অস্ট্রেলিয়ার সড়ক আইন রাজ্য ও টেরিটোরি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ছবিঃ এবিসি নিউজ
মেলবোর্ন, ২৬ সেপ্টেম্বর- সাম্প্রতিক সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার টেসলা মালিকদের জন্য এক নতুন আপডেট চালু হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট মডেলের গাড়ি চালকের তত্ত্বাবধানে নিজে থেকেই চালু হতে পারে, ব্রেক করতে পারে, মোড় নিতে পারে এবং পার্ক করতে পারে।
টেসলা কয়েক মাস ধরে এই আপডেট নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছিল। ক্রেতারা চাইলে কারখানা থেকে সফটওয়্যারটি কিনতে পারবেন, অথবা সাবস্ক্রিপশন সেবার মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ নিতে পারবেন। প্রায় ১০ হাজার ডলার খরচে এখন চালকরা টেসলার ফুল সেল্ফ-ড্রাইভিং (সুপারভাইজড) বা এফএসডি সিস্টেম ব্যবহার করতে পারবেন। তবে এফএসডি ব্যবহারের নিয়ম অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি রাজ্যে আলাদা।
ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন নিয়ম
অস্ট্রেলিয়ার সড়ক আইন রাজ্য ও টেরিটোরি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সাউথ অস্ট্রেলিয়া, নিউ সাউথ ওয়েলস, এসিটি এবং তাসমানিয়া জানিয়েছে, তারা এই অটোপাইলট প্রযুক্তি চালুর অনুমতি দিয়েছে। তবে শর্ত হলো চালককে সর্বদা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে এবং আইনত গাড়ির সম্পূর্ণ দায়িত্ব তারই থাকবে।
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার পরিবহন বিভাগ বলেছে, এফএসডি ব্যবহারের সময় চালককে দুই হাত স্টিয়ারিং হুইলে রাখতে হবে। তবে কুইন্সল্যান্ডে এক হাতই যথেষ্ট। নর্দার্ন টেরিটোরির নিয়মে বলা হয়েছে, চালককে সর্বদা গাড়ির নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। তাদের মতে, “ড্রাইভার-অ্যাসিস্ট্যান্স প্রযুক্তি কখনোই এই দায়িত্ব কমাতে বা পরিবর্তন করতে পারে না।”

অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট কমিশন স্বয়ংচালিত গাড়ির ব্যবহারের জন্য দেশব্যাপী একটি কাঠামো তৈরি করছে। ছবিঃ এবিসি নিউজ
অন্যদিকে ভিক্টোরিয়ার পরিস্থিতি অস্পষ্ট। ভিক্টোরিয়ার পরিবহন বিভাগ এটি বৈধ কিনা সেটি স্পষ্ট করে জানায়নি। তবে রাজ্যের আইন অনুযায়ী, যেসব গাড়ি স্টিয়ারিং, ব্রেক বা এক্সেলারেশনের মতো কাজে প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তাদের জন্য বিশেষ অটোমেটেড ড্রাইভিং সিস্টেম পারমিট প্রয়োজন। চলতি বছরের মে মাসে মেলবোর্নে টেসলার অটোপাইলট প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার অনুমোদন ছাড়া হয়েছে বলে পরবর্তীতে জানা যায়।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটির পরিবহন প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক হুসেইন দিয়া বলেছেন, নতুন প্রযুক্তি চমকপ্রদ হলেও এর সীমাবদ্ধতা আছে। তার মতে, “ফুল সেল্ফ-ড্রাইভিং নামটি বিভ্রান্তিকর। এটি আসলে উন্নত চালক-সহায়ক বা আংশিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা।” তিনি এটিকে “শিক্ষানবিশ চালকের মতো” বলে তুলনা করেছেন, পেশাদার চালকের মতো নয়।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই প্রযুক্তি এখনো মাত্র লেভেল টু (মোট পাঁচ ধাপের মধ্যে)। অর্থাৎ, চালককে যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। “ক্যামেরা-ভিত্তিক এই গাড়িগুলো প্রতিবন্ধকতা পেলে ভুল করতে পারে এবং কখনো কখনো সেই ভুলের ফল মারাত্মক হতে পারে,” তিনি বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে টেসলার এই প্রযুক্তি একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়ায় দুটি মামলার গোপন সমঝোতায় পৌঁছেছে কোম্পানি। অস্ট্রেলিয়াতেও বর্তমানে টেসলার বিরুদ্ধে ফ্যান্টম ব্রেকিং–এর অভিযোগে মামলা চলছে, যেখানে চালকরা বলেছেন গাড়ি হঠাৎ করে অকারণে ব্রেক করে ফেলে।
তৈরি হচ্ছে জাতীয় কাঠামো
অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট কমিশন স্বয়ংচালিত গাড়ির ব্যবহারের জন্য দেশব্যাপী একটি কাঠামো তৈরি করছে। সংস্থাটির রেগুলেটরি রিফর্ম প্রধান অ্যারন ডে রোজারিও বলেছেন, বর্তমান আইন ধরে নেয় চালকই প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে নতুন আইন কার্যকর করা হবে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে উন্নত পরীক্ষা ও আংশিক প্রয়োগ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, অস্ট্রেলিয়াও দ্রুতই এমন প্রযুক্তি পাবে।
তিনি জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি কমনওয়েলথ আইন প্রণয়ন করা হবে, পাশাপাশি রাজ্য ও টেরিটরিগুলোর সড়ক আইনকে সমন্বয় করে একীভূত কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
চালকদের অভিজ্ঞতা
টেসলা ওনার্স ক্লাব অব অস্ট্রেলিয়ার সহ-সভাপতি লেস পোসন বলেছেন, এফএসডি চালকের দায়িত্ব কমায় না। গাড়িতে বসানো ক্যামেরা চালকের চোখ ও দৃষ্টি পর্যবেক্ষণ করে। যদি চালক বারবার মনোযোগ হারান, তবে সিস্টেম সতর্কবার্তা দেয় এবং এক পর্যায়ে কয়েকদিনের জন্য এফএসডি বন্ধ হয়ে যায়।
টেসলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি।
সুত্রঃ এবিসি নিউজ