নিখোঁজের ৮ ঘণ্টা পর গর্ত থেকে শিশু বিথি রায়ের মরদেহ উদ্ধার
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার প্রায় আট ঘণ্টা পর বিথি রায় নামে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার রাত ৮টার দিকে…
মেলবোর্ন, ৯ সেপ্টেম্বর- গাজার ছোট্ট মেয়ে হিন্দ রজবের বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। এই বয়সে তার হাসি–খেলায়, ছুটে বেড়ানোয় মেতে থাকার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ তার সেই শৈশব কেড়ে নেয়। আতঙ্কে কাঁপতে থাকা কণ্ঠে সে বারবার বলেছিল— “আমাকে বাঁচাও।” ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনের অপর প্রান্তে শুধু শোনা গিয়েছিল তার ভয়ার্ত আকুতি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
ইসরায়েলি সৈন্যদের নৃশংস হামলায় প্রাণ হারানো হিন্দ রজবের গল্প শুধু গাজায় নয়, সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তুলেছিল। তার মৃত্যুর এক বছর পর সেই ভয়াল বাস্তবতাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তথ্যচিত্রধর্মী সিনেমা ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’, যা সম্প্রতি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কার জেতে।
২০২৪ সালে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (পিআরসিএস) জরুরি নম্বরে একটি ফোনকল আসে। ফোনের অপরপ্রান্তে ছিল আতঙ্কে কাঁপতে থাকা হিন্দ। সে জানায়, গাড়িটি গোলাগুলির পর আগুনে জ্বলছে, চারপাশে লাশ পড়ে আছে, আর সে একাই জীবিত। সেই কল রেকর্ডিং পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
সিনেমার পরিচালক কাওথের বেন হানিয়া সেই আসল অডিও ব্যবহার করেন ছবিতে। কোনো ভিজ্যুয়াল ফুটেজে হিন্দকে দেখানো হয়নি—শুধু তার কণ্ঠস্বরই সিনেমাটিকে সামনে এগিয়ে নিয়েছে। আর সেই কণ্ঠই কাঁদিয়েছে দর্শক ও সমালোচকদের।
কীভাবে ঘটেছিল সেই দিনটির ঘটনা
আল–জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, হিন্দ রজব তার চাচা–চাচি ও চার চাচাতো ভাইবোনের সঙ্গে গাজা সিটি থেকে পালিয়ে তাল আল–হাওয়ার দিকে যাচ্ছিল। পথে তাদের গাড়ি ইসরায়েলি ট্যাংকের সামনে পড়ে। গুলি আর বিস্ফোরণের শব্দের মধ্যে হিন্দের চাচা জার্মানির এক আত্মীয়কে ফোন করে বিপদের কথা জানান। দ্রুত রেড ক্রিসেন্টকে খবর দেওয়া হয়।
তবে তার আগেই গাড়িতে গুলি চালানো হয়। সবাই মারা যায়, কেবল হিন্দ ও তার ১৫ বছর বয়সী কাজিন লিয়ান তখনো জীবিত ছিল। লিয়ান ফোনে কাঁদতে কাঁদতে রেড ক্রিসেন্টকে জানায়—
“আমার মা–বাবা, ভাইবোনরা মারা গেছে। আমরা দুজন বেঁচে আছি। কিন্তু ট্যাংক আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।”
এরপর ফোনকল একাধিকবার কেটে যায়। হিন্দ বারবার বলছিল— “প্লিজ, এখানে আসো। আমাকে বাঁচাও।”
রেড ক্রিসেন্টের চেষ্টা ও শেষ মুহূর্ত
রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা শিশুটিকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। এমনকি তারা ফোনে একসঙ্গে সুরা ইখলাস পাঠ করেন। কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনী অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বাধা দিতে থাকে। গোলাগুলি ও ড্রোনের শব্দে একসময় যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই আবার গোলাগুলি হয়। ফোনকলে হিন্দের কান্না–চিৎকার ধরা পড়ে। তারপর সব নীরব হয়ে যায়। মনে করা হচ্ছিল, হয়তো সে আর নেই।
১২ দিন পর উদ্ধারকর্মীরা হিন্দ রজবের লাশ খুঁজে পান। তার সঙ্গে নিখোঁজ হওয়া রেড ক্রিসেন্টের দুই কর্মীরও মরদেহ মেলে। ইসরায়েলি সৈন্যরা নির্মমভাবে শিশুটিকে হত্যা করেছিল।
৮৯ মিনিটের সিনেমাটি প্রিমিয়ারের দিন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ২৩ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে অভিবাদন পায়, যা বিরল ঘটনা। উপস্থিত সাংবাদিক, সমালোচক ও দর্শকের অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। বিবিসির সমালোচক নিকোলাস বারবার লিখেছেন,
“সিনেমায় শুধু দূরের কণ্ঠ শোনা গেছে, কিন্তু কাছ থেকে দেখেছি কান্না। দর্শকরা ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন, কারও চোখ লাল হয়ে যায়। পুরো হলরুমে নীরবতা নেমে আসে।”
হিন্দ রজব: প্রতিরোধের প্রতীক
পুরস্কার হাতে নিয়ে পরিচালক কাওথের বেন হানিয়া বলেন,
“সিনেমা হিন্দকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তার ওপর সংঘটিত নৃশংসতা মুছে ফেলতে পারবে না। কিন্তু সিনেমা পারে কণ্ঠকে ধরে রাখতে, সিনেমা পারে তার প্রতিধ্বনি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে। যতক্ষণ না ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, তার কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হবে।”
ছয় বছরের একটি শিশুর শেষ মুহূর্তের বাঁচার আকুতি আজ বিশ্বব্যাপী গণহত্যা বন্ধের বার্তায় রূপ নিয়েছে। হিন্দ রজব হয়তো আর নেই, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর বিশ্বজুড়ে মানবতার বিবেককে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au