নিখোঁজের ৮ ঘণ্টা পর গর্ত থেকে শিশু বিথি রায়ের মরদেহ উদ্ধার
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার প্রায় আট ঘণ্টা পর বিথি রায় নামে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার রাত ৮টার দিকে…
মেলবোর্ন, ১৪ সেপ্টেম্বর- ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। ওইদিন পতন ঘটে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হন, মন্ত্রিসভার সদস্যদের বেশিরভাগও পালিয়ে যান বা গ্রেপ্তার হন। আদালতের রায়ে দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেছিলেন, অন্তত ১০–১৫ বছর আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারবে না।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ক্ষমতাচ্যুতির এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দলটি আবারও রাজধানী ঢাকায় রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন শুরু করেছে। এখন তারা “ঝটিকা মিছিল” নামে নতুন কৌশলে মাঠে নামছে। কয়েক মিনিটের জন্য মিছিল বের করা, স্লোগান দেওয়া, ব্যানার-পোস্টার প্রদর্শন করে দ্রুত সরে যাওয়া—এই কৌশলেই তারা রাজপথে ফিরে আসছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাইরের নেতা-কর্মীদের এনে এসব মিছিলে অংশগ্রহণ করানো হচ্ছে।
প্রথমদিকে অল্পসংখ্যক নেতা-কর্মী ভোরবেলা বা রাতে মিছিল করলেও এখন প্রকাশ্যে দিনের আলোতে শত শত নেতা-কর্মী নিয়ে ঝটিকা মিছিল হচ্ছে। রাজধানীর গুলিস্তান, ধানমন্ডি, তেজগাঁও, বিজয় সরণি, উত্তরা, এমনকি যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকাতেও এই ধরনের কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে। মিছিলে ব্যানার, পোস্টার ছাড়াও মোটরসাইকেল শোভাযাত্রাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বরে পর্যন্ত প্রকাশ্যে তেমন কোনো কার্যক্রম চালাতে না পারলেও ২০২৫ সালের শুরু থেকে ক্রমশ সাহসী হয়ে উঠছে দলটির কর্মীরা। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট মিছিল করছে। এর মধ্যে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ছাত্রলীগের মিছিল, মানিক মিয়া এভিনিউতে বিক্ষোভ, গুলিস্তান, ধানমন্ডি, তেজগাঁও ও উত্তরায় একাধিক ঝটিকা মিছিল জনমনে আলোড়ন তৈরি করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাইরের নেতা-কর্মীদের এনে এসব মিছিলে অংশগ্রহণ করানো হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন যাতে তাদের চেনেন না, সেই কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন গ্রুপে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, এমনকি আর্থিক সহায়তাও পাঠাচ্ছেন। ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, “বিদেশে থাকা নেতারা দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, নির্দেশনা ও অর্থ পাঠাচ্ছেন। আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, অতিরিক্ত নড়াচড়া করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রথমদিকে অল্পসংখ্যক নেতা-কর্মী ভোরবেলা বা রাতে মিছিল করলেও এখন প্রকাশ্যে দিনের আলোতে শত শত নেতা-কর্মী নিয়ে ঝটিকা মিছিল হচ্ছে। ছবিঃ সংগৃহীত
ডিএমপি বলছে, ঢাকা শহরের বিশালত্ব ও ফোর্স স্বল্পতার কারণে প্রতিটি এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে মিছিল ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে নিয়মিত গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, “ঢাকা শহর বড় জায়গা। প্রতিটি এলাকায় মিছিল প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব হয় না। তবে যেখানেই তারা জনমনে আতঙ্ক ছড়াবে বা নাশকতা করবে, সেখানেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সম্প্রতি কয়েকটি মিছিলে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ শুধু ঝটিকা মিছিলেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; বড় জমায়েত বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডেরও পরিকল্পনা থাকতে পারে।
কিছু উল্লেখযোগ্য ঝটিকা মিছিল
৬ এপ্রিল গুলিস্তান এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করেন। ওই মিছিল থেকে একজনকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদকে পরে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ১৮ এপ্রিল উত্তরায় একটি ঝটিকা মিছিল বের করা হয়। ওই মিছিলের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘ঢাকা-১৮ সংসদীয় এলাকা’। মিছিল থেকে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়। এছাড়া, ২৪ আগস্ট গুলিস্তান পার্টি অফিসের সামনে বিক্ষোভ মিছিল, ৩১ আগস্ট ধানমন্ডি ২৭-এ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল, ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল, ৬ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল এবং ৭ সেপ্টেম্বর বিজয় সরণিতে বিক্ষোভ মিছিল করে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলী থানা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনও বিক্ষোভ মিছিল বের করে।
আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া ভিডিওগুলো দেখে বোঝা যায়, আগের তুলনায় আওয়ামী লীগের মিছিলে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যানার নিয়ে, এমনকি মোটরসাইকেল নিয়েও বিক্ষোভ মিছিল করছেন তারা। শুরুর দিকে ভোর রাতে কয়েকজন নেতাকর্মী মিছিল করলেও বর্তমানে হাজারের অধিক নেতাকর্মীকে দিনের আলোতে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ মিছিল ও ঝটিকা মিছিল করতে দেখা যাচ্ছে।

ডিএমপি বলছে, ঢাকা শহরের বিশালত্ব ও ফোর্স স্বল্পতার কারণে প্রতিটি এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে মিছিল ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।
ঢাকা সেনানিবাসে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মিলিটারি অপারেশনস ডিরেক্টরেটের কর্নেল স্টাফ কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি দেখছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”
অন্যদিকে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সমস্যা। নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “আওয়ামী লীগের অসংখ্য ভোটার ও সমর্থক এখনো দেশে আছেন। তাই তাদের অস্তিত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যাবে না। সময় ও সুযোগ পেলেই তারা সংগঠিত হবে। এই সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এক বছরের মধ্যেই নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ রাজধানীতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে। ঝটিকা মিছিলের এই কৌশল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au