিল প্রায়, কোথাও ৯০ শতাংশ, কোথাও ৬০-৫০ শতাংশ, আবার কোথাও মাত্র দুই দিনের শুটিং করা হয়েছিল। সালমানের আকস্মিক চলে যাওয়ায় ছবিগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কিন্তু দর্শকের আগ্রহ এতটাই প্রবল ছিল যে, নির্মাতারা ডামি ব্যবহার করে, গল্প কেটে-ছেঁটে কিংবা অন্য অভিনেতাকে এনে ছবিগুলো সম্পন্ন করেন।
অসমাপ্ত ছবিগুলোর গল্প
‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘মন মানে না’, ‘শুধু তুমি’, ‘প্রেমের বাজি’, ‘ঋণ শোধ’সহ বহু ছবি সালমানের অসমাপ্ত অবস্থায় রয়ে গিয়েছিল। কোনো ছবিতে গান বা কয়েকটি দৃশ্যের ডাবিং করতে পারেননি, আবার কোনো ছবিতে মোটে ৩০ শতাংশ শুটিং করেছিলেন। তবু সেগুলো শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সাফল্যও পেয়েছিল।
দর্শক তখন এসব অসংগতি টের পেলেও সালমান শাহর জনপ্রিয়তার কারণে সেগুলো খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। এমনকি এক ছবির গানের দৃশ্য আরেক ছবিতে বিক্রি হয়ে ব্যবহৃত হতো, তবু ছবিগুলো চলত।
প্রশ্ন উঠছে—বর্তমান প্রযুক্তির যুগে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায়, কি সালমান শাহর অসমাপ্ত ছবিগুলো নতুন করে সম্পন্ন করা সম্ভব?
হলিউড ও বলিউডে ইতিমধ্যেই এআই, ভিএফএক্স, সিজিআই ব্যবহার করে প্রয়াত অভিনেতাদের পর্দায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাংলাদেশেও এখন বিজ্ঞাপন, মিউজিক ভিডিও এমনকি চলচ্চিত্রে এআই নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। সালমান শাহকে নিয়েও ইতিমধ্যে একটি এআই কনটেন্ট তৈরি করেছেন নির্মাতা স্বপন আহমেদ।
নির্মাতাদের ভাষ্য
শাহ আলম কিরণ, যিনি সালমানের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, আক্ষেপ করে বলেন—
“সে সময় যদি এআই থাকত, অসমাপ্ত ছবিগুলো সালমানকে দিয়েই শেষ করতে পারতাম। কিন্তু তখনকার দুর্ভাগ্য, প্রযুক্তি ছিল না। তাছাড়া আমাদের দেশে নেগেটিভ সংরক্ষণ হয়নি, তাই অনেক দৃশ্য হারিয়ে গেছে। এখনো যদি সুযোগ পাই, সালমানকে নিয়ে এআই দিয়ে কিছু করতে চাই।”
অন্যদিকে, মতিন রহমান মনে করেন সময়ের ফারাক বড় বিষয়:
“সালমান শাহ এখনো মানুষের স্মৃতিতে আছেন, তবে রুচি-আগ্রহ অনেক বদলেছে। এআই দিয়ে অসমাপ্ত ছবি শেষ করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও, প্রশ্ন হলো দর্শক সেটা গ্রহণ করবে কি না। আমার বয়স হয়েছে, নিজে হয়তো আর পারব না, কিন্তু তরুণ প্রজন্ম চাইলে চেষ্টা করতে পারে।”
প্রযুক্তি বনাম দর্শকের আবেগ
প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব নয় সালমান শাহকে এআইয়ের মাধ্যমে আবারও সিনেমার পর্দায় ফিরিয়ে আনা। তবে প্রয়োজন হবে সঠিক মানের ফুটেজ, সাউন্ড, সংরক্ষিত নেগেটিভ, এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—দর্শকের আগ্রহ।
সালমান শাহর মতো এক ক্ষণজন্মা নায়ককে এআই ফিরিয়ে দিতে পারবে কি না, সে প্রশ্ন এখনো খোলা। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে অসম্ভব শব্দটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। হয়তো একদিন সত্যিই পর্দায় নতুন গল্পে দেখা যাবে বাংলা চলচ্চিত্রের চিরঅমর নায়ককে।