আচমকা থাইল্যান্ডের রাজধানীর ভাজিরা হাসপাতালের সামনের সড়ক ধসে পড়ে। সেখানে গর্ত থেকে একটি গাড়ি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।ছবি: এএফপি
মেলবোর্ন, ২৬ সেপ্টেম্বর- থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে হঠাৎ সড়ক ধসে পড়ার ঘটনায় ঢাকার নগরায়ণ নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গতকাল (২৪ সেপ্টেম্বর) ভাজিরা হাসপাতাল ও একটি পুলিশ স্টেশনের পাশের সড়ক হঠাৎ ধসে গিয়ে প্রায় ৫০ মিটার প্রশস্ত একটি গর্ত তৈরি হয়। এতে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ে, ভূগর্ভস্থ পাইপ ফেটে পানি ছড়িয়ে পড়ে এবং জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের কাজ শুরু করতে হয়।
ঘটনাটি স্থানীয়দের আতঙ্কিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভূগর্ভস্থ পানির অযাচিত ব্যবহার ও দুর্বল অবকাঠামো একই ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ঢাকায় আগের ঘটনা
এ বছরের ২৭ মে ঢাকার ধানমন্ডির শংকর ফুটওভারব্রিজের কাছে হঠাৎ একটি গর্ত তৈরি হয়। এতে পথচারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিগুলো ভাইরাল হলে অনেকেই এটিকে ‘সিঙ্কহোল’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। সিটি করপোরেশন রাতারাতি বালু ও মাটি ফেলে গর্তটি ভরাট করে যান চলাচল স্বাভাবিক করে। তবে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তোলেন, এটি প্রকৃত অর্থে সিঙ্কহোল ছিল কি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুব্রত কুমার সাহা বলেন, “আসল সিঙ্কহোল সাধারণত চুনাপাথর বা জিপসামসমৃদ্ধ এলাকায় রাসায়নিক ক্ষয়ের ফলে তৈরি হয়। ঢাকার সমভূমি মাটিতে সেই ধরনের ভূতাত্ত্বিক অবস্থা নেই। তবে দুর্বল মাটি, ভুল নির্মাণকাজ, ভূগর্ভস্থ পাইপের ফাঁটল বা মাটির সরে যাওয়া এমন ধসের কারণ হতে পারে।”
প্রকৌশলীরা জানান, ধানমন্ডির ওই গর্ত তৈরি হয়েছিল ভূগর্ভস্থ পানি লাইনের ফাঁটলের কারণে। সেসময় ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) আড়াআড়ি ড্রিলিং করে বিদ্যুৎ লাইন বসাচ্ছিল। এ সময় ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট থেকে যাওয়া একটি লাইন ফেটে বালু ধুয়ে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে মাটিই ভেঙে পড়ে বড় গর্ত সৃষ্টি হয়।
ভূগর্ভস্থ পানির ঝুঁকি
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “সিঙ্কহোল আসলে ভূমি ধসেরই একটি রূপ। ঢাকায় বড় পরিসরে এমন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কারণ, ঢাকার দুই কোটি মানুষের জন্য যে পানি ব্যবহার হচ্ছে তার ৭০ শতাংশই ভূগর্ভ থেকে তোলা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা উপরের দিকের নগর পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু মাটির নিচে কী ঘটছে তা প্রায় উপেক্ষা করি। প্রতি বছর ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কয়েক ফুট করে নেমে যাচ্ছে। এতে ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছে এবং ভূমি ধসের ঝুঁকি বাড়ছে।”
উচ্চ ভবনের ভিত্তির নিচের মাটির আচরণ সম্পর্কেও তিনি সতর্ক করেন। “যেকোনো সামান্য ভূমিকম্প হলেও মাটির ভেতরের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এতে সবচেয়ে মজবুত ভবনও ঝুঁকিতে পড়বে, এমনকি ব্যাপক সিঙ্কহোল তৈরি হতে পারে।”
বিশ্বের নানা শহরের অভিজ্ঞতা
বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ভয়াবহ সিঙ্কহোল দেখা গেছে। ২০০৭ ও ২০১০ সালে গুয়াতেমালা সিটিতে বিশাল গর্ত তৈরি হয়ে একটি পুরো সংযোগস্থল বিলীন হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে নিয়মিত সিঙ্কহোল হয়, কারণ অঞ্চলটি চুনাপাথরের ওপর গড়ে উঠেছে। চীনের চংকিং ও গুয়াংডং, রাশিয়ার বেরেজনিকি এবং এমনকি জেরুজালেমেও অনুরূপ সড়ক ধসের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও প্রাকৃতিক কারণে, কোথাও অতিবৃষ্টি বা নির্মাণকাজের কারণে এ ঘটনা ঘটে।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “আমরা ইতিমধ্যেই বিপর্যয়ের শর্ত তৈরি করছি। এখনই যদি ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও মাটির গবেষণা জোরদার না করি, ভবিষ্যতে ঢাকায় আরও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে।”
সুত্রঃ দ্য ডেইলি স্টার