মেলবোর্ন, ১৬ সেপ্টেম্বর- আগামী জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংস্কারকে ঘিরে একসময় জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–র মধ্যে বেশ কিছুটা ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংসদ নির্বাচনে পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতি চালুর দাবিসহ আট দলের যুগপৎ আন্দোলনের আলোচনা চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই এই সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন ও দূরত্ব দেখা দিয়েছে।
সোমবার ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসসহ চারটি দলের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে জামায়াতে ইসলামী। তবে সেখানে ছিল না এনসিপি। এর আগে কয়েক মাস ধরে দুই দলের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা দেখা গেলেও হঠাৎ এই দূরত্ব কেন তৈরি হলো, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে।
এনসিপির দ্বিধা ও মতবিরোধ
এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচন সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দলটির ভেতরে দুটি স্পষ্ট ধারা তৈরি হয়েছে। একপক্ষ জামায়াতের সঙ্গে আপাতত সমঝোতায় যেতে চাইছে না, অন্যদিকে জামায়াতের সংস্কার দাবির সঙ্গে এনসিপির কিছু পার্থক্য থাকায় যুগপৎ আন্দোলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, “সংস্কারের সব দাবিতে একমত না হওয়া এবং নির্বাচনি জোটের বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকায় জামায়াতের সঙ্গে আপাতত কোনো জোটে যায়নি এনসিপি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি আপাতত কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান বলেন, “লক্ষ্য ছিল এক, কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের পর নানা স্বার্থ ও কৌশলগত কারণে স্বাভাবিকভাবেই দূরত্ব তৈরি হয়েছে।”
জুলাই সনদ নিয়ে বিভাজন
অন্তর্বর্তী সরকারের ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে গত কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনা করছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে। বিএনপি বেশ কিছু প্রস্তাবে দ্বিমত জানালেও জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল অনেকটা কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। এমনকি জামায়াত ও এনসিপি একসঙ্গে গণভোট বা গণপরিষদ নির্বাচনের দাবিও তুলেছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত জামায়াত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংসদ নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি চালুর দাবিতে বিক্ষোভের ঘোষণা দিলেও এনসিপি, এবি পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদ সেখান থেকে সরে যায়। এনসিপি বলছে, সব দাবির সঙ্গে তারা একমত নয়।
আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, “জামায়াত-ইসলামী আন্দোলন-খেলাফত মজলিস উচ্চ ও নিম্নকক্ষ উভয় কক্ষেই পিআর পদ্ধতি চায়। আমাদের দাবি কেবল উচ্চকক্ষের জন্য। এ কারণেই যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়া হয়নি।”
জামায়াত অবশ্য মনে করছে, এনসিপি আপাতত দূরে থাকলেও ভবিষ্যতে তাদের অবস্থান বদলাতে পারে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “আমাদের অনেক দাবির সঙ্গেই এনসিপির মিল রয়েছে, তবে আপাতত তারা কর্মসূচিতে নেই।”
নির্বাচনি জোট নিয়েও অনিশ্চয়তা
আগামী ফেব্রুয়ারির ভোটকে সামনে রেখে জামায়াত তাদের মিত্র দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর জোট গঠনের চেষ্টা করছে। তবে সেখানে এনসিপি যুক্ত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
গত কয়েক মাসের সখ্য দেখে ধারণা করা হচ্ছিল, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যেতে পারে এনসিপি। কিন্তু বর্তমানে দলটি কিছুটা পেছনে সরে এসেছে। নেতাদের একাংশ মনে করছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে যদি বিরোধী দলে থাকতে হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জামায়াতের সঙ্গে ভোটে গেলে যদি ক্ষমতায় আসা যেতো, তাহলে করতাম। কিন্তু বিরোধী দলে থেকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চাই না।”
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত এনসিপিতে যেমন ইসলামপন্থী ব্যক্তিরা যুক্ত হয়েছেন, তেমনি বাম ঘরানার তরুণরাও আছেন। ফলে বাম ঘরানার অংশটি জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানাচ্ছে।
ছাত্ররাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ সংকট
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু) নির্বাচনে এনসিপি-সমর্থিত বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। সেখানে জামায়াত সমর্থিত ইসলামী ছাত্রশিবির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
এই ফলাফলে এনসিপির নেতৃত্বের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ফেসবুকে লিখেছেন, “বাংলাদেশে নতুন আরেকটি ছায়া মওদুদীবাদী দলের প্রয়োজন নেই।” যদিও তিনি সরাসরি এনসিপিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন কি না, তা পরিষ্কার করেননি।
দলের ভেতরে বাম ঘরানার অংশটি জামায়াতঘেঁষা অবস্থান থেকে সরে আসার পরামর্শ দিচ্ছে। এনসিপির ভেতরে ইসলামপন্থী ও বামপন্থী দুই অংশের বিরোধ এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এনসিপির অবস্থান
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, “জামায়াতের সঙ্গে এখন আমাদের দূরত্ব বা সখ্যতা কোনোটিই নেই। যুগপৎ আন্দোলনের সম্ভাবনাও শিগগির নেই। আমরা আপাতত নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েই এগোবো।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপির এই অবস্থান মূলত একটি কৌশল। বিশ্লেষক রাশেদা রওনক খান বলেন, “বিভিন্ন মতাদর্শ, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর নেতৃত্বের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই মতভেদ তৈরি হচ্ছে। তবে এটিই এনসিপির চূড়ান্ত রাজনীতি হবে কিনা, তা এখনই বলা যায় না।”
সুত্রঃ বিবিসি বাংলা